চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দেদ আ’লা হযরত ঈমাম আহমদ রেজাখাঁন (রহ:)

7

এইচ, এম, মোবারক আলী রেজভী

চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দেদ আ’লা হযরত ঈমাম আহমদ রেজাখাঁন (রহ:) ছিলেন অধপতিত মুসলিম মিল্লাতের এক মহান পূর্ণ জাগরণ। তাঁর কর্মময় জীবনের পরিধি ও অবদান ব্যাপক ও বিস্তৃত। ক্ষুদ্র পরিসরে তাঁর বিশাল জীবন কর্ম উপস্থাপন করা রীতিমত এক দুঃসাধ্য ব্যাপার হুব্বে রসুল তথা নবী প্রেম তাঁর শ্রেষ্ঠ অর্জন। এক কথায় তিনি ছিলেন এক বিরল প্রতিভা সম্পন্ন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ৬৫ বৎসরব্যাপী কর্মময় জীবনে মাযহাব মিল্লাতের যে অপরিসীম খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন তা ইতিহাসের বিরল অধ্যায়।
ভারতে শায়িত আ’লা হযরত (রহ.) : ভারতে উত্তর প্রদেশের বেরেলী শহরে শায়িত আছেন ইমাম মুহাম্মদ আহমদ রেজা খান বেরলভী (রহ.)। তিনি ১৪ শাওয়াল ১২৭২ হিজরি ১৪ জুন ১৮৫৬ খ্রি. জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ মাওলানা রেজা আলী খাঁন তাঁর নাম রাখেন আহমদ রেজা খাঁন । পিতার নাম হযরত মাওলানা নকি আলী খাঁন। তিনি মাত্র ১৩ বছর ১০ মাসে শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করেন যা বিশ্বে খুবই বিরল ঘটনা। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষক জ্ঞান প্রতিভা দেখে অবাক হয়ে মন্তব্য করেন, মুহাম্মদ আহমদ রেজা তুমি কি জ্বিন না ইনসান ? কারণ আমার পড়াতে সময় লাগে কিন্তু তোমার মুখস্থ করতে সময় লাগে না।
তিনি এমন (স্মৃতিশক্তি) সম্পন্ন মহান ব্যক্তি ছিলেন ইমাম আলা হযরত কোরআন মজীদের হাফেজ ছিলেন না, একদা তাঁর এক ভক্ত তাঁর নামের প্রথম ভাগে অসাবধানতা বশত ‘হাফেজ’ শব্দটি সংযোজন করতে দেখেন, অতঃপর তিনি বললেন-‘আমি হাফেজ নই’, তবে যদি কোন হাফেজ আমাকে পবিত্র কোরআনের এক এক রুকু করে পড়ে শুনান, তবে তা আমার নিকট পুনরায় মুখস্থ শুনতে পারবেন। সুতরাং কর্মসূচি ঠিক হল- প্রতিদিন এশার নামাযের পূর্বে পবিত্র কোরআনের পারস্পরিক শুনানী আরম্ভ হলো। কি আশ্চর্য! মাত্র ত্রিশ দিনে ইমাম আলা হযরত ত্রিশ পারা মুখস্থ শুনান। অতঃপর এরশাদ করলেন বিহামদুলিল্লাহ (আল্লাহর প্রশংসাক্রমে), আমি এখন নিয়মিত গোটা কোরআন মজিদ মুখস্থ করে ‘হাফেজ’ হয়েছি। এতে তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো যেন আল্লাহর বান্দার কথা মিথ্যা না হয়।
তিনি অল্প বয়সে শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে শিক্ষকতা শুরু করেন। অতঃপর ফতোয়া রচনা ও অন্যান্য এনামি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে করে তাঁর শিক্ষকতার কাজ বেশিদিন চালু রাখতে পারেন নি। তিনি তাঁর পিতা হযরত মুফতী নকি আলী খানের সাথে হযরত আল-ই-রসুল মারহারাভী (র.) (১৮৭৮) এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। কাদেরীয়া সিলসিলায় পরবর্তীতে খিলাফত লাভ করেন। তিনি মুলত: মূজাদ্দিদ, মুজতাহিদ, মুফাচ্ছির, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক গানিতিক, ভাষাবিদ, বিজ্ঞানী ছিলেন।
তাঁর পিতা বাদে তাঁর ওস্তাদগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কজন হলেন শাহ আল-ই-রসুল ইন্তেকাল ১৮৭৯ইং, শেখ আহমদ ইবনে জাইনী দাহলান মক্কি ইন্তেকাল ১৮৮১ ইং শেখ আবদুর রহমান মক্কি ইন্তেকাল ১৮৮৩ ইং হোছাইন ইবনে সালেহ মক্কি ইন্তেকাল ১৮৮৪ইং শেখ আবুল হোসাইন আহমদ আল নুরী ইন্তেকাল ১৯০৬ ইং তিনি ব্যক্তিগত অধ্যয়ন দ্বারা বীজগণিত, রেখাগণিত, পাটিগণিত, যুক্তিবিদ্যা, তর্কশাস্ত্র, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান বিদ্যা বা পঞ্জিকা বিদ্যা, সমতল ত্রিভূজ বিদ্যা, অসমতল ত্রিভূজ বিদ্যা, চতুর্ভূজ বিদ্যা, আধুনিক জোতির্বিদ্যা, রসায়ন গণনা শাস্ত্র ইত্যাদি বিদ্যার উপর জ্ঞান অর্জন করেন।
তাঁর জীবনের বড় অংশ গ্রন্থ প্রণয়ন ও ফতোয়া লিখে ব্যয় করেন। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গ্রন্থ রচনা করেন। সাথে হজ্ব ও জেয়ারতের উদ্দেশ্য হেরম শরীফে গমন করেন। তখন মক্কা মুকাররমার প্রখ্যাত আলেমগণ তাঁর অসাধারণ জ্ঞান ও গুনাবলী দ্বারা প্রভাবিত হন। শুধু তাই নয় ত্রা প্রশংসার পাশাপাশি তাকে সম্মান দেখান তথাকার বিখ্যাত আলেম হযরত শেখ হোছাইন ইবনে সালেহ কর্তৃক রচিত “আল জাওয়াহারাতুল মুদিয়া” গ্রন্থের আরবী ব্যাখ্যা রচনা করে দেন মাত্র দু’দিনের মধ্যে। ১৯০৫ খ্রি. তিনি ২য় বার হজ্ব ও জেয়ারতের মদিনার উদেশ্যে পুনরায় হেরম শরীফে গমন করেন এবারও উভয় পবিত্র নগরীর মক্কা ও মদিনা শরীফের আলেমগণ তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি যে অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী উচ্চ পর্যায়ের ইজতেহাদি যোগ্যতার অধিকারী উপমহাদেশের যুগশ্রেষ্ঠ যোগ্য পÐিত এবং অসাধারণ আলেম ও ফকিহ ছিলেন তা তাঁর ফতোয়ার কিতাবসহ নানা বিষয়ে রচিত কিতাবাদী অধ্যায়ন করলে অনায়সে উপলব্ধি করা যায়। তিনি ১৯১১ সালে পবিত্র কোরআন মজিদের উর্দু ভাষায় তরজুমা “কনযুল ঈমান” রচনা করেন। তাঁর শিষ্য হযরত আল্লামা নঈম উদ্দিন মুরদাবাদী (র:) উক্ত তরজুমা গ্রন্থের টিকা গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ফতোয়ায়ে রেজভীয়া বহু খÐে বিভক্ত। তিনি কবিতা রচনায় ও সিদ্ধহস্ত ছিলেন।
তিনি উর্দু, ফার্সি, আরবি, হিন্দি প্রভৃতি ভাষায় সমান যোগ্যতায় কবিতা রচনা করে গেছেন। তাঁর সাধারণ কবিতাবলীতে সর্বক্ষেত্রে হুব্বে রসুল (দ:) ও নাতে মোস্তফার প্রেমে ঝলক পরিলক্ষিত হয়। তাঁর রচিত না’ত শরীফের বিখ্যাত গ্রন্থ “হাদায়েকে বখশিশ” সমগ্র বিশ্বে বহুল পরিচিত। তাঁর সমকালীন সমালোচকের সংখ্যাও কম ছিল না। বিশেষ করে অসাধারণ জ্ঞান ও নবী প্রেম এর কারণে সমালোচকরাও শংকিত থাকত।
কলম সম্রাট আ’লা হযরত (রা:) বিপুল সংখ্যক গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা দেড় হাজার প্রায়। তিনি ২৫ সফর ১৩৪০ হিজরি ১৯২১ খ্রি. শুক্রবার বাদ জুমা ৬৫ বৎসর বয়সে মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে সাড়া দিয়ে ইহজগত ত্যাগ করেন। আজ দেশের সর্ব ক্ষেত্রে ইসলামের নামে নানা বিকৃতি মতবাদ ঢুকে পড়েছে। ইসলামের মুলধারা সুন্নী মতাদর্শের শাশ্বত চেতনা ও দর্শন আজ সর্বত্রই উপেক্ষিত। তাই সুন্নী মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠানিক ও সামাজিক রূপ দিতে আ’লা হযরত দর্শন চর্চা আরো জোরদার করতে সমস্ত পীর মশায়েক ওলামায়ে কেরামগণ ও লেখকদের প্রতি লোহাগাড়া কলাউজান সুন্নী পরিষদের পক্ষে বিনীত আহŸান। আ’লা হযরত (রহ:) অপ্রকাশিত মূল্যবান রচনাবলী বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে তা প্রকাশ করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ ও বিজ্ঞ আলেমগণকে এগিয়ে আসার আহŸান জানান। (আমিন)

লেখক : প্রাবন্ধিক