চন্দনগন্ধ

34

হাসনাত সৌরভ

তখনও আলো ফোটেনি, শুধু পাতলা হয়ে আসছে রাত। এইসময় অন্যরকম বাতাস বয়, গাছপালা চঞ্চল হয়ে ওঠে। আরেকটু পরেই জেগে উঠবে পাখিরা, তারপর মানুষ। কলর-বলর দিন শুরু হবে। বাসি মুখে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলো ফোটা দেখে তিতলি। কে যেন ডাকে, কেউ নেই জানে, তবুও বারবার মনে হয়।
হাতের মুঠোয় লালমোম রংটা ধরে নাড়াচাড়া করছিল তিতলি বহুক্ষণ ধরে। গাছ, নৌকা, খোড়োবাড়ি, জল, শাপলা, পাহাড় আর নীলাকাশের পরে একটা গোল সূর্য। হলুদ না কি লাল.. কোন রংটা দেবে বুঝতে পারছিল না তিতলি। একটানা বসে থাকতে আজকাল বড্ড কষ্ট হয় ওর। তবু আঁকতে বসতে চায়। এটুকুই তো বেঁচে রয়েছে। স্কুল তাকে ছুটি দিয়েছে। সাঁতার, গিটার, আবৃত্তি…সব তাকে ছেড়ে গেছে একে একে। শুধু সুলেখা আন্টি আসে সপ্তাহে একটি দিন। তিতলি আঁকে। আন্টি রং বুঝিয়ে দেয়। আন্টি না এলেও আঁকে সে। তিতলি’র হাতে ধরা লালরংটা ওর প্রিয়। ওটা রক্তের রং। তিতলির শরীরে কমতি জিনিসটার রং। যার যেটা কম, তার সেটার প্রতি টান বেশি। আন্টি হলুদ রঙের সূর্য আঁকে। ও লাল চায়।
মা ঘুমোচ্ছে। মা’র স্কুলে ছুটি। দিয়া, মিরন, রুপনরাও স্কুল যাচ্ছে না আজকাল। সবাই বন্দী। তিতলির মতো। ওদের ফ্লাটের গ্রাউন্ডে তিতলির বয়সি ছেলেমেয়েরা খেলে। জানালায় বসে সে দেখে। ওদের হাত নেড়ে ডাকে। ওরা মাথা তুলে কখনও তিতলিকে দেখে না। আসলে শুনতেই পায় না ওর ডাক। এখন গ্রাউন্ডও ফাঁকা থাকে। তিতলি আর কারো খেলা দেখতে পায় না। হঠাৎ করে কেমন যেন বদলে গেল সব। মা ভয় পায়। বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ‘‘নেক্সট শিডিউলে ব্লাড পাব তো?’’ বাবা চুপ করে থাকে।
সুলেখা আন্টি আসছে না দুসপ্তাহ হয়ে গেল। তিতলি নিজের মনে আঁকে। পুতুল, মাছ, জাহাজ, পদ্মফুল। রং ভরে। মা তাকে বুকে ধরে গল্প বলে। স্কুল বন্ধ থাকায় মা একটু সময় পাচ্ছে আজকাল। ওর ভালোই লাগছে। কত্ত গল্প বলে মা! ন্যাকড়াবুড়ির গল্প, বুড়ো আঙলার গল্প, তোতাকাহিনী…। তিতলির কষ্ট হয় অমল আর সেই দইওয়ালার গল্প শুনলে। তিতলি ভাবে, রবিঠাকুরও কি জানতেন ও আসবে পৃথিবীতে! অমলের মতো বন্দী থাকতে! দইওয়ালার চোখ দিয়ে পাহাড়তলীর গ্রাম দেখতে! তিতলিরও দইওয়ালা আছে। সুলেখা আন্টি। কিন্তু, এখন তারও আসা বারণ। তাই তিতলিরও পৃথিবী দেখা বন্ধ। তিতলি এখন আকাশ দেখে। এমন নীলরং তো কখনো ছিল না আকাশে! তাহলে কি শিল্পী বদলে গেল! কে জানে? কত দূর-দূরান্তের বিল্ডিংগুলো নজরে আসে আজকাল।
আঁকার খাতাটার সামনে একভাবে বসে রয়েছে তিতলি। লালরংটা মুঠোয় ধরা। হাত ঘামছে, সেদিকে হুঁশ নেই। থমথমে চারিধার। কে যেন বিরাট একটা তালা দিয়ে সকলকে বদ্ধ করে ফেলেছে। চাবি খোয়া গেছে। সারাদিন ধরে তিতলি রাস্তার লোকজন, সিএনজি, রিক্সা দেখেই কাটিয়ে দিত। এখন সেসব দেখা যায় না। গেলেও কম। একটা ফাঁকা সিএনজি হুস করে কখনো-সখনো পেরিয়ে যায়। একটা দুটো মানুষ অনেকটা সময়ের ব্যবধানে নজরে পড়ে।
মা আজ দুপুরে ভাত খাওয়ানোর সময়ে এক রাজপুত্রের গল্প বলেছে তাকে। সেই রাজপুত্র যে একদিন রাতে সবাই যখন বেঘোরে ঘুমিয়ে তখন ধীর পায়ে নিঃশব্দে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল দুঃখি-গরিব মানুষের কাছে, তাদের কান্না মুছিয়ে দিতে। তিতলি হাঁ করে শুনছিল। রাজপুত্র যখন রাত্রিতে পথে হাঁটছিল, চাঁদ তার গায়ে আলো মাখিয়ে দিচ্ছিল। চাঁদের আলোয় নাকি গন্ধ থাকে! চন্দনের গন্ধ। রাজপুত্র যে পথ দিয়ে যায় সেখানেই ছড়িয়ে থাকে সেই গন্ধ। সে ছিল যেন রাজপুত্রের সম্পূর্ণ নতুন এক জন্ম। আলাদা জীবন। তিতলির হাঁ-মুখে একটা ভাতের গোল্লা পুরে দেয় মা। তিতলি শোনে। শোনে আর ভাবে, ওর যখন নতুন জন্ম হবে তখনও কি চাঁদ তার গায়ে আলো মাখিয়ে দেবে? তিতলির তো এ জীবনটা বেশিদিনের নয়। নতুন জন্মের জন্য তো তাকে খুব শিগগিরই তৈরি হতেই হবে। তিতলির শরীরেও কি লেগে থাকবে চন্দনগন্ধ! মায়ের ধমকে তিতলির হুঁশ ফেরে, ‘সেই কখন থেকে মুখে একটা গোল্লা নিয়েই বসে রয়েছ তিতলি!’ মায়ের ধৈর্য্য কম। সুলেখাআন্টিই খাওয়ায় তাকে। মা তখন স্কুলে থাকে। ওর জন্যই মা’কে স্কুলে যেতে হয়। ঘনঘন রক্ত কিনতে অনেক টাকা লাগে যে। বাবা অফিস থেকে যা পায় তাতে হয় না।
গেটের ওপাশে ভুলো (কুকুর) চুপচাপ শুয়ে। ওর নাম ভুলো কিনা তিতলি জানে না। থাকবে হয়তো কোনো একটা নাম। ভুলো নামটা তার দেওয়া। সুনসান রাস্তায় ওইদিকের ছায়ার তলায় শুয়ে থাকে। কয়েকদিনেই কেমন যেন রোগাটে হয়ে গেছে ভুলো। তিতলি স্পষ্ট বুঝতে পারে। আগে খুব ছটফট করত। অকারণে চেঁচাত, ঘুরে ঘুরে খেলা করত। এখন গলায় আর সে জোর নেই। সামনের পা দু’টোর ফাঁকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে সারাটাক্ষণ। কারো আওয়াজ পেলে মাথা তোলে। কানদুটো খাড়া করে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ে। তারপর সেই হেঁটে যাওয়া মানুষটার পিছু পিছু কয়েক পা গিয়েই থেমে যায়। আবার ফিরে ছায়ায় শোয়। মুখটা গুঁজে দেয়। তিতলি দেখতে পাচ্ছে ভুলোর উঁচিয়ে থাকা পাঁজরের হাড়গুলো। অথচ কি সুন্দর দেখতে ছিল ভুলো। ওদিকের বাড়িগুলো থেকে বাটি করে ভাত-তরকারি ঢেলে দিয়ে যেত। চেটেপুটে খেতে খেতে জিভ নাড়ানো দেখে তিতলি মজা পেত। ওদিকের বাড়িগুলো থেকে এখন কেউ বেরোয় না। সকালে একটা সবজির ভ্যানগাড়ি এলে ব্যাগ ফেলে সবজি তুলে নেয়। সবাই তিতলি হয়ে গেল, কিংবা অমল। জানলা দিয়ে আকাশ দেখে। নীলাকাশ। ছাদে মেলে রাখা কাপড়গুলো জানান দেয়, বাড়িতে মানুষ আছে। একসাথে একঘরে অমলরা বেঁচে থাকে আটক হয়ে।
ফ্রিজ খুলেছে তিতলি। সকালের বেঁচে যাওয়া ভাত রয়েছে সামান্য। আজকাল মা কিছুই ফেলে না। রাতে রুটির জন্য কুমড়োর তরকারি রাখা বাটিতে। সকালেই বানিয়ে নিয়েছে মা। সুলেখা আন্টিকে ছুটি দিয়ে মায়ের এসব খাটুনি বেড়েছে। একটা বাটি এনে ভাতটা পুরোটা আর এক চামচ তরকারি তুলে নিল তিতলি। ফ্রিজ বন্ধ করল সন্তর্পণে। তারপর নব ঘুরিয়ে ফ্ল্যাটের দরজাটা খুলে বেরিয়ে এলো। ভিতরে মা ঘুমোচ্ছে। বাবা ল্যাপটপে কাজ সারছিল। কিছুদিন ধরে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছে বাবা। ভাগ্যিস, টের পায়নি কেউ!
কিন্তু, লবিতে এসে তিতলির পা কাঁপতে আরম্ভ করল। একটানা দাঁড়ানোর অভ্যাস চলে গিয়েছে। সিঁড়ি ধরেছে তিতলি। লিফ্ট বন্ধ করা আছে সোসাইটির নির্দেশে। কয়েকধাপ নামতেই হাঁফাতে থাকে সে। সিঁড়িতে কী ভীষণ অন্ধকার! না কি তিতলির মাথাটা ঝিমঝিম করছে বলেই ঝাপসা লাগছে সবকিছু। কেয়ারটেকার আঙ্কেল সিঁড়ির আলোগুলো জ্বালেনি কেন? ভুল ভাঙল তিতলির। সন্ধে ছ’টার আগে তো আলো জ্বালানোর নিয়ম নেই তাদের আবাসনে। তিতলির দোতলার চাতালে পৌঁছে মেঝেতেই বসে পড়ে। মাথাটা ঘুরছে। হাতের বাটিটা মেঝেতে নামিয়ে রাখে। একটু বুক টেনে শ্বাস নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ায় সিঁড়ির হাতল ধরে। নিচের ধাপে টলমলে পা রাখে।
গেটকিপার আঙ্কেলটা রুমে বসে ঢুলছে। গেটের পাশ দিয়ে একটা সিলিন্ডারের গাড়ি পেরোল। উত্তেজনায় তিতলি পায়ে জুতো পরতেও ভুলে গেছে। কংক্রিটের ওপর পা রাখতেই জ্বলে গেল যেন। শরীর টেনে টেনে হাঁটে তিতলি। গেটটা আটকানো ছিল। তিতলির পায়ের আওয়াজে কান খাড়া করে মাথা উঁচিয়েছে ভুলো। কিন্তু উঠে দাঁড়ায়নি। বাটিটা সামনে ধরে ভুলোর কাছে যেতে ভুলো দাঁড়াল। বুকের খাঁচাটা ওঠানামা করছে। লেজ নাড়ছে ভুলো। তিতলির পায়ে হাঁটুর কাছে মুখ বুলোচ্ছে। তিতলি বাটি উপুড় করে ভাত-তরকারি ঢেলে দিল। ভুলো তিতলিকে ছেড়ে ভাতে মুখ রেখেছে। চেটে চেটে খাচ্ছে। তিতলির হাঁটুতে পায়ে যেখানে যেখানে ভুলো মুখ বুলিয়েছে সেখানগুলোয় সুড়সুড়ি পাচ্ছে। তিতলি খিলখিলিয়ে হাসছে। এমন করে বহুদিন হাসেনি সে।
অনেকগুলো সিঁড়ি। অনেকগুলো। খালি বাটিটা হাতে ধরে উঠছে তিতলি। ধীরে ধীরে। হঠাৎ তিতলির মনে হল, সিঁড়ির আলোটা কেয়ারটেকার আঙ্কেল জ্বেলে দিয়েছে। ঝাপসা লাগছে না আর ততটা। না কি এটা চাঁদের মাখিয়ে দেওয়া আলো! আলো ঝলমলে সিঁড়ি ধরে ওপরের দিকে উঠছে তিতলি। সারা সিঁড়িময় ছড়িয়ে যাচ্ছে এক আশ্চর্য চন্দনগন্ধ।