জাতিসংঘের সর্বসম্মত প্রস্তাব রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

5

জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো ঐকমত্যের ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। বুধবার জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে ঐকমত্যের মাধ্যমে ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকারের পরিস্থিতি’ বিষয়ে এ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। রাশিয়া, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১০৭ টি দেশ এ প্রস্তাবে সহ-রেজুলেশনে পৃষ্ঠপোষকতাসহ সর্বসম্মত ঐকমত পোষণ করেছে। এ প্রস্তাব রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের এ যাবৎ উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্জন। ২০১৭ সালে জাতিসংঘে এধরনের প্রস্তাব উত্থাপন হলে তাতে চীন, রাশিয়া ও ভারতসহ অনেকে প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান করলেও এবারই সকলে একমত হয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের প্রয়োজনিয়তার প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ প্রস্তাব বাংলাদেশকে আশাবাদি করে তুলেছে। দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতার একটি সুফলও বাংলাদেশ অর্জন করতে যাচ্ছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন এর প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন ‘এটা আমাদের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, আমরা খুব খুশি’। ড. মোমেন বলেন, জাতিসংঘের এ সর্বসম্মত প্রস্তাব আমাদের জন্য রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। ‘ওই প্রস্তাবে ওই নির্দিষ্ট দেশের (মিয়ানমার) ওপর চাপ রয়েছে।’ প্রস্তাবে সর্বসম্মত ঐক্য এটিই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সবাই রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তিনি বলেন, চীন, রাশিয়ার মতো যেসব দেশ এর আগে (বিষয়টি নিয়ে) বাধা সৃষ্টি করেছিল, এবার তারা বাধা সৃষ্টি করেনি, যার অর্থ সবাই সংকটের সমাধান চায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং চীন ইতোমধ্যে কিছু হস্তক্ষেপ করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব বাধ্যতামূলক না হওয়ায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (ইউএনএসসি) রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অগ্রগতি দেখার আশা প্রকাশ করেন ড. মোমেন। জুন মাসে বাংলাদেশ মিয়ানমার সম্পর্কিত জাতিসংঘের প্রস্তাব থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কারণ রোহিঙ্গা সমস্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ‘আমরা (সেই সময়) বলেছিলাম যদি আপনারা রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে কথা না বলেন, তবে, প্রস্তাবনা অর্থহীন হবে’, ড. মোমেন সেই প্রস্তাব সম্পর্কে তখন এমনটাই বলেছিলেন।
অন্যদিকে বুধবার প্রস্তাব গ্রহণের সময় জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা উপস্থিত ছিলেন। এসময় তিনি বলেন, রাবাব ফাতিমা বলেন, ‘সর্বসম্মতিক্রমে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, এতে এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় দৃঢ় সংকল্প প্রদর্শন করে।’ প্রস্তাবে সদস্য দেশগুলো রোহিঙ্গাদের আশ্রয় এবং তাদের মানবিক সহায়তা প্রদান এবং কোভিড-১৯ টিকাদান অভিযানে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করেছে।
আমরা মনে করি, রোহিঙ্গরা তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান অর্জনে এই প্রস্তাব এখন বাস্তব পদক্ষেপের প্রেরণা হিসেবে কাজ করা করবে। অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-র সদস্য রাষ্ট্রগুলো যৌথভাবে এই প্রস্তাবটি পেশ করেছে। মোট ১০৭টি দেশ এই রেজুলেশনে সহ-পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছে, যা ২০১৭ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। সূত্র জানায়, এই প্রস্তাাব ইইউ এবং ওআইসি-এর সদস্য দেশগুলো ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, জাপান এবং কোরিয়াসহ আন্ত-আঞ্চলিক দেশগুলোর সহ-পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। এই প্রস্তাবটিতে চলমান ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতা প্রক্রিয়া বজায় রাখার উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে বলেও জানা যায়। এতে মিয়ানমারে মহাসচিবের নতুন বিশেষ দূত নিয়োগকে স্বাগত জানানো হয়েছে এবং মিয়ানমারে তার একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টায় মিয়ানমার এবং ইউএনএইচসিআর এবং ইউএনডিপির মধ্যে স্বাক্ষরিত এমওইউ পুনঃনবায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের আহŸান জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট অংসান সুচির নেতৃত্বে পরিচালিত মিযানমার সরকারের অধিন সামরিক বাহিনী তুচ্ছ অজুহাতে দেশটির মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য রাখাইনে বর্বর আক্রমণ চালিয়ে রোহিঙ্গাদের উপর নিষ্ঠুর হত্যাকাÐ ও জাতিগত নীপিড়ন শুরু করলে কয়েকদফায় রাজ্যটির প্রায় সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশ সরকার উদার ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আশ্রয় দিয়ে সীমান্ত জেলা কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে সাময়িক অবস্থানের সুযোগ দিলেও দেশটির অনাগ্রহ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐকমত্যের অভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। গত বুধবার জাতিসংঘের প্রস্তাবে সর্বসম্মত ঐক্যমত সেই বাধা আপাতত অপসারণ হয়েছে। এখন রোহিঙ্গহাদের জাতিগত স্বীকৃতি দিয়ে তাদের দেশে ফেরতের কার্যকর উদ্যোগ দেখার অপেক্ষা। আশা করা যায়, শিগগিরই রোহিঙ্গা সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌছবে। তবে এরজন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে নিঃসন্দেহে।