জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাব রোহিঙ্গাদের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ

7

গত বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে ওআইসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথভাবে এক রেজুলেশন গ্রহণ করেছে, যাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মতো ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত সংবাদ থেকে এ তথ্য জানা যায়। সূত্র জানায়, রেজুলেশনটি ১০৯টি দেশ স্পন্সর করেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। রেজুলেশনটি মূলত রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। এতে রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা, রাখাইন রাজ্যে স্বতঃস্ফূর্ত, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতসহ জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদানের আহŸান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে, এটি আসিয়ান কর্তৃক সর্বসম্মতভাবে গৃহীত পাঁচ দফা সুপারিশের দ্রæত বাস্তবায়নের উপর জোর দিয়েছে। রেজোলিউশনটি চলমান বিচার এবং জবাবদিহিতা প্রক্রিয়ার উপর সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্যও আহবান জানিয়েছে। মিয়ানমার সরকার কর্তৃক সৃষ্ট জাতিগত সমস্যার এক পর্যায়ে রাখাইন রাজ্যের মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর বর্বর নীপিড়ন ও হত্যাকাÐ শুরু করলে ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গারা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে শুরু করে। কয়েকমাসের মধ্যে পাঁচ লাখের অধিক রোহিঙ্গা বান্দরবান ও কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেয়। অবশ্যই এর আগ থেকে আরো প্রায় ৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের আশ্রয়ে ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন বটে আশা করা হয়েছিল মিয়ানমার সরকার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে এবং রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নেবে। কিন্ত মিয়ানমারের নানা অজুহাত, দেশটির রাজনৈতিক পাটপরিবর্তন, মার্শাল ল’জারি ইত্যাদির আড়ালে চাপা পড়তে থাকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি। অপরদিকে বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বোঝা দীর্ঘদিন বহন করা বাংলাদেরে জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিষয়টি সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ, বিভিন্ন আঞ্চলিক ও গোষ্ঠী সংগঠনগুলোকে বুঝিয়ে আসছিল। এজন্য দীর্ঘ কূটনেতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখা হয়েছে। সর্বশেষ জাতিসংঘের অধিবেশনে ওআইসি ও ইরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রস্তাবে যে রেজুলেশন চালু করা হয, তাতে ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এটি রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের ন্যায়সংগত অবস্থানের প্রতি আন্তজৃাতিক সম্প্রদায়ের বড় সমর্থন। আমরা মনে করি, এ প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হলে রোহিঙ্গারা তাদের ন্যায্য অধিকার ও সন্মান নিয়েই তাদের জন্মভুমি মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন করতে পারবে। কারণ রেজুলেশনে রাখাইন রাজ্যে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সক্ষম পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার, ইউএনএইচসিআর ও ইউএনডিপির মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকটির পুনরুজ্জীবতকরণ ও কার্যকর বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রেজুলেশনটি গৃহীত হওয়ার সময় প্রদত্ত বক্তব্যে বাংলাদেশের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স মো. মনোয়ার হোসেন জানান, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তাদের প্রত্যাবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের সংহতি দাবি না করা পর্যন্ত ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। এই মানবিক সাড়াদান প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন। তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার ইস্যুতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ওআইসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, জাতিসংঘের এই প্রস্তাব রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান খুঁজতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার করতে প্রস্তাবটি উৎসাহব্যঞ্জক। একই সাথে বাংলাদেশকে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। ক‚টনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার এবং বহুপাক্ষিক তৎপরতার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নিতে বাধ্য করতে হবে মিয়ানমারকে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে সফল হবে।