চসিক নির্বাচনে দুই মেয়র প্রার্থীর ইশতেহার গতানুগতিক প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তবায়নে আন্তরিকতা

14

আর মাত্র মধ্যখানে একদিন বাদে ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)এর বহু কাক্সিক্ষত নির্বাচন। এ নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের উৎসবমুখর প্রচারণা থাকলেও সচেতনমহলে একটি প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছিল যে, শেষ পর্যন্ত মেয়র প্রার্থীরা তাদের ইশতেহার দিবেন তো! প্রচারণার সময় আছে মাত্র ২দিন। আর ভোটের আছে তিনদিন। অবশেষে তিনদিন আগেই শনিবার দুপুরে মেয়র পদে প্রধান দুই প্রার্থী আওয়ামী লীগ মনোনীত বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম চৌধুরী ও বিএনপি মনোনীত ডা. শাহাদাত হোসেন দুই ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। রেজাউল করিম দুপুর পৌনে ১২টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে এবং ডা. শাহাদাত হোসেন নগরীর জামালখানের একটি রেস্তোরাঁয় সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন।
নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রেজাউল করিম চৌধুরী তার নির্বাচনী ইশতেহারে ৩৭ দফা দিয়েছেন। পক্ষান্তরে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন বিভিন্ন খাত নিয়ে নয়টি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ৭৪ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উভয়েরই প্রথম অঙ্গীকারে স্থান পেয়েছে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসন, সহনীয় পর্যায়ে গৃহকর আর প্রযুক্তি নির্ভর সর্বাধুনিক নগর গড়া। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিমের ইশতেহারের মূল স্লোগান ‘রূপসী চট্টগ্রাম আমার-আপনার অহঙ্কার অঙ্গীকার-সবারযোগে সাজবে নগর।’ আর ৩৭ দফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ১. জলাবদ্ধতা নিরসন, ২. ১০০ দিনের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা, ৩. যানজট নিরসন থেকে উত্তোরণ, ৪. সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ৫. নালানর্দমা, খাল নদী দখলদার উচ্ছেদ, ৬. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ৭. চট্টগ্রামকে পর্যটন রাজধানী করা, ৮. হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে নজরদারি ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, ৯. সরকারের চলমান মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা ১০. বন্ধ হয়ে থাকা নাগরিক পরিষেবা কার্যক্রম পুনঃচালু করা ইত্যাদি। অপরদিকে, দুপুরে চট্টগ্রাম নাগরিক ঐক্য পরিষদের সমর্থনে বিএনপি প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তার নয়দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। এতে তার মূল সেøাগান হচ্ছে নগর পিতা নয়, নগর সেবক হতে চাই। তার ইশতেহারে বিশেষ উল্লেযোগ্য ১. জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলা ২. বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে স্বাস্থ্যকর করা ৩. শিক্ষা ব্যবস্থাকে অটোমেশনের আওতায় এনে নগরীকে শিক্ষাবান্ধব হিসাবে গড়ে তোলা ৪. গৃহকর ও আবাসন খাতে নগরবাসী, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের জন্য গৃহকরমুক্ত করা ৫. পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে নান্দনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলা ৬. সন্ত্রাস দমনে উদ্যোগ নিয়ে নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়ে তোলা ৭. হাজার বছরের ঐতিহ্যের আলোকে চট্টগ্রামকে স¤প্রীতির মেলবন্ধনে আবদ্ধ করার প্রয়াস নেয়া ৮. চট্টগ্রামকে আধুনিক ও আকর্ষণীয় পর্যটন নগরীতে গড়ে তোলা ৯. তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের লক্ষ্যে আইটি পার্কসহ আইটি উপশহর গড়ে তোলা। আপাতত দৃষ্টিতে উভয়ের ইশতেহার বা নির্বাচনী লিখিত প্রতিশ্রæতি যাই বলি, কাছাকাছিই বলা যায়, বিশেষ করে নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্তকরণ, গৃহকর সহনীয় পর্যায়ে রাখা, যানজট নিরসন, প্রযুক্তি নিভুর আধুনিক নগরী গড়া, সবুজায়ন ও পরিচ্ছন্ন নগরী, আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থা, চসিকের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের অনন্য সেবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে আরো বিকাশমান ও গুণধর করা ইত্যাদি। আমরা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এ দুই প্রার্থীর ইশতেহার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতে দেখেছি। গণমাধ্যমগুলোও তাদের টকশোতে এ নিয়ে বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে। তবে নগরবাসীর যে প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষা তা হলো, প্রতিশ্রুতির ফুলজুরি নয়, বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়া। অতীতে মেয়র নির্বাচনেও বর্তমান প্রতিশ্রুতিগুলো প্রায় ব্যক্ত হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের খাতা খুব একটা পূরণ হয়েছে বলে মনে হয় না। এছাড়া, মেয়র নির্বাচিত হয়ে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কতটুকু তাদের কর্তৃত্বাধিনে বাস্তবায়ন করা যাবে-তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে যায়। কারণ, অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি রয়েছে যা চসিকের অধিন নয়। অন্যান্য সেবা সংস্থাগুলোই এসব কাজ করার এখতিয়ার রাখে। অতীতে এ নিয়ে কর্তৃত্ব ও অধিকারের দ্বন্দ্ব আমরা দেখেছি। সুতরাং সিটি কর্পোরেশনের ক্ষমতা ও অধিকার সুসংহত করা এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ নগরীতে এটিই একমাত্র জনপ্রতিনিধি কর্তৃক পরিচালিত হয়। আমরা আশা করি নির্বাচিত মেয়র সিটি কর্পোরেশনকে সিটি গভর্নর করার উদ্যোগ নিলেই বরং তাদের প্রত্যাশা পূরণে বড় সহায়ক হবে। আমরা আশা করি, আগামীতে যে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আসবেন তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টাই এ নগরী একটি বিশ্বমানের শহর হিসাবে গড়ে উঠবে।