জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ঘোষণা বাস্তবায়নে পূর্ণপ্রস্তুতি চাই

10

 

সরকার আবারও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিশ্বের সাথে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এ পরিবর্তন হবে সময়োপযোগি, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর। গত সোমবার শিক্ষামন্ত্রী সচিবালয়ে এ সংক্রান্ত আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেছেন, এ পরিবর্তনের ধারা শুরু হবে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত। সহজভাষায় বললে, প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাক্রমে ব্যাপক পরিবর্তনের পাশাপাশি এসব স্তরের পরীক্ষা পদ্ধতিও বদলে যাবে। যার বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২৩ সালে। তবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে আগামী বছর ২০২২ সাল থেকে দুইশো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য এখনকার পরীক্ষা ও সার্টিফিকেট নির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে শিক্ষাকে বের করে আনা। সেই সাথে শ্রেণিকক্ষেই দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা। তাতে কেন্দ্রীয়ভাবে অষ্টম শ্রেণিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (জেএসসি) এবং পঞ্চম শ্রেণিতে প্রাইমারি অ্যাডুকেশন সার্টিফিকেট (পিইসি) পরীক্ষা নেওয়ার দরকার হবে না। বরং বিদ্যালয়ের অন্যসব শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার মতোই ওই শ্রেণিগুলোর মূল্যায়ন করা হবে এখানে ধারাবাহিক মূল্যায়নের উপর অধিক জোর দেয়া হয়েছে। শ্রেণিনির্ভর পাঠদান ও আদায় পদ্ধতিতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন কার্যকর সুফল বয়ে আনতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হচ্ছে, প্রাথমিক স্তরে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকা। দ্বিতীয়টি হলো মাধ্যমিক স্তরে মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য- এসব গ্রæপ বিভক্তি আর থাকবে না। তার মানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে সবাইকে অভিন্ন বিষয় পড়তে হবে। আর তৃতীয়টি হলো একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। এ দুটি পরীক্ষার নম্বর সমন্বয় করে উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসির ফল দেওয়া হবে।
এর বাইরে শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নসহ আরও কিছু পরিবর্তনের কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমণি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের যথার্থতা মূল্যায়ন করে বলতে হয়, বাস্তবতা হচ্ছে, আধুনিক বিশ্ব প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে। সেই বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদেরকেও বৈশ্বিক পরিবর্তনের ধারা অনুধাবন করতে হবে। প্রতিযোগিতার এ বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে হবে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। আর সেজন্য দেশের শিক্ষাক্রম সময়োপযোগী করতেই হবে।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, শিক্ষাক্রম পরিবর্তনে আমাদের আগের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন সরকার শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে একাধিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। কিন্তু কোনটিই স্থায়ী এবং গ্রহণযোগ্য হয়নি। পরবর্তী ২০০৮ সাল থেকে মাধ্যমিক স্তরে এবং ২০১২ সাল থেকে প্রাথমিক স্তরে ধাপে ধাপে ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ শুরু করেছিল সরকার। যার উদ্দেশ্যও ছিল মুখস্থ বিদ্যা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করো আনা। সেই পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কথা আমরা জানি। বহু অভিভাবক ও শিক্ষাবিদ পুরো প্রস্তুতি ছাড়া ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’র বিপক্ষে ছিলেন। তখন তারা যুক্তি দেখিয়েছিলেন, ওই পদ্ধতিতে এমন কিছু বিশেষায়িত বিষয় ছিল, তা পড়ানোর মতো পর্যাপ্ত শিক্ষক ছিল না। কিন্তু বড় ধরনের বিরোধিতার মধ্যেও ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ বাস্তবায়ন করেছিল সরকার। আমাদের কাছে তথ্য আছে, এখনও সব বিষয় ও পত্রে সৃজনশীল পদ্ধতির উপর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
এরই মধ্যে বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে আমরা জেনেছি, দেশে শিক্ষার্থী অনুপাতে বিজ্ঞান এবং গণিতের পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে পড়ানোর মতো শিক্ষকেরও অভাব রয়েছে দেশে। এই অবস্থায় একটা শঙ্কার জায়গা তৈরি হয়, নতুন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন শিক্ষকরা। কেননা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকাই বড়।
আমরা মনে করি, পাইলট প্রকল্পে এই বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব দিতে হবে। সীমাবদ্ধতা বা দুর্বল জায়গাগুলো বের করে তার প্রতিকারও খুঁজতে হবে। এ জন্য চাই ব্যাপক প্রস্তুতি। অন্যথায়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুরো জাতিকেই এর নেতিবাচক কুফল ভুগতে হবে। এছাড়া সরকার যে মহৎ উদ্দেশ্যে শিক্ষা কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে চায় তাও সফল হবেনা। সুতরাং প্রস্তাবিত শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মাঝে বাস্তবায়নের আগে এর মূল কারিগর শিক্ষকদের পরিপূর্ণ প্রস্তুত করতে হবে।