‘ঘোর অন্ধকারে’ আলোর ঝলক

30

 

করোনা শুরুর পর থেকে দুই ঈদেই প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা ছিল। এরমধ্যে প্রথম ঈদ চলে আসে ২৫ মে। শরীর ব্যথা থেকে হঠাৎ কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। টেস্ট করার পাঁচদিন পর ফলাফল আসে করোনা পজেটিভ। অবস্থার অবনতি হলে গ্রামের বাড়ি থেকেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাই। সেখানেই ফুটে উঠে চিকিৎসা সেবার গ্রামকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধতা। অক্সিজেন তো ছিলই না। ছিল না পালস মাপার অক্সিমিটারও। বাধ্য হয়েই ছুটে আসি নগরীতে। ঠাঁই হয় চট্টগ্রাম ফিল্ড হসপিটালে। যেখানে দীঘ ১৭ দিন চিকিৎসা সেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরি।-এটা করোনাকালীন সময়ে এই প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত কেস স্টাডি।
করোনাকালীন দুঃসময়ে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা আইসোলেশন সেন্টারগুলোর গুরুত্ব ছিল আকাশচুম্বি। পাদপ্রদীপের আলোয় ছিল আইসোলেশন সেন্টারগুলো। অনেকেই অনেকভাবে এই আইসোলেশন সেন্টারের পাশে দাঁড়িয়েছে। যেখানে সরকারি হাসপাতালে অপ্রতুল চিকিৎসা সেবা ফুটে উঠেছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রধান ফটকও ছিল বন্ধ। শুধু করোনা রোগী নয়, সাধারণ রোগীরাও চিকিৎসা পাননি। তখনই আইসোলেশন সেন্টারগুলো ছিল মানুষের ভরসার প্রতীক। সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় ছয়টি আইসোলেশন সেন্টার গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রামে। হাসপাতালগুলো হলো- চট্টগ্রাম ফিল্ড হসপিটাল, সিএমপি-বিদ্যানন্দ ফিল্ড হসপিটাল, চট্টগ্রাম করোনা আইসোলেশন সেন্টার, আল মানাহিল নার্সিং হাসপাতাল, মুক্তি আইসোলেশন সেন্টার, পতেঙ্গা-ইপিজেড ফিল্ড হাসপাতাল। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগেও একটি আইসোলেশন সেন্টার পরিচালিত হয়।
চট্টগ্রাম ফিল্ড হসপিটালের যাত্রা শুরু হয় ২১ এপ্রিল। শিল্পগোষ্ঠী নাভানা গ্রূপের জমিনে জনগণের টাকায় যাত্রা শুরুর পর থেকে এ হাসপাতাল নিয়ে রোগীদের আগ্রহ বাড়ে। ফৌজদারহাটে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বর্গফুট জায়গায় এ হাসপাতালটি স্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে ভর্তি হওয়া রোগীরা সুন্দর পরিবেশেই চিকিৎসা নিয়েছেন। কিছুটা সুস্থ হওয়া রোগীরা ফলাফল নেগেটিভ না আসা পর্যন্ত ক্যারাম ও দাবা খেলেই দিন পার করেছেন। একঝাঁক স্বেচ্ছাসেবী নির্ঘুম পরিশ্রমে এ হাসপাতালটি মানুষের আস্থায় পরিণত হয়। বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৬শ রোগীকে সেবা দেয়া হয়েছে এ হাসপাতালে। যেখানে ভর্তি রোগী ছিল ২৮৩ জন। চিকিৎসা নিতে আসা চারজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে এ হাসপাতালে।
চট্টগ্রাম ফিল্ড হসপিটালের প্রধান উদ্যোক্তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বিদ্যুৎ বড়–য়া পূর্বদেশকে বলেন, ‘করোনাকালের শুরুতেই চট্টগ্রামের চিকিৎসা সেবা ভেঙ্গে পড়েছিল। শুধুমাত্র জেনারেল হসপিটাল ও বিআইটিআইডি ছাড়া কোথাও করোনা রোগী নেয়নি। এম্ব্যুলেন্স সেবা ছিল অপ্রতুল। মানুষের মধ্যে একধরনের হাহাকার বিরাজ করছিল। এসব বিষয় আমার মনে নাড়া দেয়। যে কারণে ফিল্ড হসপিটাল গড়ে তুলে চিকিৎসা সেবাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। বিপদকালীন সময়ে রোগীরা সর্দি, কাশি হলেই ফিল্ড হসপিটালে এসে চিকিৎসা নিয়েছে। ১৬৫০ জন রোগীকে সেবা দেয়া হয়েছিল আমাদের হাসপাতালে। ভর্তি রোগী ছিল ২৮৩ জন।’
জনগণের হাসপাতালে পরিণত হয়েছিল হালিশহরে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম করোনা আইসোলেশন সেন্টার। ১৪ জুন এই হাসপাতালটির যাত্রা শুরুর পর থেকে প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। তিন মাস চালু থাকা এ হাসপাতালে প্রায় সাড়ে ৮শ রোগী চিকিৎসা নেন। সাজ্জাত হোসেন, এড. জিনাথ সোহানা চৌধুরী ও নূরুল আজিম রণির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এ হাসপাতালে প্রায় ৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিনরাত পালাবদল করে সেবা দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম করোনা আইসোলেশন সেন্টারের সমন্বয়ক নূরুল আজিম রণি পূর্বদেশকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে যখন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবায় অপ্রতুলতা সেসময় বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসা সেবা বন্ধ রেখেছিল। যখন চিকিৎসার অভাবে শুধুমাত্র করোনা রোগী নয়, সাধারণ রোগীও মারা যাচ্ছেন তখন আমরা এই আইসোলেশন সেন্টার করার উদ্যোগ নিই। পরে নার্স ও ডাক্তারদের সম্পৃক্ত করি। তখন ৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রতিনিয়ত আইসোলেশন সেন্টারে সেবা দিয়েছেন। তিন মাসে প্রায় ৮৫২ জন করোনা রোগীকে সেবা দিয়েছি। যেটি করতে আমাদের ব্যয় হয়েছে ৫২ লক্ষ টাকা।’
করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বিনামূলে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য সিএমপি ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ফিল্ড হসপিটাল উদ্বোধন হয় গত বছরের ১ জুলাই। অক্টোবর মাসে এ হাসপাতাল বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত দুই হাজার ৯৬২ জন রোগীকে সেবা দিয়েছে। এরমধ্যে করোনা পজেটিভ রোগী ছিল ২৫২ জন। বিনামূল্যে সেবা দেয়া এ হাসপাতালটি বন্দর-পতেঙ্গা এলাকায় আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছিল।
হাসপাতাল পরিচালনার সাথে যুক্ত থাকা বিদ্যানন্দের চট্টগ্রাম সমন্বয়ক জামাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যানন্দ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এই সংগঠন অন্যান্য কাজগুলোর পাশাপাশি করোনাকালীন সময়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে। সিএমপির সহায়তায় এ হাসপাতালটি আলোর মুখ দেখে। এ হাসপাতালে ২৫২ জন করোনা রোগীসহ মোট সেবাপ্রাপ্তির সংখ্যা তিন হাজার ২১৪ জন।
একইভাবে আল মানাহিল ফাউন্ডেশন গড়ে তুলে আল মানাহিল নার্সিং হাসপাতাল। এরা হাসপাতাল গড়ে রোগী সেবা দেয়ার পাশাপাশি করোনায় মারা যাওয়া লাশের দাফন-সৎকারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পতেঙ্গায় একটি স্কুলে পতেঙ্গা-ইপিজেড ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তুলেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হোসেন আহমদ। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালেও সেবা পেয়েছেন রোগীরা। তুলাতলীতে বর্তমান চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় মুক্তি আইসোলেশন সেন্টার। রোগী সেবায় প্রত্যেকটি আইসোলেশন সেন্টার অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও বছরের শেষ সময়ে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) হাসপাতালগুলোতে রোগী থাকলেও অর্থের যোগান দিতে না পারায় এগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন উদ্যোক্তারা।
এদিকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই চরম আঘাত করেছে প্রাণঘাতি ভাইরাসটি। বিধ্বস্ত অর্থনীতি কখন কিভাবে এ প্রভাব কেটে উঠতে পারবে, সেটি এখন গবেষণার বিষয়। তবে করোনাকালে স্বাস্থ্যখাতসহ বিভিন্ন সেক্টরের ভেতরের অনেক ‘কালো ঘটনা’ বের হচ্ছে। কিন্তু করোনাকালের একটি বিষয় সবাইকে জাগিয়ে তুলেছে- স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মানবিকতা। করোনাকালে প্রতিটি দিনই দেদীপ্যমান আলো ছড়াচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। প্রতিদিন সংগঠনগুলোর সহযোগিতার পরশে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে ধনী-গরীব, চিকিৎসা বঞ্চিত, অসহায় এবং সরকারি হাসপাতালে শয্যা না পাওয়া রোগীরা। করোনা রোগীর জন্য অক্সিজেন সরবরাহ এবং মৃতদের দাফন-কাফন ও সৎকারে মানবতাবাদী কিছু সংগঠন দিনরাত সমানে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশ। এটি একটি অধ্যাত্মিক অঙ্গনের সংগঠন। বছরজুড়ে পরিচালিত হয় তরিক্বত ভিত্তিক কার্যক্রম। রাজনীতিমুক্ত সংগঠনটির কর্মসূচিই ধর্মীয় অনুষঙ্গকে কেন্দ্র করে। আত্মশুদ্ধি ও পরিশুদ্ধ পরিবার-সমাজ গঠনই সংগঠনটির ব্রত। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে মেলে ধরেছে বিস্তৃত ও ব্যতিক্রম কর্মসূচির ডালা। ধর্মীয় কর্মসূচির বাইরে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্মের মানুষদের দাফন-কাফন এবং সৎকারের কর্মসূচি পালন করছে। করোনাকালে ধর্মীয় এ সংগঠনটি দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশজুড়ে চলছে দাফন-কাফন ও সৎকারের মানবিক কাজ। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম-ঢাকায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গে মৃত পাঁচশত লাশ দাফন ও সৎকার করেছে। সংগঠনটির আছে প্রশিক্ষিত ৭০০ স্বেচ্ছাসেবক। দাফন-কাফন ছাড়াও সংগঠনটি শ্বাসকষ্টের রোগীদের দ্রæত অক্সিজেন সরবরাহ করছে। চলছে রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কাজও। অন্যদিকে, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঞ্জুমানে খুদ্দামুল মুসলেমিন প্রতিদিনই মুমূর্ষু রোগীর বাসা ও হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছে অক্সিজেন সিলিন্ডার। চট্টগ্রাম এবং আশপাশের জেলায় চলছে সংগঠনটির মানবিক কাজ। ইতোমধ্যে ৪০ জন মুমূর্ষু রোগীর কাছে পৌঁছানো হয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার। করোনা আক্রান্ত ও করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় ওষুধ। নগরের স্টেশন রোড এবং কেসিদে রোডের পৃথক দুটি সেবা কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে অক্সিজেন। সেবা কেন্দ্রে আছেন আটজন এবং নগরজুড়ে আছেন শতাধিক কর্মী।
আরেক মানবিক সংগঠন নিষ্ঠা ফাউন্ডেশন। এ সংস্থার উদ্যোগে চলছে দাফন-কাফন ও সৎকার কাজ। অর্ধশত রোগীকে বিনামূল্যে দেয়া হয়েছে অক্সিজেন সেবা, তিনটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে চলছে রোগী পরিবহন সেবা। শতাধিক কর্মীকে দেয়া হয়েছে দাফন-কাফন ও সৎকারের প্রশিক্ষণ। আটজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা চিকিৎসক দিয়ে প্রতিদিন চলছে টেলিমেডিসিন সেবা।
করোনাকালে দাফন ও সৎকারে দষ্টান্ত স্থাপন করল আল-মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। এ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ইতোমধ্যে পাঁচশতাধিক লাশ দাফন-সৎকার করা হয়েছে। করোনাকালে এটি অনন্য দৃষ্টান্ত। গত বছরের ১৬ এপ্রিল থেকে আল মানাহিল দাফন ও সৎকারের কাজটি শুরু করে। সংগঠনটির আছে প্রায় ৫০ সদস্যের একটি টিম। আছে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি মাইক্রোবাস। এ সব গাড়ি প্রতিদিন করোনা রোগী পরিবহন, করোনা ভাইরাসের নমুনা সংগ্রহের পর নির্দিষ্ট ল্যাবে দিয়ে আসার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
করোনাকালের আরেক মানবিকযোদ্ধা অজ্ঞাত রোগীর সেবক খ্যাত প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম নেসার। করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য সেবাকেন্দ্র সমূহে সরবরাহ করেছেন অক্সিজেন, অক্সিমিটার, সুরক্ষা সামগ্রী, মাস্কসহ নানা সামগ্রী। তাঁর গড়ে তোলা অক্সিজেন ব্যাংকের’ মাধ্যমে শ্বাস কষ্টের রোগীদের সরবরাহ করা হচ্ছে সিলিন্ডার। কাউকে সিলিন্ডারসহ, কাউকে সিলিন্ডারে রিফিল করে দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অর্ধশত রোগীকে সেবা দেওয়া হয়েছে। সাইফুল ইসলাম নেসার ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে অক্সিজেন না পেয়ে নিজের বাবার অন্তিম যাত্রার পর থেকে অজ্ঞাত রোগীর সেবা করে আসছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ৮০০ অজ্ঞাত রোগীর সেবা করেন তিনি।