জাতির জনকের প্রতি শোকাঞ্জলি

19

মোহাম্মদ মন্জুরুল আলম চৌধুরী

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুধুই আমাদের জন্যে নয় বিশ্বমানবতার জন্যেও নির্মম নিষ্ঠুর মর্মন্তুদ বিভীষিকাময় একটি কালো দিন। জাতির শ্রেষ্ঠ বাঙালি শুধু বঙ্গবন্ধুকেই নয় ঘাতকেরা শিশু রাসেলসহ গর্ভবতী মা বোনদেরকেও নির্বিচারে হত্যা করেছে। যে মানুষটি জীবনের সোনালী দিনগুলো আন্দোলন সংগ্রাম আর কারাভোগে অতিবাহিত করেছেন, বাংলার স্বাধীনতার জন্য বাঙালির মুক্তির জন্য লড়ে গেছেন। একটি স্বাধীন দেশ, সার্বভৌম একটা ভুখÐ, লালা সবুজের একটা পতাকা দিয়ে গেছেন। দিয়ে গেছেন একটা আত্মনির্ভর এবং মর্যাদাশীল বাংলাদেশ। সেই অক্লান্ত পরিশ্রমী সংগ্রামী বাংলার অবিসংবাদিত নেতাকে বুলেটে ঝাঁজরা করে দিতে হাত কাঁপেনি পাকিস্তানি এবং মীর জাফরদের বংশধর এদেশীয় দোসরদের। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে নিজের পরিবারের চেয়েও বেশি ভালবেসেছেন। স্বচ্ছ নিরেট এবং সিধেসাধা বাঙালি জীবন যাপনের পাশপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলে মিশে থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বঙ্গভবনে অবস্থান না করে নিজের ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরেই বসবাস করেছেন। যেই বত্রিশ নম্বর বাড়িটি ছিল বাঙালির আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাঘার। বাংলদেশের মুক্তির ঠিকানা।
যে নেতার অঙ্গুলি হেলনে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পূর্ব বাংলায় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) জনগণ সাড়া দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে। মুখে ছিল আমার নাতে তোমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব। বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন বিশাল হৃদয়ের ধীর স্থির কৌশলী তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন বিশাল ব্যাক্তিত্ব। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমুদ্রে বজ্র কঠিন কন্ঠে ঘোষণা করেছিলেন-এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। প্রকৃতপক্ষে এখানেই স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা তিনি কৌশলে দিয়ে দিয়েছেন। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার অহবান জানিয়েছেন। আশঙ্কা জানিয়ে বলেছিলেন আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা শত্রুর মোকেবেলা করবে। ঘরে ঘরে তোমরা দুর্গ গড়ে তোল। তিনি দেশকে মুক্ত স্বাধীন করার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছিলাম।
যুদ্ধ বিধ্বস্ত অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু বাংলাদেশকে তিনি ধীরে ধীরে বিশ্বের মানচিত্রে একটা মর্যাদাশীল, আত্ম-নির্ভরশীল, উন্নয়নমুখী সুখী সুন্দর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছিলেন। সর্বহারা পার্টি, জাসদসহ কিছু রাজনৈতিক আদর্শ বিচ্যুত তথাকথিত রাজনৈতিক দল কল-কারখানায়, পাটের গুদামে অগ্নি সংযোগ করে সদ্য স্বাধীন দেশকে পেছনের দিকে টেনে নিতে অপ-তৎপরতা এবং ধ্বংসাত্মক রাষ্ট্র বিরোধী কর্মকাÐে লিপ্ত হয়ে অশুভ রাজনৈতিক ফায়দা লোটার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন, অগ্নিসংযো, অরাজকতাসহ নানাবিধ রাষ্ট্র-বিরোধী গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু বাধ্য হয়ে ৭৪ এর বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণয়ন করেন সংসদের মাধ্যমে। এই আইনটিকে কালো আইন, নির্যাতনমূলক আইনসহ অনেক ধরনের উপাধিতে ভূষিত করতে থাকে রাজনৈতিক দলগুলো। বড় বিস্ময়ের ব্যাপার, বি এন পি, জামাত, জাতীয় পার্টিসহ সব দলই ক্ষমতায় থাকাকালে কেউই এই আইনটি বাতিল করেনি। দেশ পরিচালনায় এমন আইনের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। বঙ্গবন্ধু আমলের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী প্রয়াত আবদুল মান্নান বলেছিলেন-টেবিলে বসে ক্ষমতায় থাকলে এমন আইনের খুব দরকার। কিন্তু টেবিলের ওপাশে থাকলে বা বিরোধী দলে থাকলে সবার কাছে এটি কালো আইন। প্রকৃতপক্ষে কোথাও সন্ত্রাসী কর্মকাÐ ঘটানোর পূর্বে এসব দেশদ্রোহী সন্ত্রাসীদেরকে আটকের জন্য এই আইনটির যথাযথ প্রয়োগ সময়ের দাবি। এটা ভালো বা মন্দ নির্ভর করে এর অপপ্রয়োগের ক্ষেত্রে। তাই এতো কালো কালো বলার পরেও এটা অদ্যাবধি বলবৎ আছে। বরং বি এন পি এর চেয়েও কঠিন সন্ত্রাস দমন আইন তৈরি করেছে।
সুখী সুন্দর সোনার বাংলা বিনির্মাণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লব এবং বাকশাল কায়েম করেছিলেন। এখানে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মসূচি ছিল। রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল সাময়িক বা কয়েক বছরের জন্য। দেশে রাষ্ট্র বিরোধী সন্ত্রাস অরাজকতা বন্ধ করে কৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরে যা বাতিল করার কথা এবং দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ছিল দীর্ঘমেয়াদী। সে সময় যদি বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব কার্যকর করা যেত তাহলে সুজলা সুফলা বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠতো। তাহলে অনেক আগেই এদেশের মানুষের দ্বারে দ্বারে অন্ন বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা এবং চিকিৎসা সেবা পৌঁছে যেতো। দুর্ভাগ্য দেশ ও জাতির। একটি দেশকে স্বাধীন করে দিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মকাÐ শুরুর প্রাক্কালেই বঙ্গবন্ধুকে পরিবার পরিজনসহ হত্যা করা হল। জাতি আজ স্বস্তি আর আনন্দের নিঃশ্বাস নিতে পারছে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসম সাহসিকতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছেন শত চক্ষুশূল উপেক্ষা করে। যে সব খুনির মৃত্যুদÐ কার্যকর করা যায়নি তাঁদেরকে অতি দ্রæত দেশে এনে তাঁদের মৃত্যুদÐ কার্যকর করা এখন জন এবং সময়ের দাবি। ১৫ আগস্টের বিভীষিকাময় এই দিনে জাতির জনক, বঙ্গমাতা, শিশু শেখ রাসেলসহ নিহত সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। রক্তের দামে কেনা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জমিন যেন এভাবে আর রক্তে রঞ্জিত না হয় সেটাই সকলের কাম্য। আমাদের প্রত্যাশা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে চোরা পথে ক্ষমতা দখলের সামরিক ক্যু বা সামরিক অভ্যুত্থানের মতো সকল ন্যক্কারজনক, জঘন্য কর্মকাÐ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। বিনম্র এবং গভীর শ্রদ্ধা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং ১৫ আগস্টের অমর শহীদদের প্রতি।

লেখক : প্রাবন্ধিক