জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট পেতে ভোগান্তি

20

আজহার মাহমুদ

হয়রানি এই দেশের মানুষের একটা অলিখিত অভ্যাসে পরিণত। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে নানান ধরনের কাজে হয়রানির শিকার হতে হয়। কখনও পাসপোর্ট করতে গিয়ে হয়রানি, কখনও ভোটার আইডিতে সমস্যার সমাধান করতে হয়রানি, কখনও চেয়ারম্যন সার্টিফিকেট নিতে হয়রানি, কখনও রেশন কার্ড নিতে হয়রানি। হয়রানি আর হয়রানি। এরকম আরও কয়েকটার উদাহরণ দিতে বললে আমি নিশ্চিত যারা এই লেখাটি পড়ছেন তাঁরা সকলেই দিতে পারবেন। খুব উচ্চ শ্রেণীর ব্যাক্তি, দাপট, ক্ষমতা এবং পরিচিত না হলে যেকোনো জায়গায় হয়রানির শিকার হতে হয়। এটা বাংলাদেশের মানুষ এখন সহজভাবে নিতে শিখেছে। এখন বরং হয়রানি না হলেই একটু অবাক হই আমরা।
যাইহোক কথা লম্বা না করে মূল পয়েন্টে চলে আসি। এই সময়ের নয়, সবসময়ের জন্য অন্যতম একটা প্রয়োজনীয় জিনিস হচ্ছে জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট। জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট একজন নাগরিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দলিল এবং এটা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার। কিন্তু এই অধিকার আদায়ে সাধারণ মানুষের যে পরিমাণ ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে সেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষার্থীদের অনলাইন জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট করতে বলার পর এই ভোগান্তির পরিমাণ বেড়ে যায় সাধারণ মানুষের। এই সমস্যা সারা বাংলাদেশে নিশ্চই বিদ্যমান, তবে চট্টগ্রামে সরজমিনে যা দেখা গিয়েছে তা রীতিমতো চোখ কপালে উঠার মতো বিষয়। চট্টগ্রামের একটি ওয়ার্ডে সরজমিনে গিয়ে দেখা মিললো ভিন্ন একটি চিত্র। ওই এলাকার ভোটার না হলে মিলছে না তাদের সন্তানের জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট। অথচ এমন নিয়ম কোথাও নেই। একজন শিশুর জন্মনিবন্ধন করতে বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধ সার্টিফিকেট, ভোটার আইডি কার্ড এসব প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু ওই ওয়ার্ডের ভোটার হতে হবে এমন নিয়ম জানা নাই কারও। অথচ দিব্যি ওখানকার বাসিন্দারা ফিরে আসছে এমন অভিযোগ নিয়ে। এছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ওয়ার্ড অফিসে জন্মনিবন্ধনের জন্য যে ফরমগুলো রয়েছে সেগুলো প্রতি কপি ৩০ টাকা করে বিক্রি করছে ওয়ার্ড অফিসের এক কর্মকর্তা। অথচ ওই ফরমের উপর লেখা আছে সম্পূর্ণ ফ্রি!
চট্টগ্রামের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে চলছে আরও রমরমা কারবার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন বলেন, জন্মনিবন্ধন করতে গেলে নির্দিষ্ট ফি এর বাইরে কিছু টাকা দিতে হয়। যারা এই টাকা দিবেন তাদেও কাজ হয় সবার আগে। এমনভাবে ৩২, ১১, ১৬, ৯ নম্বর সহ নগরীরর বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের রয়েছে বিভিন্ন অভিযোগ। অথচ এই অভিযোগ আমলে নেওয়ার মতো নেই কেউ। দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি নগরবাসীকে করে তুলেছে অতিষ্ঠ। কিছু কিছু ওয়ার্ডের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, তারা নাকি বিনএপি ঘরনার মানুষ। এজন্য তাদের হয়রানী আর ভোগান্তির শিকার হতে হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রতিপক্ষকে ভোট দিয়েছে এমন অভিযোগ এনেও অনেক বাসিন্দাদের তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম পাওয়া গেছে চট্টগ্রামের ১০ নং ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডে জন্মনিবন্ধনের নির্দিষ্ট ফি ৫০ টাকা ছাড়া কোনো প্রকার বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ নেই। ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দা হারুন বলেন, আমাদের ওয়ার্ডের মানুষ জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট করতে পারছে সহজে। প্রয়োজনীয় তথ্য উপাথ্য দিলেই দ্রæতগতিতে মিলছে জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট। এই ওয়ার্ডের চান মিয়া ডাক্তারের বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা আরমান বলেন, আমার মা-বাবার এবং আমার অনলাইন জন্মনিবন্ধন করলাম কোনো প্রকার ভোগান্তি ছাড়া। জানা যায়, স্থানীয় কাউন্সিলর ড. নিছার উদ্দিন মঞ্জু নিয়মিত খোঁজ-খবর নিচ্ছেন এসব বিষয়ে।
ব্যতিক্রম ঘটনা এই একটা হলেও নানা অভিযোগ আর অনিয়মের ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ওয়ার্ডে। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের মুখে মুখে রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। কিন্তু এসকল বিষয়ে তদারকি করার মতো কেউ নেই। যার কারণে দিনের পর দিন এভাবেই হয়রনি আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ-বিষয়ে প্রয়োজন সরকারের সুনজর দেওয়া। সিটি মেয়রকেও এসকল বিষয় নিয়ে তদারকি করা জরুরি বলে মনে করছি। শুধু তাই নয়, জনগণের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে অভিযোগ দেওয়ার জন্য সহজ কোনো মাধ্যম বের করতে হবে। যেখানে নাগরিকগণ তাদের সমস্যার কাথা, হয়রানী-ভোগান্তির কথা লিখে অভিযোগ কিংবা সাহায্য চাইতে পারেন। এতে করে সাধারণ মানুষদের ভোগান্তি হয়তো কিছুটা কমতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক