‘চুয়েটম্যান’ উপাচার্য প্রফেসর রফিকের কীর্তিকথা

19

সুরেশ কুমার দাশ

খ্যাতিমান মানুষের জীবনব্যাপি একটি নদী বয়ে চলে। নদীর জলরেখা, জলস্রোত, তরঙ্গনৃত্য, জলকেলি আর তাদের জীবন খাতা থেকে বাদ দেয়া যায় না। হয়তো শৈশবের সেই নদীটিই খ্যাতিমানদের সারা জীবনের প্রেরণাদয়ী। কবি আল মাহমুদের নদী ছিল গোমতী, জসীম উদ্দিনের পদ্মা, জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি- এমনি অনেক বিখ্যাতদের কথাই আসে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অনেক নদীর মধ্যে পদ্মার জলযানে ঘুরে ঘুরে লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। ভারতের বিজ্ঞানী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের ছিল সেই বিশাল এক সাগর। শৈশব থেকে তিনি বঙ্গোপসাগরের সাথে লড়েই মহীরুহ বিজ্ঞানি। চট্টগ্রামের কর্ণফুলীও মিশেছে বঙ্গোপসাগরের সাথে। কর্ণফুলী নদীতীরেই বেড়ে উঠা এক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব চুয়েটের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলমের। যার শৈশবের পরতে পরতে কর্ণফুলীর সাথে সখ্যের দিনগুলো। তার উৎসব-আনন্দ আর প্রেরণার প্রবাহধারা। সেই উদ্বেল তরঙ্গেই বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তির ছন্দে গড়া তার কীর্তিগাথা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের শিলাইদহে লিখেছেন পদ্মার প্রকৃতি আর বাংলার সবুজ দৃশ্যকল্প নিয়ে। ‘শৈশব সন্ধ্যা’ কবিতায় ভাবুক কবির সন্ধ্যার অতুলনীয় রূপকীর্তন- ‘বাল্যের খেলনাগুলি করিয়া বদল/ পায় নি কঠিন জ্ঞান! দাঁড়ায়ে হেথায়/নির্জন মাঠের মাঝে, নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়’, …
শৈশবের খেলনাসামগ্রীর সৌকর্যের কথা আছে। যা কৌতূহল, জ্ঞানবুদ্ধি-ভাবনা বিকাশের উৎসবিন্দুও। সব শিশুর পরিপার্শ্বই তার কৌতূহলকে এভাবেই উদ্দীপ্ত করে। কর্ণফুলী তীরের কৌতূহলী সেই ছেলেটি আজ মহীরুহ। ডালপালায় আবেষ্টন করেছেন তিনি তার চারপাশকে। বাহুবেষ্টনিতে ধারণ করেছেন বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষাকে। যে পরিসর আজ এক বিশাল ক্যানভাস জুড়ে। যার তত্ত্বাবধানে শত সহস্র প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও উচ্চপদে কর্মরত, গবেষণারত। সেই বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। যার উপাচার্য- প্রফেসর প্রকৌশলী ড. মো. রফিকুল আলম। একদা এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন তিনি, সেটির সর্বোচ্চ পদে আজ তিনি। চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার অগ্রসেনানীদের মধ্যে অন্যতম তিনি। গত প্রায় ৪২ বছর ধরে শিক্ষক হিসাবে যেমন তেমনি বর্তমানে উপাচার্য হিসাবেও অনন্য প্রতিভা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
উপাচার্য হওয়ার পর থেকে প্রফেসর রফিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করার জন্য চুয়েটের শিক্ষাকে ঢেলে সাজিয়েছেন। বিশদ পরিকল্পনার মাধ্যমে চুয়েট শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। ডিপিপির আওতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চুয়েটে বড় দুটি প্রকল্প দেন। এর মধ্যে একটি ৩২০ কোটি টাকার বড় প্রকল্প। প্রকল্প দুটি তিনি বাস্তবায়ন করেন। উপাচার্য রফিকুল আলম তার সময়ে চুয়েটে ইলেকট্রনিক এন্ড টেলিকমউিনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, পেট্রোলিয়াম এন্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং, মেটেরিয়াল সাইয়েন্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং, ওয়াটার রিসোর্স ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিজাস্টার ইঞ্জিনিয়ারিং সহ অন্তত ৯টি নতুন বিভাগ চালু করেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫টি বিভাগ এবং ২টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে।
এভাবে উপাচার্য প্রকৌশলী ড. রফিকের নেতৃত্বে চুয়েটের খ্যাতি ও কলেবর আরো বহুগুণ বেড়েছে। তিনি একশ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় করেন। এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক ভবন থেকে শুরু করে একাধিক একাডেমিক ভবন নির্মাণ করেন। দুটি হল, দুটি ছাত্রী হল, একে খান শিল্পগোষ্ঠি মাধ্যমে ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০০ জনের একটি ছাত্রীহল নির্মাণ করেন। জিমনেশিয়াম, খেলার মাঠ, খেলার মাঠে গ্যালারি, শিশুদের জন্য পার্ক, অন্য দুটি ছয় তলা বিল্ডিং নির্মাণ করেন। নির্মাণ করা হয়েছে ১০ তলার প্রফেসর কোয়ার্টার। এরকম আরও অনেক বড় বড় প্রজেক্ট চলছে উপাচার্য ড. রফিকের চুয়েটে। আর ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারিক সুবিধার জন্য ল্যাবরেটরি ও পাঠাগারকে ঢেলে সাজিয়েছেন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সর্বপ্রথম ইনকিউবেটর ‘চুয়েট শেখ কামাল আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর’ নির্মাণ করে চুয়েটকে সারাদেশে প্রযুক্তির জন্য ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসাবে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যান। এই ইনকিউবেটর ব্যবহার করে আইটি ব্যবসার বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন চুয়েটের মেধাবী গ্র্যাজুয়েটরা। ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল প্রফেসর রফিক চুয়েটের পঞ্চম উপাচার্য নিযুক্ত হবার পর চুয়েটকে প্রকৌশল শিক্ষার সেরা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
২০২০ সালের ২৫ আগস্ট তাকে পুনরায় একই পদে চার বছরের জন্য নিয়োগ প্রদান কওে সরকার। শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগি জ্ঞান সৃষ্টি, নতুন বৈজ্ঞানিক চিন্তা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনে তিনি ছাত্র, শিক্ষক ও প্রকৌশলীদের সভা, বিজ্ঞান সেমিনার, কর্মশালা সহ নানাভাবে সৃজনশীলতা বিকাশে কাজ করে যাচ্ছেন। বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে তার শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি ব্যাপক। যিনি প্লাজমা পদার্থ বিদ্যা, ফিডব্যাক সিস্টেম এন্ড কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ারিং, মডার্ন ইলেকট্রনিক্সের কঠিন বিষয়গুলো গবেষণা করে জ্ঞান ও বিজ্ঞানচিন্তাকে সমৃদ্ধ করেন।
বিশ্বের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেরা ছাত্রদের সাথে প্রতিযোগিতা করে সেরা শিক্ষকদের তত্ত¡াবধানে কৃতিত্বেও সাথে পি.এইচ-ডি. সম্পন্ন করেন। ৪২ বছর শিক্ষকতার পাশাপাশি দেশে-বিদেশে অনেক মর্যাদাপূর্ণ সভা, সেমিনার, কনফারেন্সসহ নানা ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে সুচিন্তিত, জ্ঞানগর্ব গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। দেশিবিদেশি বিভিন্ন জার্নালে তার তার অনেক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ড. রফিক চট্টগ্রাম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাস করার পর ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম মেধা তালিকা থেকে দেশখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ভর্তি হন। কৃতিত্বের সাথে বিএস-সি. ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর এমএস-সিও সম্পন্ন করেন।
কর্ণফুলী তীরের একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার মরিয়মনগরে ১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন প্রফেসর রফিক। তাদের বাড়ি থেকে তাকালেই চোখে পড়ত ¯্রােতস্বিনী কর্ণফুলী। মাতাপিতার স্নেহলালিত্যে শৈশব থেকে কর্ণফুলীর তীরেই তার স্বপ্ন বোনার পাঠ। স্বপ্ন বুনেছিলেন নিজকে দেশ ও সমাজের জন্য গড়ার। দশম শ্রেণী পর্যন্ত ১০ বছর এবং এইচএসসির ২ বছর বাদ দিলে তার বাকি জীবন চুয়েটের সাথেই। চুয়েট যেমন তাকে গড়ে তুলেছে তেমনি তিনিও চুয়েটের শত সহ¯্র ছাত্রের জীবন গড়ার দায়িত্বকে ব্রত হিসাবে পালন করেছেন। আজ তিনি একজন দেশের অন্যতম সেরা একজন শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, সার্থক প্রকৌশলী, দক্ষ প্রশাসক। যার চোখেমুখে এই জনপদের মানুষের স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখেন ধনি-দরিদ্র, শহর-গ্রাম সর্বত্র সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ-সুবিধার। কোনো শিশুই যেন শৈশব থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার না হয়- এটাই তিনি আশা করেন।
বহুদূর পথ হেঁটে শিক্ষা ব্যবস্থায় যেসব বৈষম্য দেখেছেন তার অবসান চান তিনি। মেধা, সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম, দক্ষতা যেন যোগ্যতার মাপকাঠি হয়। কর্পোরেট কালিমামুক্ত শিক্ষা ও শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণ তিনি চান না। কর্ণফুলী নদীর জলসমুদ্রের মতই শিক্ষা হবে সবার জন্য অবাধ ও মুক্ত। যিনি কর্ণফুলীর উদ্বেল আনন্দের ভেলায় চড়ে বিজ্ঞান শিক্ষার কঠোর ও কঠিন সাধনায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। তিনিই আজ চুয়েটে প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সকল প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে বদ্ধপরিকর।
একজন ব্যবসায়ী পিতার সন্তান চুয়েট উপাচার্য প্রফেসর প্রকৌশলী ড. মো. রফিকুল আলম। তার পিতা আবদুল হোসেন। মাতা খায়রুন্নেসা। আবদুল হোসেন ও খায়রুন্নেসা দম্পতির তিন ছেলে সকলেই উচ্চ শিক্ষিত। জ্যেষ্ঠ সন্তান শফিকুল আলমও ছাত্রজীবন থেকেই মেধাবি ছিলেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি সহ এসএসসি ও এইচএসসিতে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক-সম্মান ও মাস্টার্স শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। তারই ছোট ভাই চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর প্রকৌশলী ড. মো. রফিকুল আলম। তাদের সর্বকনিষ্ঠ মৌলানা খোরশেদ আলম। তিনিও নাম করা আলেম।
রফিকুল আলমও পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র। এসএসসিতে স্বর্ণপদক সহ উত্তীর্ণ হন। যখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছিল(পরে বিআইটি) তখনও বাংলাদেশে খ্যাতির চূড়ায় ছিল আজকের চুয়েট। যে প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি প্রকৌশলী শিক্ষা সমাপ্ত করেন তিনি সেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক বিভাগে ১৯৮২ সালের ১৯ আগস্ট প্রভাষক হিসাবে শিক্ষকতা পেশায় কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে সহকারী অধ্যাপক, ২০০৭ সালে সহযোগি অধ্যাপক, ২০০৯ সালে অধ্যাপক হিসাবে পদোন্নতি লাভ করেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত করার অন্যতম কারিগর। তার মতন শিক্ষকদের হাতে গড়া চুয়েটের ছাত্ররা আজ সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে। যারা বিশ্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি চিন্তা ও গবেষণার কাজ করছেন।
প্রফেসর ড. রফিকুল আলম চুয়েটের তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন, সিন্ডিকেট মেম্বার, আইইটি ও আইআইসিটির পরিচালক, ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য, কোর্স-কোঅর্ডিনেটর, মাস্টার্স সুপার ভাইজার, বিআইটি-এর বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য, এডভাইজরি কমিটির সদস্য সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি একজন দক্ষ সংগঠকও। তিনি বাংলাদেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের ২০২০-২১ মেয়াদে সভাপতি ছিলেন। তিনি বর্তমানে বোর্ড অব অ্যাক্রিডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশনের সম্মানিত সদস্য এবং বাংলাদেশ রিসার্চ এন্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক এর বোর্ড অব ট্রাস্টিসের মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেকশন বোর্ডের এক্সপার্ট মেম্বার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রকৌশলীদের পেশাজীবী সংগঠন ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি), চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, আইইবি-এর ফেলো এবং লোকাল কাউন্সিল মেম্বার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলম। পেশাগত জীবনে তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একজন সক্রিয় সদস্যও। ছাত্রজীবন থেকেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ও সক্রিয় সদস্য ছিলেন প্রফেসর রফিকুল আলম। ১৯৭০ সালে বাঙালির সাংস্কৃতিক ও স্বাধীকার আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি। বিশেষ করে ওই বছর জানুয়ারিতে মো. রফিকুল আলম ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ স্কুলপাঠ্যবই বিরোধী আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করলে তার রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। সেই ছাত্র আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানের ইয়াহিয়া সরকার বইটি পাঠ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ রেডিওতে শুনে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন। পরে বাংলাদেশের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধ থেকে তিনি দেশগড়ার দীক্ষা নেন।
প্রফেসর রফিকুল আলম ও মিসেস শাকিলা বেগম দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাদের একমাত্র মেয়ে ডা. মুশফেকা ইকফাত যুক্তরাজ্যের একটি হাসপাতালে কর্মরত, বড় ছেলে রাকিব বিন আলম যুক্তরাজ্য থেকে ইনফরমেশন টেকনোলজিতে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত। সর্ব কনিষ্ঠ ছেলে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নরত। কর্মব্যস্ত ড. রফিক স্বস্তি খুঁজে পান সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক আবেশে। অন্যান্য সঙ্গীতের পাশাপাশি রবীন্দ্র সঙ্গীত তার বেশি পছন্দের। যদিও তার সহধর্মিণী মিসেস শাকিলা বেগম একজন খ্যাতিমান নজরুল সঙ্গীত শিল্পী। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী এবং পেশাগত জীবনে সানোয়ারা গ্রæপের পরিচালক। চট্টগ্রামে অসংখ্য শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, দেশের বিখ্যাত শিল্প প্রতিষ্ঠান সানোয়ারা গ্রæপের কর্ণধার সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির কন্যা মিসেস শাকিলা বেগম।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়ম নগর গ্রামের বহু খ্যাতি থাকলেও একটি শিশুর জন্ম গ্রামটিকে মর্যাদার শীর্ষে নিয়ে গেছে। যিনি কর্ণফুলী নদীতে মাছ ধরে, নৌকার দাড় টেনে, সাঁতার কেটে নদীর তীরে হেসেখেলে বেড়ে উঠেছেন। যিনি ছাত্র জীবন থেকে বিজ্ঞান ও গণিতের তুখোড় ছাত্র ছিলেন। শৈশবের এক আনন্দঘন পরিবেশই তাকে একজন মেধাবী পদার্থবিজ্ঞানী, ইলেট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারে পরিণত করে।
ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম তার ‘আগুন ডানা’য় লিখেছেন, ‘আমি ছিলাম অনেক সন্তানের একজন। মাথায় ছোট, সাধারণ চেহারা। আমার মা-বাবা ছিলেন সুদর্শন, দীর্ঘকায়’। ‘চুয়েটম্যান’ উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রফিকুল আলমও হালকা গড়নের এক সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা অসাধারণ মানুষ। শান্ত, সৌম্য ঋষিতুল্য প্রতিচ্ছবি যেন বাঙালির প্রতিরূপ। তার যে পূর্ণতা- বিশাল হৃদয়ে চুয়েট’র মত এক সেরা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধারণ করা। শুক্র, শনিবার বলে কথা নেই। ক্যাম্পাসে চলে আসেন প্রত্যেকদিন। যে প্রতিষ্ঠানটির বিশাল ক্যানভাস, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, শ্রেণিকক্ষ যাকে দিয়েছে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার পাশাপাশি অদম্য মানবিক উদ্দীপনা।
লেখক: সাংবাদিক