জন কিটস ও তাঁর গীতিকাব্য

141

সংক্ষিপ্ত জীবনে জন কিটস ইংরেজি ভাষায় কিছু অনিন্দ্য সুন্দর এবং চমৎকার কবিতা লিখেছেন। মহান অর্জনগুলোর মধ্যে, তাঁর পর পর ছয়টি গীতিকাব্য ১৮১৯ সালের মার্চ এবং সেপ্টেম্বর মাসে লেখা হয়েছে অবিশ্বাস্যভাবে যখন কিটসের বয়স মাত্র ২৪ বছর। কিটসের কাব্য প্রতিভা তাঁর সমসাময়িক সবাইকে বিমোহিত করেছিলো। তিনি ১৮২১ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে তাঁর গীতিকাব্য ‘টু অটাম’ লেখা শেষ করার প্রায় ১ বছর পর মারা যান।
জন কিটস ১৭৯৫ সালে লন্ডনের একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সে তিনি তাঁর পিতা-মাতা উভয়কেই হারান। তাঁর মা য²ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন যে রোগটি প্রায় পরবর্তীতে জন কিটসেরও মৃত্যুর কারণ। যখন তাঁর ১৫ বছর বয়স, তিনি একটি মেডিকেল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে তিনি মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন। যখন তাঁর বয়স ২০, তিনি তাঁর মেডিকেল প্রশিক্ষণ ত্যাগ করেন নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সাহিত্যে মনোনিবেশিত করানোর জন্য। তিনি তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশ করেন ১৮১৭ সালে, যেগুলো একটি প্রভাবশালী ম্যাগাজিন কর্তৃক কঠোরভাবে সমালোচিত হয় এবং পরবর্তী বছর তাঁর দ্বিতীয় বই প্রকাশিত হওয়ার পর তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ আকর্ষণ করে। ১৮১৮ সালে ডিসেম্বর মাসে কিটসের ভাই টম যক্ষায় মারা যান এবং কিটস তাঁর বন্ধুর সাথে হ্যাম্পস্টিডে চলে যান।
হ্যাম্পস্টিডে তিনি ফ্যানি ব্রাওয়িন নামে একটি যুবতী মেয়ের প্রেমে পড়েন। এই সময়ের মধ্যেই কিটস অসাধারণ সৃষ্টিশীল উৎসাহের অভিজ্ঞতালব্ধ হন যা তাঁকে একটি উচ্চতর মাত্রায় তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সকল সর্বোৎকৃষ্ট কবিতা লিখতে সাহায্য করে। তাঁর স্বাস্থ্য এবং অর্থ দুটোই তীব্রভাবে হ্রাস পায় এবং ১৮২০ সালে গ্রীষ্মের উষ্ণ আবহাওয়ায় তাঁর শরীরের সম্ভাব্য পরিবর্তনের আশায় ইতালি গমন করেন। পরবর্তীতে তিনি আর কখনোই তাঁর জন্মভূমিতে ফিরে আসেন নি। তাঁর মৃত্যু ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম অসাধারণ কাব্যপ্রতিভার সমাপ্তি ঘটায়। প্রকৃতপক্ষে সর্বকালের অন্যতম অসাধারণ কাব্যপ্রতিভার ইতি ঘটায়। জন তাঁর জীবদ্দশায় কখনোই সুনাম অর্জন করেন নি। (তাঁর স্মৃতিফলকের জন্য বিষাদময় অনুনয় “এখানে যে কবি শুয়ে আছেন তাঁর নাম ক্ষণস্থায়ী”)। কিন্তু তিনি তাঁর নিজস্ব ক্ষমতার আভ্যন্তরীণ গভীর আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে টিকেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কিছু দিন আগে তিনি বলেছিলেন যে তিনি বিশ্বাস করেন যে তিনি তাঁর মৃত্যুর পরে ইংরেজি কবিদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন।
কিটস ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ‘রোমান্টিসিজম’ এর একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যেটি একধরনের আন্দোলন যা প্রকৃতির সৌন্দর্য, আবেগ এবং কল্পনাকে ধারণ করে। এদের মধ্যে অধিকাংশ ধারণা এবং অন্তঃসার কিটসের মহান গীতিকাব্যের অপরিমেয় কাল্পনিক ধারণা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কল্পনা এবং সৃষ্টিশীলতার মধ্যে সম্পর্ক, সৌন্দর্য এবং কষ্টের প্রতি আবেগের সাড়া এবং সময় অনুসারে জীবনের পরিবর্তন এর প্রমাণ। যে ঐশ্বর্যিক ভাষায় তাঁর গীতিকাব্যগুলো লেখা, সেগুলোর সৌন্দর্য এবং সত্যের প্রতি আদর্শগত ধারণা এবং সেগুলোর মৃত্যু অভিমুখে সহজ বহিঃপ্রকাশ, সবই কল্পনার নির্বিষ্টচিত্ততা যদিও একই সাথে সেগুলো কিটসেরই দুর্লভ সৃষ্টিকর্ম।
একইভাবে, গীতিকাব্যগুলো বিশেষ ভাবে কোনো গল্প বলে না- সেখানে নেই কোনো সমন্বিত খন্ড এবং আবর্তক চরিত্র- এবং ক্ষুদ্র নজির রয়েছে যে কিটসের লক্ষ্য ছিলো এগুলোকে একসাথে শিল্পের অনন্য কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তা সত্তে¡ও এগুলোর মধ্যে ইঙ্গিতপূর্ণ আত্মসম্পর্কের বিস্ময়কর সংখ্যা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। গীতিকাব্যগুলো একই বিষয় অন্বেষণ করে এবং বিকাশ সাধন করে, একই ধরণের পন্থা ও চিত্রের অংশ হয়, এবং একটি নির্দিষ্ট পন্থায় আদেশ করে, সন্দেহাতীতভাবে মানসিক উন্নতির পথ প্রদর্শক হয়। এটা বলা যাবে না যে কবিতাগুলোর নিজস্ব কোনো পন্থা নেই- খুব দারুণভাবেই তাদের আছে; ধারাবাহিক লিখার শ্রেষ্ঠ আশির্বাদগুলোর মধ্যে একটি হলো, যে কোন দফায় এগুলো প্রবিষ্ট করানো যায়, সম্পূর্ণরূপে দেখা যায়, অথবা যে কোনো পরিপ্রেক্ষিতে আংশিক অবস্থান করে, এবং এখনো এর প্রমাণ আছে এবং পড়তে ফলপ্রসূ। এ বিষয়ে সমালোচনামূলক বিতর্ক হিসেবে চুক্তি রয়েছে, যে কন্ঠস্বরগুলো কবিতাগুলো বলে সেগুলো আসলে কি রকম আচরণ করে- যদিও একজন ব্যক্তির মাধ্যমে সব কবিতার কথা বলা যায়, তাদের পঠনের মাধ্যমে কি আসলেই সেটা বুঝায়, নাকি কিটস প্রত্যেক গীতিকাব্যের জন্য আলাদা আলাদা ব্যক্তি কল্পনা করেছেন?
এ প্রশ্নের সঠিক কোনো উত্তর নেই, কিন্তু এটিও সম্ভাব্য যে প্রশ্নটিই ভুল। প্রত্যেক গীতিকাব্যের ক্ষেত্রে কাজের প্রতি সচেতনতা কিটসের নিজের! এটি অত্যাবশ্যকীয় যে, কবিতাগুলো স্পষ্টতই আত্মজীবনীমূলক নয় (কিটসের ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা ঘটা অসম্ভব), কিন্তু এগুলোতে আন্তরিকতা ও শব্দমূল সংক্রান্ত সম্পর্কে ভরপুর। এরকম চিন্তা করার কোনো কারণ নেই যে এসব কিটসের মনের একই জায়গা থেকে আসেনি- বরঞ্চ বলতে হয়, এগুলো কিটসের নিজস্বতার প্রতিফলনের একই জায়গা থেকে লিখা হয়েছে। সেই অর্থেই, স্বীকার করতে ক্ষতি নেই যে গীতিকাব্যগুলো একই স্বরের ধারাবাহিক উচ্চারণে বলা হয়েছে। ‘ওড অন ইনডোলেন্স’ হতে ‘টু অটাম’ পর্যন্ত যে মানসিক অগ্রগতি দেখানো হয়, সেটি সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গতা, এবং অন্তরঙ্গতার এই মহান মাত্রা পথভ্রষ্ট হয় যদি কেউ কল্পনা করতে শুরু করে যে গীতিকাব্যগুলো কল্পিত বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে ধারাবাহিক ভাবে উচ্চারিত হয়েছে। যদি আপনি কবিতাগুলোর বক্তা নিয়ে আসলেই ভাবেন, কিটসকেই ভাবুন যেখানে তিনি এগুলো লিখার সময় নিজেকে কল্পনা করেছেন। যদি আপনি ‘ইনডোলেন্স’ এর নিশ্চল তন্দ্রাচ্ছন্নতা থেকে ‘অটাম’ এর সাদাসিধে জ্ঞানে বক্তার কক্ষপথের পদাঙ্ক খুঁজে পান, কন্ঠস্বরটির অগ্রগতি শোনার চেষ্টা করুন এবং কিটসের অসাধারণ ভাষার ছত্রছায়ায় নিজেকে পরিবর্তন করুন।
জন কিটসের গীতিকাব্যগুলোর বৈশিষ্ট্য :
মৃত্যুর অনিবার্যতা : এমন কি তাঁর প্রাথমিক য²া নির্ণীত হওয়ার পূর্বে কিটস, মৃত্যু এবং তাঁর অনিবার্যতার উপর জোরারোপ করেন। কিটসের মতে, ক্ষুদ্র এবং ধীরগতির মৃত্যু আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত ঘটে এবং কিটস এই মরণশীল ঘটনাগুলোকে একটি ক্রমবিন্যাস দিয়েছেন। প্রেমিক-প্রেমিকার আলিঙ্গনের সমাপ্তি, প্রাচীন কারুখচিত পাত্রের অবয়ব, শরতের ফসল উত্তোলন-এগুলো শুধুমাত্র মৃত্যুর চিহ্ন নয়, কিন্তু উদাহরণও। মহান সৌন্দর্য ও শিল্পের উদাহরণসমূহও কিটসকে মৃত্যু ভাবে ডুবিয়েছে, ঠিক যেমনটা হয়েছে ‘অন সিয়িং দ্যা এলজিন মার্বলস’-এ। একজন লেখক হিসেবে জন আশা করতেন, শেক্সপিয়র এবং জন মিল্টনের মত মহান কবি হতে তিনি হয়তো দীর্ঘদিন তাঁর কবিতাত্তি¡ক স্বপ্ন পূরণে বেঁচে থাকবেন। ‘স্লিপ এন্ড পয়েট্রি’-তে কিটস একটি সাহিত্যিক অর্জনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন যার জন্য তাঁর দরকার হয়েছিল এক দশকের মতো কবিতা পড়া শুধুমাত্র সেটা বুঝতে এবং তাঁর কাজে দক্ষতা অর্জন করতে। যাই হোক, যদি মৃত্যু তাঁর কাজে একটু বিরতি দিতো তিনি তাঁর স্বপ্নের প্রায় কাছে চলে যেতেন। যে আশংকা তিনি তাঁর “হোয়েন আই হ্যাভ ফিয়ারস দ্যাট আই মে চিস টু বি” সনেটে প্রকাশ করেছেন।
ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য : তাঁর কবিতায় তিনি সৌন্দর্য এর ক্ষণস্থায়ীত্বকে মৃত্যুর অনিবার্যতার বিলম্বের উপায় হিসেবে প্রস্তাব করেছেন। যদিও আমরা যে কোন সময় অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবো, আমরা অসীম প্রতিযোগিতা অথবা সুন্দর বস্তু এবং তৃণভূমির দিকে তাকিয়ে জীবন পার করতেই পারি। কিটস তাঁর ‘ওড অন এ গ্রেসিয়ান উর্ণ’ এ কারুখচিত পাত্রগুলোকে এবং ‘অন ফার্স্ট লুকিং ইন টু চ্যাপম্যানস হোমার’ এ বইকে এবং ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গেল’ এ পাখিকে ক্ষণস্থায়ী হিসেবে প্রকাশ করেছেন। অন্যান্য মরণশীল জিনিসের মতো হয়তো সুন্দর বস্তুগুলো কখনো মরবে না, কিন্তু বহু সময় ধরে তাদের সৌন্দর্যের প্রভাব খাটিয়ে যাবে। কিটস তাঁর প্রথম বই ‘এন্ডি মাইওন’ এ তা আবিষ্কার করেছেন। ‘ওড অন এ গ্রেসিয়ান উর্ণ’ এ বক্তা বংশীবাদকের সাথে শত্রæতা জ্ঞাপন করেছেন। গাছরাও এই প্রাচীন পাত্রের উপর ফুটে উঠেছে কারণ সে তার বাঁশি বাজানো কখনো থামাবে না, না কখনো এদের পাতা ঝরে পড়বে। তিনি অল্পবয়সী প্রেমিক-প্রেমিকাদের এই বলে নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন যে তারা হয়ত কখনো তাদের প্রেয়স ও প্রেয়সিকে চিহ্নিত করতে পারবে না যদিও তারা সুন্দর থেকেই যাবে। কারুখচিত পাত্রের উপর মানুষগুলো এই বক্তার মতই এসব অভিজ্ঞতালব্ধ হওয়া থামাবে না। তারা চিরস্থায়ীভাবে চাপা পরে যাবে যখন বক্তা পরিবর্তিত হবে, বৃদ্ধ হবে, হয়তো কোনো একদিন মরে যাবে।
সুর এবং সুরকার : কবিতা এবং কবির সঙ্কেত হিসেবে কিটসের সৃষ্টিশীল কর্মগুলোর সর্বাংশে সুর এবং সুরকারের প্রকাশ ঘটে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ‘ওড অন এ গ্রেসিয়ান উর্ণ’-এ, বক্তা বর্ণনা করছেন যে সুরকারেরা তাদের বাঁশি বাজাচ্ছেন। যদিও সোজাসুজিভাবে আমরা তাদের সুর শুনতে পাচ্ছিনা, আমাদের কল্পনাশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা সেই সুর কল্পনা করি এবং সর্বোপরি তাদের শুনতে পাই। ‘টু অটাম’ এর বক্তা আমাদের নিশ্চিতভাবেই বলেন যে, বসন্তকালের মতো শরৎকালেও গাওয়ার জন্য গান রয়েছে। শরৎকাল, নবজীবনের ঋতু, বসন্তের কবিতার মতোই মূল্যবান। ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গেল’-এ, মানবের নৈতিকতা এবং শিল্পের অমরত্বের বিপরীতে যেতে পাখির সুর ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে বক্তা, কবিতাকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে, পাখির সুর হৃদয়ে ধারণ করে বনে পাখির সাথে যোগ দিয়েছেন, এ রকম কল্পনা করছেন।
প্রকৃতি : তাঁর সমসাময়িক রোমান্টিক কবিদের মতো, প্রকৃতির মধ্যে কিটস অশেষ কবিসুলভ প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন, এবং যত্নের সাথে এবং নির্ভুলভাবে তিনি সেই প্রাকৃতিক বিশ্বকে বর্ণনা করেছেন। অন্যদের মধ্যে, প্রকৃতির, নিরীক্ষকের মতো দৃষ্টি কিটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ এবং শেলীকে, মানব অবস্থার দিকগুলো সম্পর্কে স¤প্রসারিত ধ্যান ধারণা এবং চিন্তাশীল গীতিকাব্য তৈরি করতে অনুমতি দিয়েছিলো। উদাহরণস্বরূপ, ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গেল’-এ, বক্তা, পাখির গান শুনে, মরণশীল মানব এবং শিল্পের অমরত্ব নিয়ে রোমন্থন করছিলেন। ‘ওড অন মেলানকোলি’ এর বক্তা বিষন্নতার উপলক্ষের সাথে “কান্নার মেঘ” এর তুলনা করেছেন, এরপর এমন ফুলের তালিকা তৈরি করছিলেন যেগুলো বিমর্ষতার সাথে যুক্ত। বক্তা তার মনস্তাত্তি¡ক দশার জন্য প্রকৃতির মধ্যে কার্যক্ষম ছবি খুঁজে পেয়েছেন। কিটস চিন্তন জায়গা থেকে শুধুমাত্র প্রকৃতিকে স্প্রিংবোর্ড হিসেবেই ব্যবহার করেননি, আবার তিনি কতগুলো প্রাকৃতিক উপমা, সঙ্কেত এবং রূপক আবিষ্কার করেছেন যেগুলো তিনি আত্মিক এবং আবেগপ্রবণ অবস্থা থেকে বর্ণনা করেছেন।