চট্টগ্রাম ও সিলেট উচ্চ ঝুঁকিতে

112

তুষার দেব

নিকট অতীতে ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত তুরস্ক ও সিরিয়ার মতো বাংলাদেশও ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। উত্তরে তিব্বত সাব-প্লেট, ইন্ডিয়া-প্লেট এবং দক্ষিণে মিয়ানমার সাব-প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। আর বাংলাদেশের সিলেট থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কয়েকটি প্লেট সক্রিয় থাকার কারণে এসব এলাকা বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তালিকায় দেশে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলের উত্তর অংশ, ময়মনসিংহ, রংপুর, ঢাকা, কুমিল্লা। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের চারটি জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে ময়মনসিংহ বিভাগের পাঁচটি জেলাও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী জেলার অংশবিশেষ, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভূ-তত্ত্ব বিশারদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল পূর্বদেশকে বলেন, ‘অনুভূত হওয়া ভুকম্পনের কেন্দ্র ভূ-পৃষ্ঠ থেকে বেশ গভীরে। রিখটার স্কেলে এগুলোর মাত্রাও মৃদু থেকে মাঝারি সীমার মধ্যে হওয়ায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। তবে দেশের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানগত কারণে অদূর ভবিষ্যতে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার- ত্রিদেশিয় অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন, বৈশিষ্ট্য অনুসারে এর অবস্থানকে পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্প বলয়ের মধ্যেই বিবেচনা করা হয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এবং এর আশপাশের অঞ্চলে ভ‚মিকম্প সংঘটিত হওয়ার মত বাউন্ডারি প্লেট বা ফাটল রেখা বেশ সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। যার ফলে যে কোনও সময়ে দেশে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এমনকি রিখটার স্কেলে তা আট বা নয় মাত্রারও হতে পারে। চট্টগ্রামের উপক‚লীয় অঞ্চল ছাড়াও রাজধানী ঢাকার মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে মধুপুর অঞ্চলে সাত থেকে সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার মত ভূ-তাত্ত্বিক ফাটল বিদ্যমান রয়েছে। এ ফাটল দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তুলনামূলক অস্থির ভূ-স্তরের ওপর অবস্থান করায় এখানে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার শঙ্কাও অনেক বেশি। ইন্দো-বার্মা-হিমালয়ান, ইউরেশিয় একাধিক ভূ-স্তর ফাটলের লাইন বিস্তৃত থাকায় এবং এর সঞ্চালনের কারণে বাংলাদেশ এবং এর আশপাশের এলাকার ভূমিকম্প বলয়টি বিশ্বের অন্যতম ক্রিয়াশীল বলয় বলে ভূ-তাত্ত্বিকরা মনে করেন। এসব অঞ্চলের বারবার মৃদু থেকে মাঝারি এবং কখনওবা তারও অধিক মাত্রার কম্পনের কারণে ভূ-ফাটল রেখাগুলো ক্রমশ শিথিল ও নাজুক রূপ নিয়েছে। যা আগামীতে শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটাতে পারে। উচ্চমাত্রার কোনও ভূমিকম্পের ফলে ভূ-অভ্যন্তরে যে ফাটল বা গ্যাপের সৃষ্টি হয় তা পূরণ করতে পরবর্তীতে আরও কিছু ছোট মাত্রার ভূকম্পন সৃষ্টি হয়। এ কারণে সেসব কম্পনে সাধারণত খুব একটা ক্ষয়ক্ষতি হতে দেখা যায় না।
ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় দেশে বর্তমানে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অপ্রতুলতা রয়েছে। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এখনও ভূমিকম্পের মত দুর্যোগ এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে মোটেও সচেতন নয়। বিশেষ করে হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিসসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্প প্রতিরোধী করে গড়ে তোলা জরুরি। এ মুহূর্তে অধিক ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকা ভবনগুলোকে দ্রুত রিট্রোফিটিং করার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। ভ‚মিকম্প সহনীয় টেকসই ভবনের জন্য প্রণীত বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-২০২০ দ্রুত প্রকাশ করে ভবন নির্মাণকারীদের তা মেনে চলার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়াও অত্যাবশ্যক। আপদকালীন পরিকল্পনা গ্রহণসহ ভূমিকম্প-পরবর্তী অবস্থা মোকাবেলা এবং উদ্ধার তৎপরতায় সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়া এবং তা প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও জনসচেতনতা তৈরি, সতর্কতা অবলম্বন ও ভূমিকম্পজনিত দুর্যোগ মোকাবিলার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়েই প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা অসম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল আর্থকোয়েক মডেলে রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা চার দশমিক নয় মাত্রায় হলে সেটিকে মৃদু ভূমিকম্প বলা হয়। কম্পনের মাত্রা পাঁচ থেকে পাঁচ দশমিক নয় হলে মাঝারি আর ছয় থেকে উপরের দিকে হলে সেটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।