চট্টগ্রামে শিশুদের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগ বাড়ছে

7

আসহাব আরমান

চট্টগ্রামে শিশুদের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সাধারণত শিশুরা জিনগত সমস্যার কারণে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। বয়স্করা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। কিন্তু বর্তমানে শিশুদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ফলে শিশু ডায়াবেটিস রোগী ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিস হাসপাতালের এক হিসাবে দেখা গেছে, হাসপাতালটিতে বর্তমানে ৮’শ জনের বেশি ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, স্থূলতা ও খেলাধুলা কিংবা কায়িক ব্যয়াম না করার কারণে শিশুদের মধ্যে এই রোগ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি সম্পর্কে অসচেতনতা শিশুদের ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। যেসব মা গর্ভকালীন পর্যাপ্ত পুষ্টি পান না, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে তাদের শিশুদের অগ্ন্যাশয়ে ঠিকমতো ইনসুলিন তৈরি হয় না। আর বংশগত বা জন্মগত ত্রুটির কারণ তো আছেই। ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগই টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এদের সারাজীবন ইনজেকশনের মাধ্যমে ইনসুলিন গ্রহণ করতে হয়। অন্যদিকে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার কারণ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ, হাঁটাহাঁটি কম করা, খেলাধুলা কিংবা কায়িক ব্যয়াম না করা। শনাক্তের ১০-১২ বছর পূর্বেই শরীরে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয় থাকে এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় শনাক্ত করা গেলে ৬০-৭০ ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৮০০ জনের বেশি ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুর রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। হাসপাতালটিতে ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ২০১০ সালে এই হাসপাতালের ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ছিল ১৬০ জন এবং ২০০৫ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালে নিবন্ধিত ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুই লাখ ১১ হাজার ৯৫৫ জন। এছাড়া হাসপাতালটির ইনডোরে চার হাজার ১ ১০৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছে এবং গত এক বছরে হাসপাতালটির বহির্বিভাগে ৪৪ হাজার ৬৮১ জন ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালটির ইনডোরে ডায়াবেটিস রোগী ভর্তি হয়েছেন ৮২২ জন। এর মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৭৫০ জন, টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ২২ এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৫০ জন। অন্যদিকে হাসপাতালটির বহির্বিভাগে গত এক বছরের ৯ হাজার ২৩৯ জন রোগী। এর মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগী ৯ হাজার, টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগী ৩৯ জন ও গর্ভকালীন রোগী ২০০ জন। এদের অধিকাংশই গৃহিনী ও শিশুরোগী।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান ডা. ফারহানা আক্তার পূর্বদেশকে বলেন, শিশু এবং গৃহিনীদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে এই ধারণা ভুল প্রমাণ করে শিশু ও গৃহিনীদের মধ্যে ডায়াবেটিস আক্রান্তের হার বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হলো অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা, হাঁটাহাঁটি কম করা, খেলাধুলা না করা। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীতে উন্মুক্ত খেলার মাঠের সংখ্যা দিনদিন কমে আসছে। ফলে খেলাধুলা না করা শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বাড়ছে। পরবর্তীতে স্থুলতার কারণে এসব শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপক মো. আমান উল্লাহ আমান পূর্বদেশকে বলেন, আমাদের হিসাব অনুযায়ী এই হাসপাতালের প্রায় ৮০০ জনের বেশি ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুরোগী চিকিৎসা করা হয়েছে। মায়ের ডায়াবেটিস রোগ থাকলে একদম ছোট অবস্থায় শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের কারণেও শিশুরা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে আমাদের হাসপাতালের শিশুরোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও সরাঞ্জাম দেওয়া হয়।
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস : আজ মঙ্গলবার বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও জনসচেতনতার লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হচ্ছে। চট্টগ্রামেও নানা আয়োজনের মধ্যদিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডায়াবেটিসের ঝুঁকি জানুন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। অর্থাৎ ডায়াবেটিস সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারলে একে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ১৯৯১ সালে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন (আইডিএফ) ১৪ নভেম্বর তারিখটিকে ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৭ সাল থেকে পৃথিবীজুড়ে দিবসটি পালন শুরু হয়। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অনুরোধে বাংলাদেশ সরকার ১৪ নভেম্বর ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ পালনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব করে। বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন এবং সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। আগামী চার বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সে হিসেবে দেশের চারটি অসংক্রামক রোগের মধ্যে অন্যতম এই ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২০২৫ সালের মধ্যে দেড় কোটি ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজন ডায়াবেটিস রোগীর মৃত্যু হয় এবং দুই জন নতুন ডায়াবেটিস রোগী শনাক্ত হয়। আইডিএফ ডায়াবেটিস এটলাস ডায়াবেটিসের বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে সর্বশেষ যে পরিসংখ্যান এবং তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা যায়, ২০২১ সালে ৫৩.৭ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ২০৩০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬৪.৩ কোটিতে এবং ২০৪৫ সালে ৭৮.৩ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ২৪ কোটি মানুষ জানেন না তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাদের অধিকাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত। ১২ লাখেরও বেশি শিশু ও কিশোর (০-১৯ বছর) টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০২১ সালে বিশ্বের ৬৭ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ২০২১ সালে ৯৬৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় ডায়াবেটিসের কারণে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের ৯ শতাংশ।