চুল ছাড়া এক সংগ্রামী মডেলের গল্প

58

মডেলিংয়ের গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন রাজশাহীর মেয়ে মৌসুমী হুদা। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠিত একজন মডেল। পাশাপাশি করেন চাকরি। আবার সংসারও সামলান। দেশের মডেলিং জগতে এখন সবাই তাকে এক নামে চেনে। একশোর মতো অনুষ্ঠানে তিনি পারফর্ম করেছেন। কিন্তু মডেলিংয়ের জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে কঠিন সময়ের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে মৌসুমী হুদাকে। সম্প্রতি একটি ভিডিও বার্তায় সেসব জানিয়েছেন তিনি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় টাইফয়েডের কারণে তার মাথার সব চুল ঝরে যায়। তারপর থেকেই মৌসুমীর এক হতাশার জীবন শুরু হয়।
ভিডিও বার্তায় মৌসুমী বলেন, ‘আমি যখন এসএসসি পাস করে কলেজে যাই, তখন সবাই বলাবলি করতো, মেয়ে তো বড় হয়ে যাচ্ছে, মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না। মেয়ের তো এরকম সমস্যা। যার কারণে আমার বিয়ের জন্য ডিভোর্সি ও প্রতিবন্ধী ছেলে খুঁজে আনতেন প্রতিবেশীরা। কারণ, মেয়ের মাথায় চুল নাই। রাস্তাঘাটে মানুষ আমাকে দেখে হাসতো, একেক নাম দিয়ে খ্যাপাতো।’ ‘একটা সময় আমি খুবই হতাশায় ভুগতে শুরু করি। কারণ, বাবা-মা সবসময় মন খারাপ করে থাকতেন। বাবা প্রতিদিন রাতে আমার মাথার কাছে বসে কাঁদতেন। এটা ভেবে যে, সবার মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, আমার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না। আস্তে আস্তে আমি সবার কাছে কেমন যেন হয়ে গেলাম। মানে আমাকে দুই চোখে দেখতে পারে না, এরকম কিছু একটা।’ ‘এসব চাপ থেকে বাঁচতে ২০১৫ সালে আমি আমার জন্মস্থান রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায় চলে আসি। বন্ধুদের সহায়তায় ভর্তি হই একটা মডেলিং ক্লাসে। নিজের সম্পর্কে খুবই নেতিবাচক চিন্তাভাবনা করতাম সব সময়। আমার দ্বারা হবে না, আমি কাজ করতে পারব না, এই ধরনের। কারণ মডেলিংয়ে বেশিরভাগই চুলের ফ্যাশন ছিল। কিন্তু আমার মাথায় তো চুল নেই।
এ নিয়ে আমার অনেক কষ্ট হতো।’ ‘প্রথম থেকে দেড় বছর আমি র‌্যাম্পে পরচুলা পরে হেটেছি। তাও খুব কম। মাসে অন্যদের ১০টা কাজ হলে আমার হতো মাত্র একটা। মাথায় চুল নেই বলে প্রথমে মানুষ আমাকে কাজ দিতো না। আর এখন বলে, তোমাকে পরচুলা ছাড়াই কাজ করাবো। ২০১৬ সালের শেষের দিকে আমি প্রথম পরচুলা ছাড়াই র‌্যাম্পে হাটি।’ ‘আমি অনেক ভয়ে ছিলাম। অবস্থা এমন যে, আমার জ্বর চলে এসছিল। আমি ১০৩ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে স্টেজে হেটেছি। আমার মাথায় ট্যাটু করে দেয়া হয়েছিল। তখন সবাই আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছিল যে, মৌসুমী তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে, তুমি খুব সুন্দরভাবে হেটে আসো। এখন পর্যন্ত একশোর মতো অনুষ্ঠানে আমি মডেল হিসেবে র‌্যাম্পে হেটেছি।’ ‘আমি একসময় ভাবতাম, আমার চুল নেই। কেউ কাজ দেবে না, কিছুই করতে পারব না। আমি যখন ছোট ছিলাম, সবাই আমাকে দেখে কেমন যেন করতো। মাথায় চুল ছিল না বলে যারা নানাভাবে আমার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতো, এখন তারাই এসে আমার সঙ্গে ছবি তোলে। তাই যাদের যেটা দুর্বলতা, সেটাই তাদের শক্তি হিসেবে তুলে ধরা উচিত।’