চট্টগ্রামের কথা শুনছে না ঢাকা

68

রাহুল দাশ নয়ন

আন্দোলনের সূতিকাগার বার আউলিয়ার পূণ্যভূমি চট্টগ্রাম। মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সব বড় আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়েছে চট্টগ্রাম থেকেই। বন্দর রক্ষার মতো আন্দোলনে সফল হয়েছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামবাসীর স্বার্থরক্ষায় এবার সিআরবির হাসপাতাল নির্মাণের বিরোধীতায় সরব হয়েছে সকল শ্রেণিপেশার মানুষ। প্রতিদিনই নানা কর্মসূচি পালন করে এই প্রকল্প বাতিলের জোর আওয়াজ উঠেছে। কিন্তু এই আওয়াজ এখনো পৌঁছেনি ঢাকায়। চট্টগ্রামের কথা যেন শুনছে না ঢাকা। উল্টো প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে জড়িত রেলমন্ত্রীসহ রেল কর্মকর্তারা চট্টগ্রামবাসীকে ‘অবজ্ঞা’ করে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। যা নিয়ে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
রেলমন্ত্রী ও রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের বিষয়ে চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরা বলছেন, তারা চট্টগ্রামকে নিয়ে ছেলেখেলায় মেতে উঠেছে। চট্টগ্রামের মানুষকে অবজ্ঞা করে বক্তব্য প্রদান করছে। মূলত রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরাই প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে এ প্রকল্পটি হাতে নিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে অনেককিছুই প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর করা হয়নি। কৌশলী চুক্তিতে অনেক তথ্য-উপাত্ত গোপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সিআরবির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে চট্টগ্রামবাসী। এই আন্দোলনের সাথে চট্টগ্রামের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। যার বহিঃপ্রকাশ চলমান আন্দোলনেই প্রমাণিত হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রামবাসীর আন্দোলনকে উপেক্ষা করে সিআরবিতে কাজ শুরু করেছেন হাসপাতাল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ। গভীর নলক‚প বসিয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কাজ শুরু করার প্রতিবাদে কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। প্রতিদিনই সিআরবি রক্ষা আন্দোলনে জড়িত নাগরিক সমাজ ছাড়াও নানা শ্রেণিপেশার মানুষ পৃথক কর্মসূচি পালন করছেন সিআরবিতে। এ প্রকল্পের বিরোধীতা করে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন।
আন্দোলনের এমন সময়েই রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদার ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন প্রকল্পের স্বপক্ষে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তারা বলেছেন, চট্টগ্রামের মানুষ না বুঝেই এ আন্দোলন করছে। সিআরবিতেই হাসপাতাল নির্মাণের পক্ষেই তারা জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলেও জানান তারা। যদিও রেল সংশ্লিষ্টদের এমন বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের মানুষ। বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে রেলের এসব কর্মকর্তাদের চট্টগ্রামে বয়কট করার ঘোষণাও দিয়েছেন।
চট্টগ্রামের মহাপরিকল্পনায় (মাস্টারপ্ল্যানে) সিআরবি এলাকাকে ‘সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য’ হিসেবে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। যে কারণে সিডিএ এ প্রকল্পের কোন অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরও এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ছাড়পত্র না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সিআরবিতে ভ‚মি বরাদ্দ ও ব্যবহার করতে হলে নগর উন্নয়ন কমিটির বিশেষ ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যবাধকতা রেখে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী এ বরাদ্দকে অবৈধ আখ্যায়িত করে দ্রæত সময়ের মধ্যে এ প্রকল্পটির বাতিল চান বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রামের স্বার্থ বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই এ প্রকল্প বাতিল করবেন বলেই মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।
তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের বিরোধীতায় তেমন সরব নেই চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতারা। আন্দোলনের শুরুতে উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। সেসময় এ প্রকল্পের বিষয়ে যৌথবিবৃতি দেয়ার কথাও বলেছিলেন নেতারা। বর্তমানে তিন ইউনিটের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মফিজুর রহমান ছাড়া বাকি কাউকে সোচ্চার দেখা যাচ্ছে না। এছাড়াও মাঠে তৎপর রয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন। অন্যদিকে নীরব ভূমিকা পালন করছেন মহানগরের সংসদ সদস্যরাও।
জানা যায়, ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর হাসপাতাল নির্মাণে একধাপ পদ্ধতিতে দরপত্র আহব্বান করা হয়। এতে ৩২টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করে। ২০১৮ সালের ১৫ মে দরপত্র খোলা হয়। সানজি ম্যাক্স ও ওয়েল জেবি এবং ডেনিম মিলস লিমিটেড দরপত্র দলিলের শর্ত পরিপালন করতে না পারায় নন-রেসপনসিভ হয়। ফলে অপর দরদাতা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড রেসপনসিভ বিবেচিত হয়। ২০১৮ সালের ১৭ জুলাই দরপত্রের ফিন্যান্সিয়াল বিড উম্মুক্ত করা হয়। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদন পায় ১৪ আগস্ট। ২০১৮ সালের ১০ ডিসেম্বর খসড়া চুক্তিপত্র অনুমোদন করে আইন মন্ত্রণালয়। ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি সিসিইএ কমিটির বৈঠকের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি পিপিপি প্রকল্পটি অনুমোদন দিলে ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।
মোট ছয় একর জমিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপ ভিত্তিতে হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যে ২.৪২ একর জমি হাসপাতাল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজকে বুঝিয়ে দিয়েছে রেলওয়ে। যেখানে কাজ শুরু করেছে এ প্রতিষ্ঠান।