চট্টগ্রাম নগরে আবারও জলাবদ্ধতা মুক্তি মিলবে কবে?

15

 

আষাঢ়ে গল্প নয়; একেবারে আষাঢ় তার বিমূর্ত রূপ নিয়েই হাজির। মেঘের গর্জন, অঝোর বৃষ্টি দিয়ে দিনের যে শুরু হল, রাতেও তা থামেনি। এরমধ্যেই থৈ থৈ জলে ভাসছে চট্টগ্রাম নগর। অর্থাৎ একদিনের বৃষ্টিতেই জলজটে নাকাল চট্টগ্রাম নগরবাসী। তবে নগরের এ করুণদশার দায় নিচ্ছেনা নগরীর সেবাদানকারী সংস্থাগুলো। বিশেষ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করে দায় এড়ানোর চেষ্ট করলেও নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে দ্রæত কোন কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। নগর বিশেষজ্ঞদেও মতে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কার্যক্রমের ধীরগতি, সবগুরেঅ খালের মাতায় ও সংস্কার স্থলে বাধ নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের খাল ও নালা-নর্দমাগুলো যথাযথভাবে নিয়মিত সংস্কারের অভাবের কারণে এবারও জলাবদ্ধতার নাখালে পড়তে হচ্ছে। বর্ষাকাল মাত্র শুরু, এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার দিনব্যাপী থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। এ একদিনের বৃষ্টিতে নগরীর নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী, স্কুল-কলেজ ও অফিসগামী মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাদ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে চলছে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। জলাবদ্ধতার কারণে শনিবার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়েছে। অনেক স্থানে বাসাবাড়ি, অফিস, দোকান ও গুদামে পানি ঢুকে ব্যাপক সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। একদিকে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের বিড়ম্বনা অপরদিকে নগরীর ছোট-বড় নালাগুলোর আবর্জনা অপসারণ না করায় সামান্য বৃষ্টিতে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ নগরবাসীর। নালা পরিষ্কার না করার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে (চসিক) দায়ী করছেন অনেকে। তবে চসিক এ দায় নিতে নারাজ, তারা এর জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (চউক) দায়ী করছে। সামনে আসছে বর্ষার ভরা মৌসুম। তখন টানা বৃষ্টিতে কী ধরনের দুর্ভোগে পড়তে হবে- তা আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে বৈকি। জানা গেছে, ২০১৭ সালে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ বছর মেয়াদে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ শুরু করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। ২০২০ সালের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ বাকি রয়েছে অর্ধেক। পরে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয় প্রকল্পের মেয়াদ। সঙ্গে বাড়ানো হয় ব্যয়। এ অবস্থায় মে মাসে এসেও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৬৭ শতাংশ। বাকি কাজও যে শিগগির শেষ হবে তার কোনো আলামত নেই। অভিযোগ উঠেছে, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটি একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়াই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। কারো মতামতের তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রকল্পগুলো নিয়েছে চউক। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিলেও তাতে কর্ণপাত করেনি। তাড়াহুড়ো করে করা সম্ভাব্যতা যাচাই, নিরীক্ষণ ও দুর্বল কর্মপরিকল্পনাই এর জন্য দায়ী। প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খাল খনন ও সংস্কার করে সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতে কী ধরনের জনবল কাঠামো লাগবে, কী ধরনের ইক্যুইপমেন্ট লাগবে প্রকল্পে- এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০টির কাজ শেষ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি নিষ্কাশনের কোনো জায়গা না থাকার কারণেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। চট্টগ্রামে যে খালগুলো ছিল সেগুলো ভরাট ও দখল হয়ে গেছে। তাহলে এ পানি যাবে কোথায়? ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে এ সমস্যা কমার সম্ভাবনা নেই। তবে কৃত্রিমভাবে যে ড্রেনগুলো আছে সেগুলো সঠিকভাবে মেরামত করতে পারলে কিছুটা স্বস্তি পাবেন নগরবাসী। এই ড্রেনেজ সিস্টেম মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ একক কর্তৃত্বে আনতে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ গুরুত্বসহ বিবেচনা করা প্রয়োজন। চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি কম হয়নি। সরকারের নানামুখী উদ্যোগ, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পরামর্শ কোনোটাই যেন কাজে আসছে না। আমরা মনে করি, জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রামের খালগুলো ভূমিকা রাখতে সক্ষম। নগরীর খালগুলো উদ্ধাওে জেলা প্রশাসনসহ নগর কর্তৃপক্ষকে আরো সোচ্চার হতে হবে। একইসাথে জলাবদ্ধতা নিরসনে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।