চট্টগ্রামে প্রাচীন জাহাজ মালিক রঙ্গীপাড়ার বছির মোহাম্মদ সওদাগর ও তঁ­­ার সময়কাল

মুহম্মদ আমির উদ্দিন

20

আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর পূর্বে বছির মোহাম্মদের জাহাজ বাণিজ্যের ঘটনা চট্টগ্রামের জাহাজ শিল্প ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করবে। ইতিহাস গবেষক পূর্ণচন্দ্র চৌধুরী বলেন, “সেইকালে মদন কেরানি, জগমোহন মহাজন, গুমানী মালুম, আছদালী মালুম, আকবর আলী মালুম, দেওয়ানালী, রঙ্গাবছির, জর্বর আলি সদাগর, কোর্বান আলী সদাগর, আবজান বিবি, আচমত আলি সদাগর, ধনু সদাগার, বক্সা আলি সদাগর দাতারাম চৌধুরী প্রভৃতির অনেক বাণিজ্য জাহাজ ছিল”। (চট্টগ্রামের ইতিহাস, ১৯২০: ১১৪)। সেকালে যে ১৪ জন জাহাজ মালিকের নাম উল্লেখ আছে তার মধ্যে রঙ্গাবছির যিনি উত্তর আগ্রাবাদের রঙ্গীপাড়া গ্রামে ১৮০০ সালের দিকে জন্ম গ্রহণ করেন। বসির মোহাম্মদের পিতা আমিন খলিফার ‘বাক আলমা’ ও ‘আবদুর রহমান’ নামে দু’টি পালের জাহাজ ছিল। সেসময়ের জনৈক হিন্দু সওদাগরের জাহাজ ‘বাকল্যান্ড’ এর নামানুসারে আমিন খলিফা হয়ত তাঁর জাহাজের নাম রেখেছিলেন ‘বাক আলমা’।
রঙ্গাবছিরদের ১৮৫৭ সালের ভাটোয়ারা দলিল ও তাঁদের সি.এস, আর. এস খতিয়ান, তাঁদের বংশধারার পরবর্তী প্রজন্ম প্রখ্যাত মুন্সী আহমদ হোসেনের মৃত্যু সময় (১৯৩৭) ও আমাদের হাতে থাকা কিছু দলিল পত্র পর্যালোচনা করে বসির মোহাম্মদদের (আনুমানিক) সময়কাল নিরূপন করা যায়। যেহেতু ১৮৫৭ সালে পৈত্রিক সম্পত্তি বছির মোহাম্মদ ও হাছন আলী সওদাগরের মধ্যে বন্ঠন হচ্ছে সেহেতু ধারণা করা যায় এর কিছুদিন পূর্বে তাঁদের পিতা মোহাম্মদ আমিন খলিফা মৃত্যুবরণ করেছেন এবং সে সময়টা হতে পারে ১৮৫০-১৮৫৫ এর মধ্যে। হাছন আলী সি.এস. খতিয়ান প্রস্তুতের সময় জীবিত থাকলেও বছির মোহাম্মদ বেঁচে ছিলেন না এবং বন্টননামার এক জায়গায় বছির মোহাম্মদ হাছন আলীকে তুমি সম্বোধন করছেন-এ থেকে ধারণা করা যায় বছির মোহাম্মদ বড় ভাই ছিলেন এবং বয়সে হাছন আলীর চেয়েও ১০/১৫ বছরের বড় ছিলেন। বন্ঠকনামায় বছির মোহাম্মদ মোট সম্পদের অতিরিক্ত দুই আনা বেশী পান- তা বোধহয় পরিশ্রমী ও উদ্যমী বছির মোহাম্মদকে ভালবেসে পিতা আমিন খলিফা হেবা করে যান অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য করে বসির মোহাম্মদ সম্পদের বৃদ্ধি করার কারণে শালিসে বা আপোসে তিনি দুই আনা অতিরিক্ত ভাগ পান। তাঁদের পিতা আমিন খলিফার সময় কাল আনুমানিক ১৭৭৫-১৮৫০ এর মধ্যে হবে। আর বছির মোহাম্মদের সময়কাল হবে (আনুঃ ১৮০০-১৮৭৫) এবং হাছন আলীর (১৮১৫-১৯০০), বছিরের পুত্র মুন্সী আবদুল্লা মিয়ার সময়কাল হবে (আনুঃ ১৮৩০-১৯০৫) আবদুল্লা মিয়ার পুত্র মুন্সী আহম্মদ হোসেনের সময়কাল (১৮৬০-১৯৩৭) আর আহম্মদ হোসেনের পুত্র ছালে আহম্মদের সময়কাল (আনুঃ ১৯০০-১৯৬৫) আর ছালে আহম্মদের পুত্র ইউসুফ মিয়ার সময়কাল (১৯৪০-২০১৫)। ইউসুফ মিয়ার অপর ভ্রাতা জনাব ফরিদ মিয়ার (৮০) সাথে আলাপ করে পুরানো অনেক বিষয় জানা যায়।
শ্রী বছির মাহাম্মদ ও হাছন আলী সদাগর পীং মাহাম্মদ আমিন খলিফা উভয় সাকিনাল : আগারাবাদ —- কস্য চিঠানামা ভাগজাত পত্র মিদং আগে আমারার পিতার মজকুরার ও আমারার মরতছক হাসজমিন বাবৎ —- —— সনন্দা জমা জমিন সকর ও নিষ্কর নিজ সদাগরি জাহাজ ইত্যাদী —- জাহাজের থাকি ——- নিছের লিখিতং জায়মতো ১০ আনা ও ৬ আনা ভাগজোত কবলা পত্র —— —- —— জাহাজের মালিকানা—— বছির মাহাং সদাগরের আমি আবদুর রহমান জাহাজের —— ——- আমি শ্রী হাছন আলী সদাগর মেরামত করাই লইবাম ও আবদুর রহমান জাহাজের যথথকাগজ সরিক মতো আমি বছির মাহাম্মদ সদাগরের মাঝে থাকিবেক ও আমি বছির মাহাম্মদ সদাগর ও তুমি হাছন আলী সদাগরকে বাক আলমা জাহাজের বিক্রিত ৪২০০ টাকা ও সনন্দা মালিকী ও ঘরের ওাজন বাবৎ মবলক ৫০০ টাকা এন্দার মবলক ৪৭০০ তোমাকে দস্ত বদস্তে বুঝাই দিলাম আমি হাছন আলী সদাগর বুঝি পাইলাম আর মোচজিদ ও বার্গি ঘরের উঠান ও বাড়ির সদ্যাকর রাস্তা ও তাবৎ রাস্তা বাদাম বৃক্ষ নিছের জমিন ও সদ্যাকর বড়পুনি ও পাক্কাঘাট ও দালানর পুনি ও পটিয়া ডিগীও হাযজাহার ডিগী ও বামনি পুনি ও দামুআপুনি ও রামসেবকর পুনি ও —— হেবানাও মাদাকা ঘাটা টব সমেত সদরি রহিলেক কিন্তু উক্ত সদরি —- মেরামত(?) কাটর আনড়ি জাহা জাহা মেরামত করিতে হয় উক্ত ফরাস মতো খরচ দিআ —- করাইবাম উক্ত পুনি ছয়ের ভাটি উজানি এক বড়মাঠ স্বীকার —— ১০ আনা ৬ আনা —- করিবাম কেউ কাহার ফরসক বাদক বা প্রতিবন্দক হইবাম না বা করিবাম না। সদরি ঘাটা দিআ পুনির পার ও জমিনের আইল দিআ গমণাগমন করিতে কেহর প্রতি কেহ বাধকতা হইবাম না কেহর লোকসান কেহ করিবাম না ও মোহরমর সময় —- বার পূর্বের মতো খরচ উক্ত চিঠামতে ২ দানাজান দিবাম না দিই দন্ডবন্ট হইবাম উক্ত খয়রাতি জমিন চিটাদার ডিগী—— বয়তসরূপ করিতে না পারিবাম ও মোচজিদের মোচারনির কারকাজ চিটাদার বাটির বা——- বিহর ভিটা ও সাত আলীর ভিটা জিবনছি পাট্টার ভিটাও রায়সেবকের বা(?) হাচনার ভিটা ——— —— জমার বাবত নাল ও ছন্থামি আবাদ দেবান আলীর ভিটা লাখেরাজ বাহালী ও বাজেআপ্তি এই সকল জমিনের মং ৫৪ টাকা উছুলাং আমারা দোনাজান ১০ আনা ৬ আনা মতে খরচ দিবাম এহাতে কোন ওজর না করিবাম সদরি জমিনেতে গছাবৃক্ষ আদি ফলান্ত আছে উক্ত ফরাস মতো ভোগমানা হইবাম মোট সম্পত্তির কোন এক মোকাদ্দমা মামলার উৎপত্তি হয় দানাজান তালাফি ও খরচ উক্ত ফরাস মতো দিবাম ও করিবাম এসাদল্যা ছল্লবি গং দনিল দিঘী যাবদীয় দলিল .. বছির মাহাং জায়ওপাসিন নিকট রহিল। এ করারে চিটানামা
ভাগজোত পত্র ………
বছির মোহাম্মদ ……..২৫ কার্তিক
এক.
ভারতীয় উপ মহাদেশে ব্যবসা বানিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর প্রাচীনকাল প্রধানতম বন্দর হিসেবে পরিচিতি পেয়ে আসছিল। ইউরোপীয় বণিকগণ এ বন্দরের নাম দেন পোর্টেগ্রান্দো ( এৎধহফ চড়ৎঃ বা প্রধান বন্দর) খৃষ্টীয় ৮ম শতক থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর ও চট্টগ্রাম জাহাজ নির্মাণ শিল্প- জাহাজ ব্যবসার জন্য সুপ্রসিদ্ধ। এখানকার পুঁথি-পালায় সেকালের সওদাগরদের নিজস্ব পালের জাহাজ নিয়ে দেশ-বিদেশে বাণিজ্যে যাওয়ার কাহিনী পাওয়া যায়। হান্টার বলেন, চট্টগ্রামের জাহাজ নির্মানের কারখানা ১৮৭৫ সন পর্যন্ত নিজ মাহাত্মা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। প্রাচীনকালে সুদুর ইউরোপ ও এশিয়া মাইনর থেকে এসে বণিকেরা বিশেষ করে রুমের সম্রাটগণ চট্টগ্রামের জাহাজ কিনে নিয়ে যেতো। এসব জাহাজের সাহায্যে এখানকার নাবিকেরা বহু দুরবর্তী দেশ বিদেশ এমনকি সিংহল, সুমাত্রা, যাবা, কোচিন, চীন উপকুল, মিশর উপকুল, ব্রহ্মদেশ, আরব সাগরের তীরবর্তী দেশ সমুহের সহিত বাণিজ্য চালাইত। আরব ভূগোলবিদ ইদ্রিসী বলেন, চট্টগ্রামের সাথে জাহাজের মাধ্যমে বসরার ব্যস্ত বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জনৈক হিন্দু সওদাগরের ‘বকল্যান্ড’ নামক জাহাজ এদেশের নাবিক দ্বারা পরিচালনা করে স্কটল্যান্ডের ‘টুইড’ পর্যন্ত পাড়ি দিয়ে ফিরে এসেছে। জাহাজের সাথে সম্পর্কিত পদ- যেমন: মালুম, সারাঙ্গ, সুকানি, খালাসী, বালামী, বাহারূয়া, আড়কাঠি, মাঝি প্রভৃতি পেশা এবং এসব পেশার নামে নানা স্থাননাম চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে। চাটগাঁর ইতিহাস গবেষকগণ গুদীরপাড়, পতেঙ্গা, গোসাইলডাঙ্গা, হালিশহর, মিস্ত্রিপাড়াসহ বেশ কয়েকটি জায়গার নাম জাহাজ শিল্পের সাথে যুক্ত বলে উল্লেখ করলেও তথ্যের অভাবে চট্টগ্রামের আরো বহু অঞ্চল যা জাহাজ বানিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত ছিল- তা নজর এড়িয়ে গেছে।
দুই.
হালিশহর রোড ছোটপুল দিয়ে যে সড়কটি পুলিশ লাইন-শান্তিবাগ-রঙ্গীপাড়া-নজীর আহমদ মিয়ার বাড়ি হয়ে ঈদগাঁ মোড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে সেটি বছির মোহাম্মদ সড়ক নামে পরিচিত। এ সড়কটি বছির মোহাম্মদ ১৮৪০ এর দিকে নিজ খরচে করেছিলেন। কারণ সড়কের আশে পাশে তাঁদের জমিদারী বহু জমিজমা ছিল। হালিশহর রোড়ে উঠার জন্য তাঁদের নিরব্বচ্ছিন্ন রাস্তা ছিল না। মোল্লাপাড়া বা মুহুরীপাড়া দিয়ে যে রাস্তা হালিশহরে উঠেছে তা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন লোকের বাড়ির পুকুরের পাড় দিয়ে চলে গিয়েছিল। বছির মোহাম্মদরা অত্যন্ত ধনাঢ্য ছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিল মোহাম্মদ আমিন খলিফা। পিতা সেকালে মহররমের তাজিয়া (ঘোড়া) বানাতেন – পালকীর নক্শা করতেন। পালকীতে নানা ডিজাইনের নকশা করার জন্য কিংবা মহররমের তাজিয়া ঘোড়া বানানোর জন্য চট্টগ্রাম শহর ও দূরদূরান্ত থেকে লোকজন মহররমের মাস ছ’য়েক পূর্ব থেকেই বায়না দিয়ে রাখতেন। তাঁর রঙের কাজ পুরো চট্টগ্রামে বিখ্যাত হয়ে উঠে এবং মানুষজন তাকে রঙ্গী আমিন বা আমিন খলিফা বলে ডাকতেন। তাঁর জৈষ্ঠ্যপুত্রও মানুষের কাছে রঙ্গাবছির নামে পরিচিত ছিল। মূলত তাঁদের নাম থেকে, রঙের নকশার কাজ থেকে ঐ এলাকাও রঙ্গীপাড়া নামে পরিচিতি পায়। ১৮৫৭ সালের ১০ নভেম্বর বসির মোহাম্মদ সওদাগর ও তাঁর ভাই হাছন আলী সওদাগরের মধ্যে হওয়া অংশনামায় বাড়ির অদূরে একটা বড়মাঠের উল্লেখ পাওয়া যায়-ধারণা করা যায় মহররমের ঘোড়া বানানোর মৌসুমে ওখানে নানা জায়গা থেকে অর্ডার দিয়ে বানানো তাজিয়া নিতে আসা লোকের মেলা বসতো। তখনকার দিনে মহররমের ঘোড়া বানানো নিয়ে এলাকা-এলাকায় বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো-টানটান উত্তেজনা চলতো; অনেক সময় এ উত্তেজনা থেকে মহররমের বিকেলের মিছিলে ব্যাপক সংঘর্ষও হতো। তখনকার দিনে বৃটিশ প্রশাসন থেকে তাজিয়া মিছিলের জন্য অনুমতি নিতে হতো এবং এ অনুমতি নিতো এলাকার কোন বুিদ্ধ প্রতিবন্ধী বা কোন এক পাগলের নামে – যাতে পরবর্তীতে মামলা-মোকাদ্দমা হলে আসামী খুঁজে পাওয়া না যায় এবং মামলাও যেন না টিকে। ঘোড়া বানানো ও উৎসবে তখনকার জমিদাররা মূল খরচ দিতেন। জমিদারী প্রথা বিলোপ হবার পর এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিরা পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঐ উৎসবের জন্য চাঁদা তোলা হতো। এ উৎসবে কারবালার কাহিনীর দু’পক্ষের নকল মহড়া চলতো। চকোরিয়া থেকে পুরুষ নর্তক এনে শহরে নাচ গানের জলসা বসতো, কারবালার মর্মান্তিক কাহিনী নিয়ে পুঁিথ পাঠের আসর বসতো। চট্টগ্রামের পেরেড ফিল্ড, জাম্বুরি মাঠ, ঈদগাঁর কারবালার মাঠ-পুকুরসহ শহরের বহু হারিয়ে যাওয়া মাঠ মহররমের উৎসবের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। তাজিয়া মিছিলে নিজ নিজ এলাকার বা মহল্লার সুনাম অক্ষুণœ রাখতে লোকজন মরিয়া হয়ে উঠতেন। বছিরদের বাটোয়ারা পত্রে ’মহরমের খরচ পূর্বের মতো দেয়া’র অঙ্গীকার থেকে ধারণা করা যায়-এ সময়ে তাঁরা প্রচুর খরচ করতেন- মেলার আয়োজন ছাড়াও তাঁদের প্রজাদের বার্ষিক ভোজ বা মেজবান বোধহয় এ সময়েই হতো। মহররম একদিকে যেমন উত্তেজনাময় বিনোদনের উৎস ছিল অন্যদিকে এর সাথে প্রিয় নবী মুহম্মদ (স:) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রঃ)’র কারবালার বিয়োগান্তক শোকের ধর্মীয় আবেগও কাজ করতো। সে সময়ে মানুষের বিনোদনের তেমন কোন মাধ্যম ছিল না। মহররম ও শবে বরাতে তাই উৎসবের আয়োজন করা হতো। শবে বরাতের সময় তখনকার সময়ে ডাকাইত্যা বিলে (বর্তমান জাম্বুরী মাঠ) চুয়া খেলা হতো। বাঁশের খোলে বারুদ ভরে তা দু’পক্ষের উভয়ে একপক্ষ অন্য পক্ষের দিকে মিসাইলের মতো ছুড়ে মারতেন। এ খেলায় বহুলোক আহত হতো। হিন্দু থেকে মুসলিম হওয়া এ অঞ্চলের মানুষের কাছে রথযাত্রার আদলে একটা উৎসব প্রয়োজন ছিল এবং কারবালার বিয়োগান্তুক শোকগাঁথার তাজিয়া মিছিল সেই অভাব পূরণের সুযোগ করে দেয়। তেমনি জন্মষ্টমীর মিছিলের বিপরীতে ঈদে মিলাদুন্নবী (স:) এর সময়ে জশনে জুলুশে মিছিল একই ঘটনার পরম্পরা যা এ উপমহাদেশ ব্যতীত বিশে^র আর কোন মুসলিম দেশে দেখা যায় না।
বছির মোহাম্মদের পিতা আমিন খলিফা প্রথম দিকে তাজিয়া বানানো ও পালকীর রঙের কাজ করে প্রচুর অর্থবিত্ত অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি বহু অর্থ বিনিয়োগে সরের (পালের) জাহাজ তৈরি করেন। ১৮৫৭ সালে পিতার মৃত্যুর পর বছির মোহাম্মদদের দু’ভায়ের বন্টননামায় দু’টি জাহাজ বন্টনের উল্লেখ পাওয়া যায়। নিশ্চিতভাবে বলা যায় বছিররা ছোটবেলা থেকেই জমিদারী বৈভবে বড় হন; পড়ালেখা করার সুযোগ পান। তাঁরা বহু জমিজমা ও অর্থ সম্পদের মালিক ছিলেন।
পটিয়া দীঘি, হাজার দিঘী, রামসেবকের দীঘি, দামুয়া পুকুরসহ ছয়টি বড় বড় দীঘি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এসব দীঘি বোধহয় তাঁরা সরকার থেকে ইজারা নিয়ে রায়তদের ব্যবহারপূর্বক কর আদায় করে সরকারকে আদায়কৃত করের একটা অংশ প্রদান করতেন। সে সময়ে টাকায় দেড় মন চাল পাওয়া যেত। সেসময়ের ৪২০০ টাকা বর্তমান (২০২০ সাল) বাজার মূল্য ১০ কোটি ৫ লক্ষ টাকা প্রায়। এটি একটি পুরানো জাহাজ বিক্রি বাবত বন্টিত হাছন আলী সওদাগরের হিস্যা ৬ আনা হিস্যোয় পাওয়া। তাহলে বাকী ১০ আনা হিস্যোয় বছির মোহাম্মদের ভাগে আনুমানিক বর্তমান বাজার মূল্য ১৭ কোটি প্রায়। এছাড়া তাদের আরো কয়েকটি সওদাগরি জাহাজের উল্লেখ পাওয়া যায়। মুহুরীপাড়ার ওহাব সওদাগরের দাদা প্যাটন মালুম সম্ভবত তাদের জাহাজ চালাতেন যা বাণিজ্যের কাজে দেশ বিদেশে পাড়ি জমাতো। বসিরদের তালুকি সম্পদ থেকে বার্ষিক আয় যার ৬ আনা অংশে পরিমাণ ৫০০ টাকা যা হাছন আলী পেয়েছেন এবং বাকী ৮৫০ টাকা বসির মোহাম্মদ পেয়েছেন।
পটিয়া দীঘি (পইট্টের ডি), বামনীর দিঘী (বঅনি’র ডি), দামুয়া পুকুর (দাম্মো পইর), রামসেবকের দিঘী সহ ছয়টি বড় বড় দিঘীর চিঠা মালিক ছিলেন বছির মোহাম্মদরা। আরো অনেকগুলি রায়তি ভিটি যেমন, দেবান আলীর ভিটা, সাত আলীর ভিটা, হাচনার ভিটাসহ বহু লাখেরাজ বাহালী ও বাজেয়াপ্তি তালুকের সম্পদ যার বার্ষিক খাজনার পরিমান ৫৪ টাকা যা তারা প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করে সরকারের কালেক্টরিতে জমা দিতেন। উল্লেখ্য এ ৫৪ টাকা কেবল সরকারের খাজনা যা মোট আদায়ের ৭৫% – বাকী প্রায় ১৮ টাকা তাদের জমিদারী কমিশন। তাঁদের বাটোয়ারায় বিশাল সীমানা প্রাচীর, বার্গিঘর ঘোড়ার গাড়ি রাখার ঘর), গরুর ঘর, আস্তাবল, দালানের উল্লেখ সেকালে পরাক্রমশালী সামন্ত জমিদারের অস্তিত্ব নির্দেশ করে। এছাড়া তাঁদের অগ্রজদের প্রতিষ্ঠিত মোগল আমলের মসজিদের লাখেরাজ নি®কর বা খয়রাতি সম্পদ যে বিস্তর ছিল তা অনুমান করা যায়। দলিলের শেষ দিকে দেখা যায় জমিদার সামদ আলী চৌধুরীর পুত্র (নাতি?) এরশাদুল্যা ও ছল্লবি ভ্রাতার নাম-তাঁরা অত্র এলাকার বিখ্যাত তালুকদার ছিলেন। তাঁদের সাথে করা দলিল পত্র বছির মোহাম্মদের কাছে থাকার কথা উল্লেখ আছে। বছির মোহাম্মদদের জমিদারী আয়ের চেয়ে ব্যবসায় আয় ছিল অনেক বেশী তাই ধারণা করা যায় এরশাদুল্যাহরা বছিরদের অধীনে ছিলেন।
তিন.
বছির মোহাম্মদ সড়ক এ সমযে কেন করা হলো? আজকের দিনে ঐ সড়কের যে প্রয়োজনিয়তা তা যে সে সময়ে ছিল তা ধারণা করা যায়। ১৮৪০ সালের দিকে সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে (কারণ জনগুরুত্বপূর্ণ না হলে ইংরেজ প্রশাসন এ কাজ করতো না) প্রায় ৩ কিঃ মিঃ সড়ক কেন করলেন? রঙ্গীপাড়া থেকে হালিশহর রোড বা শেরশাহ রোড (এখানে ঈদগাঁ মোড়) উঠার রাস্তা সেকালে কেমন ছিল তা পর্যালোচনা করা যাক। রঙ্গীপাড়া থেকে ঈদগাঁ যাবার দুটো রাস্তা ছিল এর একটি রঙ্গীপাড়া থেকে মোল্লাপাড়া হয়ে দলই পুকুর পাড় দিয়ে নজীর আহম্মদ মিয়ার বাড়ি হয়ে চলে গিয়েছিল। আরেকটি রাস্তা টেক্সিন ফকীরের মাজার হয়ে নজীর আহম্মদ মিয়ার বাড়ি হয়ে ঈদগাঁ মোড়ে পড়েছিল। বসির মোহাম্মদ হালিশহর রোডের সাথে টেক্সিন ফকীরের মাজার হয়ে ঈদগাঁ মোড় পর্যন্ত রাস্তাটি করেছিলেন। সম্ভবত পুকুর ব্যক্তি মালিকানাধীন ছিল বিধায় পুকুরপাড় হয়ে রাস্তা দিয়ে চলাফেরায় পুকুরের মালিকের ইচ্ছা অনিচ্ছা কাজ করতো। যেহেতু বছির মোহাম্মদরা সেসময়ে অত্র এলাকা কেবল জমিদার নন বরং অকল্পনীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন তাই তারা তাদের জমিদারীর জমির ফসল, পুকুরের মৎস্য ও নিজেদের বিশেষত ঘোড়াগাড়ি নির্বিঘ্ন ও নিষ্কন্ঠক চলাচলের জন্য বিশেষ রাস্তার প্রয়োজন ছিল ।
অন্যদিকে রঙ্গীপাড়া থেকে মুহুরীপাড়া হয়ে বেপারীপাড়ায় হালিশহর রোডে উঠার যান চলাচল পথটিও সুগম ছিলনা। সেকালে শুকনো মৌসুমে বিলের মধ্য দিয়ে অবাধে ঘোড়াগাড়ি চললেও বর্ষা বা চাষের মৌসুমে এসব পথ দিয়ে যাওয়া যেত না। মুহুরীবাড়ির মসজিদের পরে বেপারীপাড়ায় যাবার রাস্তাটি তিনটি পুকুর পাড় দিয়ে যেতে হতো। মহররমের ঘোড়া বানানো নিয়ে ও এর মিছিল নিয়ে সম্ভবত মুহুরীপাড়ার লোকদের সাথে বসির মোহাম্মদদের মধ্যে কোন প্রকার উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল যার কারণে রঙ্গীপাড়ার অধিবাসিদের চলাচলের ঝুঁকি এড়াতে বছির মোহাম্মদ এ সড়কটি নির্মান করেন। কিংবা বছির মোহাম্মদদের ঘোাড়াগাড়ি চলাচলের জন্য আলাদা রাস্তা প্রয়োজন ছিল বিধায় তাঁরা সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে এ রাস্তা করার মহান কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করেন। এতে একদিকে যেমন তাঁদের যাতায়াতের পথ নিষ্কন্ঠক হয় অন্যদিকে বড়বিলের (বর্তমান শ্যামলী, আগ্রাবাদ হাউজিং, বসুন্ধরা, কে-এল বøক, আনন্দীপুর, শান্তিবাগ, রহমানবাগ, উত্তরা) জমির বিশাল অংশের কৃষকের ও ব্যবহারকারী সাধারণ্যের উপকার হয়।
আমিন খলিফার পূর্ব পুরুষ হয়ত মোগল সময়ে রঙ্গীপাড়া মসজিদটি নির্মান করেন। প্রথম দিকে এটি হয়তো শন বেড়ার বা টিনের ছাউনি ছিল। এ মসজিদের অধীনে বহু লাখেরাজ বা নিষ্কর বা খয়রাতি তালুকি জমিজমা ছিল। মোল্লাপাড়া নিরিবিলি এলাকার মসজিদ ও মুহুরীপাড়ার বড় মসজিদও এ ধরনের মসজিদ ছিল। সম্ভবত এসব মসজিদের সময়কালও মোগল আমল পর্যন্ত বিস্তৃত তা ধারণা করা যায়। এ মসজিদের একটা ফার্সি শিলালিপি ছিল কেউ পাঠোদ্ধার করতে পারেননি। মোগলরা ক্ষমতাচ্যুত হবার পর এসব নিষ্কর ভূমির যথাযথ কাগজপত্র ইংরেজরা প্রদর্শনের জন্য নোটিশ প্রদান করে। যারা মোগল সনদ দেখাতে পেরেছে তাদের তালুক নিষ্কর হিসেবে বহাল রেখেছে আর যারা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন তাদের তালুক বাজেয়াপ্ত করে তাতে অল্প কর বসিয়ে মূল মালিকদের ফেরৎ দেয়া হয়। তাই এ অঞ্চলে লাখেরাজ বাজয়োপ্তি তালুক প্রচুর দেখা যায়।
আমিন খলিফার ঘোড়া বানানো ও পালকীর নকশার কাজে সমৃদ্ধি আসার সাথে সাথে তার ব্যবসার ধরণও পাল্টে যায়। তিনি প্রচুর জমিজমা ক্রয় করে, বৃটিশ শাসক থেকে তালুক বন্দোবস্তি নিয়ে বা নিলাম কিনে অনেক জমিজমার মালিক হতে থাকেন যা ধীরে ধীরে তাকে জমিদারে পরিণত করে। পরবর্তীতে তিনি জাহাজ বানিয়ে বা কিনে জাহাজ ব্যবসায় ঝুঁকে পড়েন। এতে একদিকে তিনি যেমন সম্পদশালী হয়ে উঠেন অন্যদিকে বিভিন্ন পণ্য আমদানী রপ্তানীর মাধ্যমে বড় ব্যবসায়ী বনে যান। এর সাথে তাঁর সুযোগ্য পুত্র বছির মোহাম্মদ ও আমিন খলিফার উদ্যোগও যুক্ত হয়ে ব্যবসার ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। বসির মোহাম্মদের পুত্র মুন্সী আবদুল্লাহ মিয়া এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র মুন্সী আহমদ হোসেন (মৃত্যু-১৯৩৭) উভয় পিতা-পুত্র আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তাঁদের হাতের লেখা চমৎকার, ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা, ভাষায় আধুনিক গদ্যরীতির ছাপ, জ্ঞানগর্ভী, এলাকার শালিস বিচারে তাঁদের সময় কালে উভয়েই প্রধান হিসেবে থাকতেন। তাঁরা নামের পূর্বে প্রায় সময় শেখ উপাধি ব্যবহার করতেন। রঙ্গীপাড়া মসজিদ, রঙ্গীপাড়া বড়পুকুর, রাস্তাঘাট, বসির মোহাম্মদ সড়ক, প্রভৃতি তাঁদের পূর্বপুরুষের কীর্তি। রঙ্গীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বছির মোহাম্মদের পুত্র আবদুল্লা মিঞার নাতি (আহম্মদ হোসেনের পুত্র) ছালে আহম্মদ ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন।