চন্দ্রঘোনায় ফেরি পারাপারে দুর্ভোগ

50

মাসুদ নাসির, রাঙ্গুনিয়া

চট্টগ্রাম বিভাগের একমাত্র ফেরি পারাপার ব্যবস্থা চালু রয়েছে রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান দিয়ে। কর্ণফুলী নদীতে চালু থাকা এই ফেরি সার্ভিসের উত্তর পাশে চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়ার লিচুবাগান এবং দক্ষিণে রাঙামাটির রাইখালী ইউনিয়ন। এই দুই জেলার মাঝে সেতু বন্ধন রচনা করেছে চন্দ্রঘোনার এই ফেরি সার্ভিস। নদীর দুই পাড় দুই জেলায় অবস্থিত হলেও তিন পার্বত্য জেলার বাসিন্দারাও এই সড়ক বেশি ব্যবহার করেন। কাপ্তাই ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বাসিন্দারাও এখান দিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই ফেরির পল্টন ডুবে গিয়ে বন্ধ থাকে পারাপার। এছাড়া একটি ফেরি দিয়ে যাতায়াতে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষায় দাড়িয়ে থাকে যানবাহন। এতে প্রতিদিন চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় চলাচলকারীদের। পাশাপাশি দুর্ঘটনা তো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার এই ঘাটের জন্য। তাই এই স্থান দিয়ে স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবী দীর্ঘদিনের। সরকারের অনেক দায়িত্বশীলরাও গত ৩১ বছর ধরে স্থায়ী সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে এলেও, এতো বছরেও আলোর মুখ দেখেনি তা। তাই দুর্ভোগের পেরি পারাপার আর কতকাল সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। জানা যায়, ১৯৮৯ সালে কর্ণফুলী নদী পারাপারের জন্য ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। বর্তমানে রাঙামাটি সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের অধীনে ফেরিটি পরিচালিত হচ্ছে। ফেরিতে পাঁচ থেকে ৮টি ট্রাক বা বাস এবং ১৫ থেকে ২০টি ছোট যানবাহন উঠতে পারে। একবার পারাপারে সময় লাগে আধা ঘণ্টা। সকাল সাতটা থেকে রাত আটটা কিংবা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ১০টা পর্যন্ত এই সার্ভিস চালু থাকে। এমনিতে ফেরিতে ওঠার জন্য নদীর দুপাড়ে চন্দ্রঘোনা ও বাঙ্গালহালিয়া সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। আর ফেরি বিকল হলে কিংবা পল্টুন ডুবে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে থাকে যানজট। অথচ সেতু থাকলে পার হতে সময় লাগতো মাত্র ৩০ সেকেন্ড। তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছডড়ি এবং বান্দরবানের সাথে সড়ক যোগাযোগের জন্য কাপ্তাই ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে প্রবাহিত কর্ণফুলী নদীর উপরে থাকা এই ফেরী প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এছাড়াও কক্সবাজার এবং টেকনাফের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও কর্ণফুলী নদীর এই স্থানটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সারাপথ নিরাপদে আসতে পারলেও এখানে এসেই থমকে যেতে হচ্ছে সবাইকে। প্রতিদিন এই ফেরীর উপর দিয়ে ৫ শতাধিক ছোটবড় যানবাহন চলাচল করে বলে জানা গেছে। এছাড়াও অসংখ্য মানুষও এই এলাকা দিয়ে নৌকা ও সাম্পানযোগে যাতায়াত করছেন। এই ফেরীর উপর দিয়ে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং পুলিশেরও বিপুল সংখ্যক যানবাহন প্রতিদিন চলাচল করে থাকে। সেতু না থাকায়ত সবাইকেই কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। রাইখালীতে অবস্থিত রাঙামাটি জেলার একমাত্র পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, গবেষণা কেন্দ্রের প্রয়োাজনে এই ফেরি দিযয়ে যাতায়াত করতে হয়। অনেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এই গবেষণা কেন্দ্রে আসেন। কিন্তু ফেরির কারণে সহজে যাতায়াত করা যাচ্ছেনা। চন্দ্রঘোনা ফেরিঘাটে একটি সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবী। এদিকে ১৯৯১ সালে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী অলি আহমদ লিচুবাগানে কর্ণফুলী নদীর উপর সেতুর গুরুত্ব অনুধাবন করে এখানে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। ঐ ঘোষণা শুনে হাজার হাজার মানুষ আশায় বুক বেঁধে ছিল। ইতোমধ্যে ঘোষণার ৩১ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেতু নির্মিত হয়নি। রাইখালী ইউনিয়ন আওয়াামী লীগের নেতা ইউসুফ তালুকদার জানান, এই ফেরীর উপর দিয়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহে পার্বত্য মন্ত্রণালয় বিষযয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি, রাঙামাটির সাংসদ দীপংকর তালুকদারসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও নিয়মিত যাতায়াত করেন। বাস চালক মোফাজ্জল হোসেন জানান, বান্দরবান থেকে রাঙামাটি পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সড়কের পুরোটাই এখন খানাখন্দক বিহীন। এই পথে বাস চালানো আরাম দায়ক হলেও কর্ণফুলী নদীর উপর ফেরি পার হতে গিয়ে থমকে যেতে হয়। এখানে সেতু থাকলে মানুষের অনেক উপকার হত বলে তিনি মন্তব্য করেন। রাঙ্গুনিয়া কোদালা ইউপি সদস্য মো. ইসাহাক জানান, প্রায় সময় ফেরিপারে দুর্ঘটনার মুখে পড়ে মানুষ।
একবার তো ফেরি ছিরে একটা ট্রাক পানিতে পড়ে গিয়েছিল। রমজানে ফেরি জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ট্রাকের ধাক্কায় একই পরিবারের দু’জন মারা গিয়েছেন। এভাবে প্রায়শই দুর্ঘটনা লেগে থাকে এই ফেরিঘাটে। এই বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়েক বছর আগে একনেক এর সভায় এইখানে একটা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছিল, কিন্তু কেন এই প্রক্রিয়া থেমে আছে তাঁরা নিজেরাও জানেন না। প্রতি অর্থবছরে ফেরি থেকে কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। বাঙ্গালহালিয়া কলেজের অধ্যাপক রণজিৎ বিশ্বাস প্রতিদিন কলেজে যাতায়াতের জন্য ফেরি ব্যবহার করেন। তিনি জানান, ফেরি দিয়ে যারা চলাচল করে, তাদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। সেতু নির্মিত হলে এই দুর্ভোগ লাঘব হবে। তিন পার্বত্য জেলাসহ রাঙ্গুনিয়ার যাতায়তব্যবস্থার চিত্র পাল্টে যাবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি সাধন হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।