চিরায়ত সংস্কৃতির ঐতিহ্য নবান্ন উৎসবকে টিকিয়ে রাখতে হবে

48

সঞ্জয় চৌধুরী

সংস্কৃতি হলো একটি জাতির সামগ্রিক পরিচয় তথা সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।একটি সমাজে সংস্কারের মধ্য দিয়ে যে আচার অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন যাবৎ পালিত হয়ে আসছে তাই সংস্কৃতি। একটি দেশের লোকাচার কিংবা জাতীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সংস্কৃতি ফুটে ওঠে। আবার এই সংস্কৃতির ভিন্নতার ফলে পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতির পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়।সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক থেকে বাঙালিরা বেশ সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের ছয়টি খতুতে একেক রকম আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নানা রূপে বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য ফুটে ওঠে। আবার অন্যদিকে ঋতু ও ফসল পরিক্রমায় বাংলার কৃষিতে রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যতায় আউশ, আমন, বোরো এই তিনটি ধানের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফসল হলো আমন ধান।এই ধান কাটার সময়টা প্রাকৃতিক ভাবে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। চারদিকে হালকা শীত শীত ভাব, মেঘহীন সুন্দর দিগন্তজোড়া নীলাকাশ ও সারা দিন মিষ্টিরোদ এবং সাথে বাতাসে বয়ে বেড়ানো মিষ্টি গন্ধ।আর সেই ফসল উঠানোর সময় কৃষকের মুখের হাসি যেন ফুরাতে চাই না। এই মুখের হাসিকে কার্যক্ষেত্রে রূপান্তরের বহিঃপ্রকাশ হলো নবান্ন উৎসব। এই নবান্ন উৎসবের সাথে মিশে আছে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির নানা বর্ণময় দিক। প্রাচীন কাল থেকেই বাঙালি নবান্নকে কেন্দ্র করে সামাজিক মেলবন্ধন তৈরীর মাধ্যমে উৎসবে মেতে ওঠে। সাধারণত আমাদের দেশে অগ্রহায়ণ মাস এলেই মাঠ জুড়ে ধান কাটার ব্যস্ততা চোখে পড়ে। ধান ভাঙার গান ভেসে বেড়ায় আকাশে বাতাসে। খড়ের পাড়া,মাটির নির্মিত বাড়িতে গোবরের গোলা দিয়ে নিকানো উঠান এবং তার মাঝে আল্পনা যা ছিল নবান্ন উৎসবে প্রতিটি গ্রামের এক চেনা দৃশ্য। প্রভাতের সূর্য কিরণে দুর্বাঘাসের ওপর শিশির বিন্দুগুলো মুক্তার মত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এ সময় ফসলের ক্ষেত ভরে ওঠে সোনালী ধানের হাসিতে এবং কৃষকের গোলা ভরে যায় সেই সোনালী ধানে। আর এই নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দে আয়োজন করা হয় এই নবান্ন উৎসবের যা আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য।
প্রতিটি কৃষকের ঘরে ঘরে সৃষ্টি হয় এক উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশ।হরেক রকমের পিঠাপুলি, পায়েস ও ক্ষীর তৈরী করে রসনার তৃপ্তি নিবারণ করা হতো এবং সাথে বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয় নবান্ন মেলা আর তার সাথে আয়োজন করা হতো জারি,সারি,লালন ও পালা গানের অনুষ্ঠান। ছোটদের বাড়তি আনন্দ দিতে গিয়ে মেলায় আসত নাগরদোলা, সার্কাস, পুতুল নাচ, বিভিন্ন রকম খেলনা ও খাবারের দোকান। তাই এককথায় বলতে গেলে বাঙালি সংস্কৃতির একটি নন্দিত অংশ এই নবান্ন উৎসব যা আবহমানকাল ধরে বাঙালিরা পালন করে আসছে। তাইতো কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ওঠে এসেছে এই নবান্নের জয়গান- ‘আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে, এই বাংলায় মানুষ নয়, হয়তো বা শংখ চিল শালিকের বেশে, হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে’ অর্থাৎ পরবর্তী জন্মে কবি মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করতে না পারলেও যেন পশুপাখি হয়ে নবান্নের এ দেশে আবার জন্মগ্রহন করতে পারে এটিই কবির যেন শেষ মিনতি। আসলেই নবান্নের এই দেশ প্রাকৃতিক ভাবে কতই যে সুসমৃদ্ধ তা আমরা কবির বর্ণনা থেকে স্পষ্টই বুঝতে পারছি। এখন যদি বাস্তবতার দিকে তাকাই তবে দেখতে পাই সময়ের পরিক্রমায় নবান্ন উৎসব সহ গ্রাম বাংলার চিরায়ত উৎসবগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।বিশ্বব্যাপী ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তন, শিল্পায়ন ও নগরায়নের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। ক্রমাগত পরিবেশ দূষনের ফলে বাংলাদেশের আবহাওয়া ক্রমাগত ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্য ক্রমাগত হুমকীর সম্মুখীন হচ্ছে।এছাড়া শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে মানুষ ক্রমাগত শহরমুখী হচ্ছে। এর ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি,যা সত্যিই আমাদের জন্য কষ্টদায়ক। অন্যদিকে বাঙালি সংস্কৃতির রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য সত্যিই গর্বের। তাই আগামী প্রজন্মের সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের জন্য এবং জাতি হিসেবে আমাদের স্বকীয়তা সমুন্নত রাখতে হলে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রীতিনীতি লালন করার কোনো বিকল্প নাই।তাই পরিশেষে বলতে চাই বিশ্ব যখন আধুনিকায়ন ও বিজ্ঞান ভিত্তিক উৎকর্ষের চরম শীর্ষে,তখন বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন রুখতে হলে জাতি হিসেবে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে এবং নবান্ন উৎসবের মত সংস্কৃতির আলোকিত দিকগুলো বাঁচিয়ে রেখে বিশ্বের বুকে বাঙালি সংস্কৃতির সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণœ রাখতে সদা সচেষ্ট থাকতে হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট