জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগের শেষ কোথায় ?

4

বৃষ্টি হলেই প্রাচ্যের রাণী চট্টগ্রাম শহর পানির নিচে ডুবে যাওয়ার সংবাদটি বহু পুরনো। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়ে এ যাবৎ হাজারো পাতা লেখা হয়েছে, টিভি ক্যামরা জলবানে কষ্টেথাকা হাজারো নগরবাসীর চেহারা প্রকাশ করে চলছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চাকতাই-খাতুনগঞ্জের সীমাহীন দুঃখের কথাও তুলে ধরা হচ্ছে, কিন্তু কিছুই যেন স্পর্শ করছেনা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে। জলাবদ্ধতায় নগর যেন এখন একাকার। জলাবদ্ধতা নামক এ দুর্ভোগ থেকে উত্তরণের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত প্রকল্পের আলোকে ২০১৭ সালে সরকার অনুমোদন দেয় মেগা প্রকল্প। প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৮ সালে। ২০২০ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়িয়ে জুন ২০২১ করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের আরো প্রায় ৪০ভাগ কাজ বাকি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বর্ষা এখনও আসেনি, জ্যৈষ্ঠের শেষ বিকালে বর্ষার আগমনি বার্তায় অনাকাক্সিক্ষতভাবে ভারি বৃষ্টিতে থৈ থৈ করছে নগরের প্রধান প্রধান সড়কসহ অলিগলি। গত শনিবার বিকাল থেকে শুরু হওয়ায় বিরতিহীন বৃষ্টি সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত অব্যাহত আছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছেন আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত ভারি বৃষ্টিসহ বজ্রপাত ও হালকা বাতাস অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আগামী বর্ষা মৌসুমে ধীরে ধীরে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়বে। এবার বর্ষাকাল হতে পারে প্রলম্বিত ও বৃষ্টিমুখর। বর্ষায় চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা ও জলজট স¤প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ড্রেনেজ সিস্টেম উন্নত করাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবে প্রতি বছরই ভারি বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় চট্টগ্রামবাসীকে। কিন্তু এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা কিছুটা তৎপর হলেও এক পর্যায়ে সব থেমে যায়। আবার ভারি বৃষ্টি হলে সবাই সরব হয়। কয়েকদিন আগে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী নগরীর সেবা সংস্থাগুলোর সাথে আয়োজিত সমন্বয় সভায় এবং ১০০ দিনের ক্রাশপ্রোগ্রাম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বর্ষায় চট্টগ্রাম নগর পুরোটাই ডুবে যাবে বলে আশঙ্কা করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে চাকতাই খালসহ এগারোটি পয়েন্ট-এ দেয়া বাঁধ কেটে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। মেয়র এজন্য ১০/১৫ দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন। কিন্তু এর আগেই অগ্রিম বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকার রাস্তা পানিতে ডুবে যায়। অনেক সড়কে গলা বা কোমর সমান পানিও ছিল। অনেক স্থানে ইঞ্জিনে পানি প্রবেশ করে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। জলজটে ভয়াবহ যানজট তৈরি হয় সড়কগুলোতে। রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিবহন, গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরযানে দীর্ঘ সারি পড়ে যায়। জলজট ও যানজটে চরম ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী ও পথচারীরা। এ অবস্থায় সামনের বর্ষায় নগরীর অবস্থা কি হবে তা সম্যক ধারণা করা যায়। আমরা মনে করি, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জলাবদ্ধতা নিরসনে যে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তাতে নাগরিক জীবনে একসময় স্বস্তি ফিরবে-এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি উন্নয়ন কর্মকান্ড জীবনকে যেন দুঃষহ যন্ত্রনায় না ফেলে সেই দিকেও দৃষ্টি দেয়া উন্নয়ন বিধিতে পড়ে।
আমরা জানি,স্বাভাবিক অবস্থায় বৃষ্টি বা জোয়ার হলেই নগরীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে, এরপরও মাসের পর মাস খাল, শাখা খাল ও ড্রেনেজগুলোর পানি সঞ্চালনের মুখ্যপথ চাকতাই খাল বা কর্ণফুলিতে বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে রাখা কোন যুক্তিতেই পড়ে না। এর ফলে শুধু জলাবদ্ধতা নয়, বরং বন্যায় সয়লাব হবে নগরী- তা বলার অবকাশ নেই। এ অবস্থায় মেয়র মহোদয় যে অনুরোধ রেখেছেন তা বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনকে নালা-নর্দমা ও খালগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পানি নিস্কাশনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। রবিবার দৈনিক পূর্বদেশে চাকতাই খালের বাঁধ এবং সিএন্ডবি এলাকায় বনসাই খালের আবর্জনার স্তূপের দুটি ছবি ছাপিয়ে আসন্ন বর্ষায় প্রবল জলাবদ্ধতার ইঙ্গিত প্রকাশ করেছে। যা গত দুদিনে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। নগরীর অধিকাংশ খাল ও ড্রেনের অবস্থা বনসাইর-এর মত। সুতরাং শুধু এক কর্তৃপক্ষের উপর দোষ চাপালে হবে না। চসিকেরও দায় কম নয়। আমরা আশা করি, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসা স্ব স্ব অবস্থান থেকে নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে নগরবাসী জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে সহসা মুক্তি লাভ করবে।