জটিল সমীকরণ

10

সিরাজুল মুস্তফা

দুই ভাই সুমন আর পাভেল। পাভেলের এক বছরের বড় সুমন। দেখতে অবশ্য পাভেলকে বড় মনে হবে । কারণ ও ওর মামাদের মতো হয়েছে। একটু লম্বা চওড়া। অনেকটা পাকিস্তানি পাঠানদের মতো। সুমন মাঝারি মাপের। ওর আম্মুর সাইজ পেয়েছে। ওদের খুব অল্প বয়স যখন ওর আব্বু খুন হয়। কারা মেরেছে সাদিকা এখনো মুখে আনেনা। তবে এই খুনের একমাত্র রাজসাক্ষী কিন্তু সাদিকা। ওর ভেতরে চাপা কষ্ট অনকেদিনের জমানো কষ্ট। তাই কি ও এসব কাউকে জানাতে চায় না! নাকি সাদিকা নিজেই তার স্বামীর খুনি। ছি! ছি! এসব মুখে আনা পাপ। পাশ দিয়ে মধুমতি নদী একেঁবেকে বয়ে গেছে। অন্য পাশে ঢাকা-গোপালগঞ্জ মহাসড়ক। মহাসড়কের পাশ দিয়ে বাম পাশে মিনিট দশেক হাটলে বাজার পাবেন। বাজারটা ছোটখাটো কিন্তু বেচাবিকি যথেষ্ট। সকাল সকাল এলে খেতের টাটকা সবজি নদীর টাটকা মাছ পাওয়া যায়। এই হাটের নাম ঘোষের হাট। ঘোষের হাটে এককালে বঙ্গবন্ধু বাজার করতেন। খুব ছোট বেলায়। বাজারে সুমনের ইয়া বড় ভাতের হোটেল। মা রান্না করে দেয় ও বিকি করে। আজ বিশ বছর এভাবেই চলছে। বাবা মারা যাবার পর মাকে বাধ্য হয়ে কয়দিন ঝিয়ের কাজ করতে হয়েছিলো বাড়ি বাড়ি। পরে হাতের বালা জোড়া বেচে দিয়ে পরিতোষ বাবু তাকে এ ব্যবসা ধরিয়ে দেয়।
– ছেলে বড় হয়েছে মাইঝি শাদি দেবেন না?
– আজ্ঞে বাবু দেবো। ভালো সম্বন্ধ পেলে তবে আর দেরি নয়। এ বছরই নিয়ে আসবো।
– বলছিলাম কি মাইঝি আমার কাছে একখানা ভালো খবর আছে । মেয়েটি তোমার ক্লাশ এইটে পড়ে। বাবা দুবাই থাকে। ছেলেকে দুবাই নিয়ে যাবে। একটামাত্র মেয়ে। মা নেই। মা মারা গেছে মেয়ের জন্মতেই।
– ও বাবা নাগো না । ও মেয়ে হবে না। যে মেয়ে জন্মতেই তার মাকে খেয়েছে। সে মেয়ে রাক্ষসি। আমার সুমনকেও খাবে।
– ছি! ছি এসব বলছো কি মা! এই এতিম মেয়েটি তোমাকে মা বলে ডাকবে। তবে সমস্যা কি। মা-বাবা কারুর চিরকাল থাকে না। সবারই একদিন চলে যেতে হয়।
কথাগুলো বলছিলো মুরারি শীল। জাতে হিন্দু হলেও তার উঠাবসা সকল জাতের সাথেই আছে। ঘটকালি করে বেড়ায়। পাছায় পরার একখানা ভালো ধুতি পর্যন্ত নেই। তবুও চাটুলতা ভরপুর। জোড়া লাগানোর ডাক্তার সে। পাক্কা লোক। কতজনের ঘর বেধে দিয়েছে। সুমন ক্যাশে বসা তখন। মায়ের কথা শোনে ওর দম আটকে আসছিলো। কারণ সে যে আদিবাকে ভালবাসে। কথা দিয়েছে তাকে বিয়ে করবে ঘরটা তোলা হলে। আদিবাও তাকে বিশ্বাস করে খুব। সে বিশ্বাসের জোরে তারা দুজনে বেশ কয়বার শারিরিক সম্পর্কেও জড়ায়। এখন কি করে সুমন মাকে বলবে! সুমন একটু হাবাগোবা স্বভাবের ছেলে। পাভেল চালাক-চতুর। মনে মনে ভাবে সুযোগ বুঝে সে একবার পাভেলকে কথাগুলো বলবে। তবে হয়তো একটা পথ বেরিয়ে আসবে। বলতে না বলতে পাভেল হাজির। আসতে ক’মিনিট দেরি হলো বলে মা তাকে কঠিন করে বকে দিলো। সুমনকে বললো যা জলদি ¯œান করে আয়। সুমন মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলো। মনে তার কঠিন আনন্দ এই সময় ঘর ফাঁকা তাকে। আদিবার সাথে ওর রঙ্গ করার সময় এটা। আবার আজকের কথাগুলো তার কানে বাজে। যদিও মুরারিকে মা পাক্কা কোনো কথা দেননি। তবুও মা যদি রাজি হয়ে যান। ঘরে গিয়ে পুকুর ঘাটে ¯œানে গেলো লুকিয়ে লুকিয়ে টপ করে সে দেওয়াল টপকে আদিবাদের ঘরে ঢুকে গেলো আদিবার মা ক্যান্সারের রোগি। বাবা নেই। মারা গেছে তাও নাকি ক্যান্সারে। বড় ভাই সদরে কাপড়ের দোকান করে। চৌরঙ্গিতে মুমু বস্ত্রালয়। এই দোকান আগে আদিবার বাবা করতো করোনার সময় তার ক্যান্সার ধরা পড়ে। প্্রাথমিক অবস্থাতেই মারা যায় চিকিৎসার অভাবে। তখন ঘর থেকে বেরোতে পারেনি কেউ। ডাক্তাররা রোগি দেখেনি। যে কয়জন মানাবিক ছিলো তার ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চিকিৎসা করেছে। সুমন আদিবাকে একা পায়। আদিবার মা যেহতু শয্যাশায়ি সে ফাঁকে সে একা পেয়ে আদিবাকে একটু জড়িয়ে ধরে। একটু মাখামাখি করে। আদিবাও বাধা দেয় না। বিনিময়ে আদিবাকে সুমন কিছু টাকা-পয়সা দে। যেগুলো দিয়ে আদিবা মায়ের জন্য একটু ফল-মূল কিনে। মায়ের মুখ দিয়ে কিছু নামে না। গলায় ক্যান্সার। তাই একটু ফলের রসই কেবল সম্ভব। আজ সুমন আর দেওয়াল টপকাবে না। তার ভেতরে ভয় করে। যদি সে আদিবাকে বিয়ে না করে তবে আদিবার কি হবে! আদিবা যদি সব সমাজে রটিয়ে দেয়! সুমনের কি হবে! জটিল সমীকরণ। এদিকে সুমনের অজান্তেই আদিবা পাভেলের সাথেও প্রেম করে। তার সাথেও সে বেশ কবার লাগিয়েছে। সুমন যেমন জানেনা পাভেলের কথা তেমনি পাভেল জানেনা সুমনের কথা। আিদবা দুজনকেই বলে ও তাদের ভীষণ ভালোবাসে। সুমনকে ছাড়াও বাঁচবে না। আবার পাভেলকে ছাড়াও বাঁচবে না। আদিবার কাছে সুমন আর পাভেল দুই ভাই বন্দি।
২.
মায়ের শরীরটা খারাপ। প্রেশারটা একটু নেমে গেছে হয়তো। এমন মাঝেমাঝেই হয়। ডাক্তার বাবু বলেছিলেন নিয়মিত ওষুধ খেলে চলে যাবে। এ কোন জটিল কিছু নয়। বয়স হলে এমন এক আধটু হবেই। তবে পাভেলের মনে হয় মা বুঝি তাদের ছেড়ে চলে যাবে। সবাই ওকে মা পাগলা ছেলে বলে। মাকে খুব ভালোবাসে। প্রেশার কমে যাওয়ায় একবার মা মরার মতন পরেছিলো ঘরে। শুনে দৌড়াতে দৌড়াতে পাভেল বাড়ি যায়। নতুন বউয়ের মতন ভেউভেউ করে কাঁদে। এ নিয়ে লোকে ওকে নিয়ে মজা নিতে ছাড়ে না। মজা নেবে তো নিক। তাই বলে কি বেচারা মাকে ভুলে যাবে। সন্তান তার সুখেদুখে যে মাকে আজীবন ছাতা হিসেবে পায় সে মায়ের জন্য কাঁদবেনাতো কার জন্যই বা কাঁদবে। দিন কয়েক মা আর দোকানে আসতে পারেনি। ডাক্তার মাকে বলেছেন বিশ্রাম নিতে। দুই ভাইকে এখন একসাথে দোকান সামলাতে হচ্ছে। আদিবা ওদিকে চাতক পাখির মতন অপেক্ষা করে কবে আসবে পাভেল-সুমন। ওরা এলে ওর শরীরের জ্বালা যেমন মিটে মনের জ্বালাও মিটে। মেয়ে বলে কোন কাজ করতে পারে না। বাড়িতে অসুস্থ মা তাকে রেখে কোথাও যাবার জো নেই। এর মধ্যে ঘরে বসে পাভেল-সুমনের মতোন দু-একটা খদ্দর পেলে দোষের কি। মা সুস্থ হবার আগেই এবার পটলের মা আর মেজো মামি মায়ের কান বিষিয়ে তুলতে লাগলো ধামড়া ধামড়া হতচ্ছাড়া দুটো ছোকড়া থাকতে এখনো তুই রেধে খাওয়াস কেনো! আর কত করবি এমন। ছেলেদের জন্য বউ নিয়ে আয়। তোর এখন বিশ্রামের দরকার । জীবনে আর কত কষ্ট করবি। মায়েরও ইচ্ছে হয় নতুন বউ আনবে ঘরে। ছেলের বউয়ের হাতে বানানো নানান পদের তরকারি দিয়ে ভাত খাবে। আবার ভয় লাগে বউ তার এত যতেœর আদরের ছেলেগুলোকে তার থেকে কেড়ে নেবে নাতো! এখনকার মেয়েদের যা বায়না আমার দুটো ছোট বাচ্চা পারবে তো তাদের সামলাতে!
মায়ের শরীর যে আর ভালো হয় না। এবার বোধহয় তাকে পৃথিবী ছাড়তেই হবে। সুমনের জন্য বউ আনতে মনস্থির করে মা। মকসুদপুর এক সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে তার পছন্দ হয়। সুমনও গিয়েছিলো তার শ্বশুর তাকে জিজ্ঞাসা করছিলো মেয়ে তার কেমন লেগেছে। তার মুখে রা নেই। মা বললো আমার ছেলেরা মা ভক্ত আমি যা বলবো তাই ওদের শেষ কথা। মেয়েটির একটাই সমস্যা মা নেই। তবে মা সেটা মেনেই নিলো। তারও মেয়ে নেই বউ মাকে মেয়ের মতন যতœ করবে কথা দিলো। বিয়ে পাকাপাকি হলো। বিশ হাজার টাকা দেন মোহর ও বারো/চৌদ্দ জন লোকের খাবার এ শর্তে বিয়ে আগামি ২১ শে ফাগুন। দিন তারিখ সবই প্রস্তুত। বিয়ের দুই দিন আগে আদিবা আর সুমন একসাথে পুকুরে ডুবে মারা যায়। লোকমুখে তখন বলাবলি শুরু হয় ওদের মধ্যে কিছু একটা ছিলো। পাভেল তাদের শক্তভাবে জবাব দেয়। যেহতু পাভেল জানে আদিবার কার সাথে কি ছিলো। মাস না পেরোতেই মাকে একদিন স্বপ্নে দেখা দেয় সুমন। যেখানে মা আদিবাকেও দেখেছে সাথে তাদের একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান মাটিতে হামাগুড়ি খাচ্ছে। সুমন আদিবার সাথে রান্না ঘরে তরকারি কেটে দিচ্ছে মাকে যেমন কেটে দিতো। মায়ের ঘুম ভেঙ্গে যায়। তাহলে কি লোকের কথাই সত্য!