চট্টগ্রাম সিআরবি’র বইমেলায় নিত্যপণ্যের স্টল নিয়ন্ত্রণ জরুরি

5

 

একুশের বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা। এদেশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে দেশের প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একুশের বইমেলা আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য। বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলার প্রভাবে দেশের বহু জেলা শহরে ফেব্রুয়ারি মাস এলে বইমেলা বসে। তৎমধ্যে চট্টগ্রামের বইমেলা অন্যতম। দেশের প্রেক্ষাপটে রাজধানী ঢাকার পর চট্টগ্রামের স্থান। জনসংখ্যার দিক থেকেও চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরী। চট্টগ্রাম দেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেছে। দেশের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর থাকায় চট্টগ্রাম হতে দেশের সরকার অধিক পরিমাণে রাজস্ব আয় অর্জন করে। শিল্পকারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য সর্বক্ষেত্রে চট্টগ্রামের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও চট্টগ্রামের উজ্জ্বল অবদান অস্বীকার করা যায় না। বহু কবি-সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী, গবেষক, ঐতিহাসিক জাতীয় পর্যায়ে এখান থেকে অসামান্য অবদান রেখেছে। প্রকাশনা শিল্পেও চট্টগ্রাম দেশের প্রেক্ষাপটে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। এখান হতে সব ধরনের গ্রন্থ সুন্দর শিল্পসম্মত ভাবে প্রকাশিত হয়। জাতীয়পর্যায়ে চট্টগ্রামের কবি-সাহিত্যিকরা, ঐতিহাসিক, গবেষকরা তাদের চিন্তার ফসলের অধিকাংশ চট্টগ্রামেই প্রকাশ করে থাকেন। মানের দিক থেকে চট্টগ্রামের প্রকাশনা ঢাকার চেয়ে কম নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলা একাডেমির বইমেলা যেভাবে একটা স্থায়ী মর্যাদা এবং ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে চট্টগ্রামের বইমেলা সেভাবে স্থায়ী ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে পারছে না। একসময় চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাবলিক লাইব্রেরি ময়দানে একুশে বইমেলা হতো। সেখানে জেলা প্রশাসন এবং চসিকের তত্ত¡াবধান থাকতো। মুসলিম হল তথা পাবলিক লাইব্রেরি ময়দান আকারে ছোট হলেও সেখানে বইমেলার যেভাবে গাম্ভীর্য এবং লেখক, পাঠক, প্রকাশকের স্বচ্ছন্দ ছিল তা খুবই সন্তোষজনক বলা যেতো। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং লেখক প্রকাশক বৃদ্ধির কারণে সৃজশীল প্রকাশনা পরিষদ, চট্টগ্রাম আরো বৃহৎ পরিসরে বইমেলা করার জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দিনের কাছে প্রস্তাব করলে সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির সাহেব চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশনা পরিষদের প্রস্তাব বিবেচনা করে ২০১৯ সালে চট্টগ্রামের বইমেলা চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়াম মাঠে নিয়ে যান। সেখানে বইমেলা বেশ জমে উঠেছিল নিজস্ব চরিত্রে। কিন্তু দুঃখের বিষয় জিমনেসিয়ামের বইমেলা এ বছর ২০২৪ সালে সিআরসি’তে স্থানান্তরিত হয়। সিআরবি শিরিষ তলা সাংস্কৃতিক কর্মকাÐের জন্য যতটুকু উপযোগী বইমেলার জন্য ততটা উপযোগী নয় বলে মত প্রকাশ করেন বোদ্ধারা। পূর্ব থেকেই এখানে নানা বয়সের নরনারীর সমাগম ছিল। এখানে নগরীর মানুষ বৈকালীন অবকাশ যাপনের জন্য ভিড় করে থাকে। বইমেলা আর অবকাশ যাপনের প্রাকৃতিক স্পট এক জিনিস নয়। এখানে লোক সমাগম থাকলেও বই বিক্রির বিষয়ে প্রচুর ঘাটতি আছে তা প্রকাশকদের বক্তব্যে প্রকাশিত। দৈনিক পূর্বদেশের প্রতিবেদন থেকে তা আরো স্পষ্ট। পত্রিকার প্রতিবেদন হতে জানা যায় দেশের বিদেশমন্ত্রী বিগত শুক্রবার মেলায় যান চসিকের পদক প্রাপ্তদের অনুষ্ঠানে, তার সম্মানে নিত্যপণ্যের স্টল এবং বিভিন্ন হকারদের বেচা-বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দেখা গেছে প্রশাসনের। বাস্তবে শিরিষ তলায় হকার ও খাদ্যদ্রব্যের বেচা-বিক্রির প্রবণতা বেশি। যার কারণে সিআরবি শিরিষ তলায় একুশে বইমেলা বিজয় মেলা কিংবা বৈশাখী মেলার রূপ পেয়েছে, যা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বলে পত্রিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বইমেলায় নিত্যপণ্যের স্টল দেয়া নিয়ে পাঠক, লেখক ও প্রকাশকরা সন্তুষ্ট নয়। বইমেলাকে বিনোদনে রূপান্তর করা যায় কিন্তু সে বিনোদন বইকেন্দ্রিক হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
চট্টগ্রামের বইমেলাকে একটা বড়পরিসরের মাঠে স্থায়ী করা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আমাদের চট্টগ্রাম মহানগরীতে বহু মাঠ আছে যা যোগাযোগের সুবিধাসহ বইমেলার ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা পায়। সেইরকম একটি মাঠে লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও বইপ্রেমিদের মিলন মেলা বসানো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উচিত বলে মনে করে বইপ্রেমি জনতা। সিআরবিতে মুসলিম হল কিংবা জিমনেসিয়ামের মতো যোগাযোগ সুবিধাও নেই। যার কারণে লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকদের অতিরিক্ত যাতায়াত খরচ বহন করতে হয়। সে কারণে অনেকে মেলায় একবার গেলে আর যেতে চায় না। লোক সমাগম সিআরবিতে ভালো। কিন্তু সে লোকসমাগম বইমেলার জন্য শুভকর নয় বলে মনে করে লেখক, পাঠক, প্রকাশক, সর্বসাধারণ এবং বিজ্ঞজনেরা।