চট্টল শার্দুল এম.এ. আজিজ

22

সালাহ্উদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু

চট্টল শার্দুল, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ, অবিসংবাদিত নেতা, গণপরিষদের সদস্য, অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম, এ আজিজ এর ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই অতল শ্রদ্ধা। তিনি ১৯২১ সালের ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার হালিশহরে জন্মগ্রহণ করেন। এমএ আজিজ ১৯৪০ সালে পাহাড়তলী রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয় হতে প্রথম শ্রেণিতে এস,এ,সি, ও ১৯৪২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ হতে এইচএসসি পাস করেন। এসময়ে তিনি অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সালে স্নাতক অধ্যয়নরত অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাÐের জন্য তাঁকে চট্টগ্রাম কলেজ হতে বহিষ্কার করা হয়। তিনি ব্রিটিশ ও পাকিস্তান উপনিবেশের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করেছেন।
ইতিহাস মতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ক, বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা এম.এ আজিজ ১৯৪৯ সালে অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫০ সালে পূর্ব মূলনীতি কমিটির রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং সরকারি মদদে যে সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯৫২ সালে তিনি চট্টগ্রামে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক হিসেবে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তিনি ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রিয় কার্য-নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে ৯২-ক ধারা জারি হলে স্বৈরাচার সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। ১৯৫৬ সালে তিনি যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৬৪ সালে তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর সাহচার্য পেয়েছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে পাকিস্তান সরকারের আমলে অসংখ্যবার গ্রেফতার হন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৬ দফা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ৬ দফা ঘোষণা করলে তাঁকে সমর্থন করে সর্বপ্রথম বিবৃতি প্রদান করেন এমএ আজিজ এবং তিনি তাঁর কয়েকজন সহকারি ৬ দফার পূর্ণাঙ্গ পুস্তিকা প্রকাশ করেন। ১৯৬৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর নেতৃত্বে লালদিঘি ময়দানে ৬ দফার পক্ষে প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি এক দফার প্রবক্তা। তিনি ১৯৬৯ সালে ঘোষণা করেছিলেন, পাকিস্তানিরা ৬ দফা না মানলে এক দফার আন্দোলন শুরু হবে এবং দেশ বিভক্তি হয়ে যাবে। ঐ বছরের ৮ মে নিরাপত্তা আইনে তিনি বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দিন আহমদ, জহুর আহমদ চৌধুরী প্রমুখের সাথে কারাবন্দি হন। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিব গ্রেফতার হলে মামলা পরিচালনার জন্য এমএ আজিজ ‘মুজিব ফান্ড’ গঠন করেন। ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জেলা আওয়ামী লীগের আহবানে মুজিব দিবস ও হরতাল পালিত হয়। ঐদিন লালদিঘি ময়দানে লাখো জনতার জনসভায় সভাপতির ভাষণে এমএ আজিজ লালদিঘি ময়দানের নাম পরিবর্তন করে ‘মুজিব পার্ক’ ঘোষণা করেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি ১৯৭০ সালের ১৮ জুলাই পুনরায় গ্রেফতার হন। তাঁর গ্রেফতারের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান এবং ২৭ জুলাই পালিত হয় ‘আজিজ দিবস’। ১৯৭০ সালের ১৫ আগস্ট তিনি মুক্তি লাভ করলে তাঁকে ডাকসু ও ইউকসু সংবর্ধনা প্রদান করেন। তৎকালিন পাকিস্তান সরকার তাঁকে গোলটেবিল বৈঠকে সদস্য মনোনীত করলেও তিনি তাদের আহবানে সাড়া দেননি। তিনি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে কোতোয়ালী-ডবলমুরিং আসন থেকে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানি ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে পঁচিশ হাজার দেন মোহরানা ধার্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন বঙ্গবন্ধু কারান্তরীণ থাকায় কারাফটকে নিয়ে গিয়ে জামাতাকে বঙ্গবন্ধুকে দেখানো হয়েছিল। প্রথম সন্তানের বিবাহে উপস্থিত থাকতে না পেরে বঙ্গবন্ধু মন খুব ব্যথিত ছিলেন। তখন এমএ আজিজ তাঁর সাথে কারাগারে সাক্ষাৎ করতে গেলে বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমার মেয়ের বিবাহ অনুষ্ঠানে থাকতে পারছি না। তোমরা আমার সহকর্মী, বন্ধু, তাঁর চাচারা আছো। তোমরা দেখো আমার অবর্তমানে মেয়ে যেন অসহায়বোধ না করে এবং জামাতারাও যেন আদর অভ্যর্থনার কমতি যেন না হয়। এমএ আজিজ বঙ্গবন্ধুকে কথা দিয়েছিলেন এবং তিনি কথা রেখেছিলেন। ঢাকায় শেখ হাসিনার বিবাহ অনুষ্ঠানে এমএ আজিজ উপস্থিত ছিলেন। এসময় তিনি ড. এমএ ওয়াজেদকে আলিঙ্গন করে বলেছিলেন, ‘বাবা তুমি চিন্তা করো না, সন্মান আমরা দেবো।’ এমএ আজিজ চট্টগ্রামে ফিরে এসে নবদম্পতির সংবর্ধনার আয়োজনে ভীষণ তৎপর হয়ে উঠেন এবং তিনি নিজ উদ্যোগে এককভাবে সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন। তৎকালিন ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জানে আলম দোভাষের বাসভবনে পরিকল্পনা করা হয়। কর্মীদের নিয়ে সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি সংবর্ধনার জন্য চট্টগ্রামের রাইফেল ক্লাব ভাড়া করলেন। সমগ্র অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও ২২ মহল্লা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মকসুদ সর্দার। যিনি এখনো কালের সাক্ষী হিসেবে বেঁচে আছেন। উক্ত বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে একহাজার লোকের খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল। কাচ্ছি বিরিয়ানি, মুরগি ও খাসির রোস্ট, দোপেয়াজা। বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ কামাল। এ অনুষ্ঠানে ড. ওয়াজেদকে এমএ আজিজের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে একটি নতুন মাজাদা গাড়ি প্রদান করা হয়েছিল। চট্টগ্রামের হোটেল শাহজাহানে এই নবদম্পত্তি রাত্রিযাপন করেছিলেন। (সূত্র দৈনিক পূর্বদেশ)
এমএ আজিজ একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ এবং দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান নেতা ছিলেন। নীতি ও আদর্শ থেকে তিনি বিন্দুমাত্র টলেননি। তাঁর অবদান চট্টলবাসির কাছে এক অবিস্মরণীয় গৌরবগাথা। রাজনীতিতে অসামান্য অবদানের জন্য চট্টলবাসি তাঁকে ‘চট্টল শার্দুল’ হিসেবে অভিহিত করেন। দেশ স্বাধিকার আন্দোলনে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য ২০০১ সালে তাঁকে ‘স্বাধীনতা পুর????র’ প্রদান করা হয়। তাঁর নামানুসারে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে ‘এমএ আজিজ স্টেডিয়াম’। তিনি ১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি পরলোক গমন করেন। লাখো মুসল্লির উপস্থিতিতে সেদিনের স্মরণাতীতকালের বৃহত্তম জানাজায় শরীক হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি চট্টগ্রামের মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এম.এ. আজিজ আমাদের মাঝে আজীবন বেঁচে থাকবেন।

লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, রাজনীতিক