চার লেনের চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়ক

89

মনিরুল ইসলাম মুন্না

চার লেনের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে। দেশের টাকাতেই অর্থাৎ জিওবি’র মাধ্যমে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঠিক করা হয়েছে। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার ৮২৮ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা। কর্ণফুলী উপজেলার ওয়াই জংশন থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটারের এই মহাসড়ক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগ চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন।
তিনি পূর্বদেশকে বলেন, এরই মধ্যে মহাসড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) জমা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে প্ল্যানিং কমিশন হয়ে অনুমোদন হয়ে আসলে কাজ শুরু করা যাবে।
জানা গেছে, সরকারের বাস্তবায়নাধীন অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্পে এশিয়ার সাথে গুরুত্বপ‚র্ণ সড়ক যোগাযোগ (এশিয়ান কানেক্টিভিটি জোরদারকরণ) ভারত, মিয়ানমার ও চীনের সাথে সরাসরি আধুনিক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সড়ক বিভাগের দেয়া তথ্যমতে, নতুনভাবে প্রণীত ডিপিপি মূলে এই মহাসড়কের মোট দৈর্ঘ্য হবে ১৩০ কিলোমিটার, যা আনোয়ারা ওয়াই-জংশন থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত। চার লেনের এই সড়কের প্রস্থ হবে ২৫ দশমিক ২ মিটার। এ ছাড়া সড়কে ছোট বড় ২৬টি সেতু এবং ১৭২টি ছোট বড় কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে যেসব সেতু রয়েছে তার পাশে আরও একটি করে সেতু হবে। পাশাপাশি যেসব কালভার্ট ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলোকে সরিয়ে ফেলে নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও সড়কের পাশে করা হবে বাস-বে, জনবসতি ও স্কুল-কলেজ এলাকায় করা হবে ফুট ওভার ব্রিজ।
বুয়েটের সমীক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলা, অভয়ারণ্য, জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিবেশের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। এশিয়ান কানেক্টিভিটি গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিবেশ জীববৈচিত্র অভয়ারণ্য ও প্রাণীকূলের অবাধ বিচরণ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেই গুরুত্বপ‚র্ণ দিকটি বিবেচনায় এনে এই মহাসড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্পের সমীক্ষা কার্যক্রম শেষ করে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ হাদিউজ্জামান।
সওজ’র তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন বলেন, আমরা চেষ্টা করব, পূর্বের যে অধিগ্রহণকৃত জায়গা রয়েছে তার মধ্যে রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ শেষ করার। আমাদের সড়কের দু’পাশে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। তবে সেতুর কাজ করার সময় বড় স্পেস লাগে বলে অধিগ্রহণ করতে হবে।
এর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পরেই দেশের দ্বিতীয় ব্যস্ততম চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ১৩২ কিলোমিটার সড়ক রূপান্তর করার কথা ছিল এক্সেস কন্ট্রোলড হাইওয়েতে (এক্সপ্রেসওয়ে) ফ্লাইওভার ও বাইপাসসহ।
জানা গেছে, এডিবির অর্থায়নে সর্বপ্রথম ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সুইডিস কনসালটেন্ট নামে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ কাজের সর্বপ্রথম সার্ভে কাজ সমাপ্ত করে। পরে ২০১৭ সালের ৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভ সড়ক উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে বর্তমান সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে উন্নীতকরণের ঘোষণা দেয়ার পরে অবশেষে বহুল প্রত্যাশিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্প আলোর মুখ দেখছে।
প্রকৌশলী জাহিদ হোসেন বলেন, মহাসড়কটি জিটুজির মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য জাপানের মারুবেনির সাথে সবঝোতা হয়েছিল। সে পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দিয়ে মহাসড়ক উন্নীতকরণের জন্য সমীক্ষা করা হয়েছিল। সমীক্ষা প্রতিবেদন গত বছরের ডিসেম্বরে পাবলিক পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথরিটির কাছে দাখিল করা হয়। পরে সমীক্ষা প্রতিবেদনটিকে আরও উন্নতকরণের জন্য বলা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা পুনরায় যাচাই-বাছাই করে চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি দাখিল করেছিলেন। পরে জিটুজির পরিবর্তে সরকার ও জাইকার যৌথ অর্থায়নে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই প্রকল্পটি বাস্তবে আলোর মুখ দেখবে এমনটাই আশা করা হয়েছিল। ওই প্রকল্পে সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল ১২৬ কিলোমিটার আর মহাসড়কের দুই পাশে সার্ভিস লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণে (২৫ কিলোমিটার বাইপাস ও ফ্লাইওভার ছাড়া) সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। পরে সরকার দ্রæততম সময়ের মধ্যে মহাসড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্পটি নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।
শুধু চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের এ সড়ক নয়, কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়ক থেকে আনোয়ারা সদর, বরকল হয়ে চন্দনাইশ কলেজ গেটে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাথে যুক্ত হবে ১৭ কিলোমিটারের দীর্ঘ আরও একটি সড়ক। এতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার কমবে বলে জানিয়েছেন সওজের প্রকৌশলীরা। এছাড়া সড়কটি চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মাধ্যমে মাতারবাড়ি পাওয়ার হাব, মহেশখালী গভীর সমুদ্র বন্দর ও টেকনাফ স্থল বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর ফলে কর্ণফুলী টানেল ও ছয় লেনের সংযোগ সড়কের সাথে কক্সবাজারের সরাসরি সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হবে।
সওজ সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত সড়কটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বিকল্প সড়ক হিসেবে পরিচিতি পাবে। এটি চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া থেকে চন্দনাইশ সদর, বরকল সেতু, আনোয়ারা সদর হয়ে আনোয়ারা কালাবিবিরদীঘি মোড়ে এসে ছয় লেনের টানেল সংযোগ সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। বিকল্প এই সড়কটি হবে দুই লেনের। তবে বর্তমানে এই সড়কের প্রশস্থতা মাত্র ১৮ ফুট। গাড়ির চাপের কথা বিবেচনায় নিয়ে এর প্রশস্থতা বাড়ানো হবে ৩৪ ফুট। সড়কের দৈর্ঘ্য হবে ১৭ কিলোমিটার।
সওজের ছয় লেন সড়কের প্রকল্প কর্মকর্তা প্রকৌশলী সুমন সিংহ জানান, প্রস্তাবিত সড়কের নানাদিক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত সম্ভাব্য ব্যয় ও কাজ শুরুর সময় নির্ধারণ হয়নি। এ সড়কটির ক্ষেত্রে আপাতত নতুন করে অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়বে না।
জানা যায়, বিকল্প সড়ক বাস্তবায়নে আনোয়ারা-চন্দনাইশ সংযোগ সড়কের বরকল সেতুর কাজ প্রায় শেষ। চানখালী খালের ওপর ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই সেতু শিগগিরই যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি এই সেতু উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে।
এদিকে টানেলের সম্ভাব্য উদ্বোধনকে মাথায় রেখে শিকলবাহা ওয়াই জংশন থেকে কালাবিবির দীঘি পর্যন্ত সংযোগ সড়কের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সওজ কর্তৃপক্ষ যেকোনো উপায়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ছয় লেন সড়কের চার লেন রাস্তা পুরোদমে চালু করার টার্গেট নিয়ে কাজ করছে। তবে চাতরী চৌমুহনীসহ সড়কের তিনটি স্পটে উড়াল সেতুর কাজ প্রস্তাবনায় এলেও তা এখনই হচ্ছে না। পরবর্তীতে আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে চাতরী চৌমুহনী বাজারের পর টানেল সড়ক ও ছয় লেন সড়কের সংযোগস্থলে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে সড়কটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সওজ কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে সে রকম কোনো আশংকা নেই। সংযোগ সড়কের টার্নিং পয়েন্টে ঝুঁকি এড়াতে ইউটার্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তা সুমন সিংহ।