ডা. খালেদ বিন ইসলাম
হাঁটু ও কোমরের ব্যথা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে একটি ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য জটিলতা। দীর্ঘস্থায়ী আর্থ্রাইটিস, বার্ধক্যজনিত হাড় ক্ষয়, দুর্ঘটনার কারণে হাঁটু বা হিপ জয়েন্টে ব্যথা ও অস্বস্তি নিয়ে দৈনন্দিন কাজগুলো স্বাভাবিকভাবে করতে বহু মানুষের বেগ পেতে হচ্ছে। তবে আশার বার্তা হচ্ছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও প্রযুক্তির ব্যবহারে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপি প্রতিবছর প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ হাঁটু বা কোমরের জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট করাচ্ছেন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বছরে ৭ লক্ষের বেশি হাঁটু প্রতিস্থাপন এবং প্রায় ৪ লক্ষ হিপ রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও এই চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশে আর্থ্রাইটিস ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা যায়, ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ হাঁটুর সমস্যায় ভোগেন, যাদের অনেকেরই এক পর্যায়ে সার্জারি করার প্রয়োজন দেখা দেয়। দক্ষিণ এশিয়াতেও এর চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশে ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রতি ১০ জনে অন্তত ৪ জন হাঁটু ব্যথার সমস্যায় ভুগছেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে তুলনামূলক কম কম বয়সেই অনেকে হাড় ক্ষয়জনিত সমস্যার শিকার হচ্ছেন। স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও দীর্ঘদিন ধরে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ না করা এই সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে শরীরের ক্ষয়প্রাপ্ত বা বিকল জয়েন্টকে কৃত্রিম ধাতব, প্লাস্টিক বা সিরামিক জয়েন্ট দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়। এই সার্জারির ফলে রোগীরা ব্যথামুক্ত জীবনযাপনের পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজে স্বাভাবিকরূপে ফিরে যেতে পারেন। সার্জারির পর ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ রোগী অন্তত ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত ঝামেলাহীনভাবেই প্রতিস্থাপিত কৃত্রিম জয়েন্ট ব্যবহার করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিলে জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বেশ সহায়ক। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা সহ্য করে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। ফলে হাড়ের ক্ষয় আরও জটিল আকার ধারণ করে, সেইসাথে অপারেশন প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে যায়। বয়স্কদের পাশাপাশি এখন তরুণদের মধ্যেও স্পোর্টস ইঞ্জুরি বা এক্সিডেন্টের কারণে জয়েন্ট প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হচ্ছে। তবে সফল সার্জারির পাশাপাশি সার্জারি-পরবর্তী ফলো-আপ থেরাপিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, শুধু সার্জারি করালেই চলবে না, এর পরে সঠিক ফিজিওথেরাপি ও স্বাস্থ্যপরিচর্যা না করলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশে বর্তমানে জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট চিকিৎসা সেবা আগের তুলনায় অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে। এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য নাম। জার্মান, সুইস ও আমেরিকান উৎপাদিত ইমপ্লান্ট ব্যবহারের মাধ্যমে জয়েন্ট প্রতিস্থাপনকে নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী করার পাশাপাশি, এখানে আধুনিক পেইন ম্যানেজমেন্ট ও রিহ্যাবিলিটেশন প্রটোকল অনুসরণ করা হয়। এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে উন্নত ন্যাভিগেশন প্রযুক্তি, স্টেরাইল অপারেশন থিয়েটার, ইনফেকশন কন্ট্রোল সিস্টেম, রোবোটিক অ্যাসিস্টেড সার্জারি ইত্যাদি বিভিন্ন অত্যাধুনিক সুবিধা রয়েছে। আরও রয়েছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অর্থোপেডিক সার্জনদের বিশেষজ্ঞ টিম, আছে সার্জারি-পরবর্তী বিশেষ যত্নের ব্যবস্থা। ৯৫ শতাংশ সফলতা হার নিয়ে এখানে প্রতিবছর শতাধিক জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি সম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার খাতে এই অগ্রগতি রোগীদের জন্য আশার বার্তা তো বটেই, দেশের সার্বিক চিকিৎসাব্যবস্থার মানোন্নয়নের জন্যও একটি ইতিবাচক দিক। জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট এখন শুধুই ধনীদের জন্য নয়, বরং প্রযুক্তি ও দক্ষতার সহায়তায় এটি এখন প্রায় সর্বশ্রেণীর জন্য একটি সমাধান হয়ে উঠেছে।
– এমবিবিএস, এমএস (অর্থোপেডিক্স)
কনসালটেন্ট, অর্থোপেডিক্স অ্যান্ড জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি
এভারকেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রাম

