ঘুষের নতুন নাম যখন ‘স্পিড মানি’

21

লিটন দাশ গুপ্ত

মনের ভাব প্রকাশের জন্যে আমরা কথাবার্তার মাধ্যমে ভাষা ব্যবহার করি। আবার এই ভাষা প্রয়োগ বা ব্যবহার করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে ভাষা। গত এক দুইশ বছর আগে বাংলা ভাষায় রচিত অনেক গল্প উপন্যাস কবিতা বাঙ্গালী হয়েও শব্দের কাঠিন্যতার কারণে অনেকের বোধগম্য হয়না বা অনুধাবন করতে পারেনা। আবার হাজার বছর আগে রচিত বাংলা সাহিত্য গবেষণার মাধ্যমে জেনে নিতে হচ্ছে আদৌ বাংলা ভাষা কিনা! যেমন- চর্যাপদের চরণ ‘দিবসহি বহূড়ি কাউহি ডর ভাই, রাতি ভইলে কামরু জাই।’ যেটি আধুনিক বাংলায় এই রকম ‘দিনে যে বউটি কাকের ভয়ে ঘরে ভীত হয়, রাত হলে তার বাইরে কামরূপে না গেলে নয়।’ চরণগুলো বাংলাভাষা বলা হলেও আলো-আঁধারি রয়ে গেছে। শুধু দুয়েকশত বছর আগের ভাষা নয়, ভাষা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এই যেমন আমাদের ছোট বেলায় নাটক সিনেমায় দেখা কিংবা বইপুস্তক বা পত্রপত্রিকায় পড়া ‘গুন্ডা’ একটি বহুল প্রচলিত শব্দ ছিল। সেই সময় এই শব্দটি নাটক সিনেমার সংলাপে বা পত্রপত্রিকায় বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলেও চলমান সময়ে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। ‘গুন্ডা’ মানে হচ্ছে নিয়মনীতি বহির্ভূত অন্যায় ভাবে পেশীশক্তি প্রয়োগকারীকে বুঝানো হত। বর্তমান প্রজন্মের বেশ কয়েকজন ছেলে মেয়ে থেকে গুন্ডা শব্দটির অর্থ জানতে চাইলে বেশীরভাগ দেখলাম, ‘গুন্ডা’ শব্দটি শুনে হাসাহাসি করছে। অনেকেই আবার সঠিক অর্থ বলতে পারেনি। তারা দেখলাম গুন্ডা’র পরিবর্তে ক্যাডার শব্দের সাথে বেশী পরিচিত। না, মানে বর্তমান প্রজন্মের বেশীরভাগ ছেলে মেয়ে বিসিএস ক্যাডার নিয়ে ভাবে বা বুঝে তা বলছি না। বলছি বর্তমান প্রজন্ম বিসিএস ক্যাডার থেকে সশস্ত্র ক্যাডার সম্পর্কে ভালোই অবগত! আবার বর্তমানে প্রচলিত ‘ক্যাডার’ শব্দটি বিবর্তিত হবার আগে মাস্তান দূর্বৃত্ত বা সন্ত্রাসী হিসাবে ভালোই পরিচিতি পেয়েছিল!
এইদিকে ‘স্পিড মানি’ শব্দটিও একই রকম বিবর্তিত একটি শব্দ। যা আজকের লেখায় উপস্থাপন করতে চাচ্ছিলাম। এই স্পিড মানি শব্দটি বর্তমান সময়ে কোন কার্য সম্পাদনের বাজারে বেশ প্রচলিত একটি শব্দ। যদিও বেশ কয়েক বছর আগে ঐ ‘গুন্ডা’ আর ‘ক্যাডার’ শব্দের মত ভিন্ন পরিচয় মনে হলেও একই অর্থ বহন করে। প্রথম প্রথম স্পিড মানির মানে আমিও বুঝতাম না। কিছু দিন আগে দশজন মিলে ‘আপন আলয়’ নামে একটি দল গঠন করেছি। উদ্দেশ্য চট্টগ্রাম শহরে ছোট একটা জায়গা ক্রয় করে নিজেদের জন্যে ফ্ল্যাট নির্মাণ করা। আবাসনের এই কাজ সম্পাদন করতে গিয়ে দেখেছি বিভিন্ন ধাপে স্পিড মানি দিতে বাধ্য হয়েছে ‘আপন আলয়’ নামক দলটির পরিচালনা পরিষদ। তখন ভালো মত বুঝতে সক্ষম হয়েছি ‘স্পিড মানি’র স্পিড বা সক্ষমতা কতটুকু!
বিভিন্ন জায়গায় কাজ সম্পাদনে দেখলাম নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েকগুন বেশী সময় লাগার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বললাম, এত সময় বেশী কেন? নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েক দিন বেশী লাগতে পারে, কিন্তু কয়েকগুন বেশী সময় লাগার কথা নয়! তারা বিভিন্ন সমস্যার কথা জানাতে থাকে। আমি বললাম আমার নির্ধারিত সময়ে কাজটি শেষ করা জরুরী। তারা বলে দ্রুত কাজ করতে গেলে স্পিড মানির প্রয়োজন। একইসাথে তাদের কথায় বুঝতে পারলাম স্পিড মানির পরিমানের উপর নির্ভর করে কাজটি কত দ্রæত এগিয়ে যাবে! প্রথম দিকে আমি মনে করেছিলাম, কিছু কিছু কাজে অতিরিক্ত ফি দিয়ে কাজ দ্রæত এগিয়ে নিতে হয়, সেই রকম কিছু। যেমন-আগে ৫ বছর মেয়াদী পাসপোর্ট করার সময় রেগুলার হলে এক রকম ফি, আবার জরুরী বা অতিব জরুরী হলে সেই অনুপাতে অতিরিক্ত ফি দিতে হত। আমিও পাসপোর্টের মত ভেবে অতিরিক্ত ফি কত টাকা জানতে চাইলে দেখি কয়েকগুন বেশী। কোন কোন ক্ষেত্রে নির্ধারিত টাকার চেয়ে ৫০ থেকে ৬০ গুন বেশী। এইসময় সেবাদাতার সাথে আমার প্রতিবাদস্বরূপ কথোপথনের অবস্থা বুঝতে পেরে, পাশে থাকা অন্য একজন সেবা গ্রহণকারী আমাকে চুপিসারে বলে স্পিড মানি না দিলে আপনার কাজ দেরীতে নয়, কখনো হবে না। এরা এটা সেটার অজুহাত দেখিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে হয়রানি করে ফেলবে। আলোচনার মাধ্যমে কম-বেশী কিছু না দিলে নয়! এভাবে কয়েক জায়গায় দেখে শুনে স্পিডমানি সম্পর্কে খানিক বুঝতে পারলেও স্পিডমানির স্পিড সম্পর্কে সঠিকভাবে বিশদ কিছু বুঝতে পারিনি। অন্য একদিন এক লোকাল বাসের মধ্যে দেখলাম, দুইজন ব্যক্তি তাদের কথার প্রসঙ্গে স্পিডমানি নিয়ে খুবই কথা বলছে। তারা স্পিডমানি দিয়ে কোন কোন জায়গায় কিভাবে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করেছে একজন অন্যজনকে অবহিত করছে এবং এর ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তখনও স্পিডমানি বৈধ নাকি অবৈধ পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। আবার বিস্তারিত কারো কাছ থেকে জানতে সংকোচ বোধ হচ্ছিল। কারণ যদি ভাবতে থাকে, লেখালেখি করে অথচ সামান্য স্পিডব্রেকার, স্পিডমানি, স্পিডবাম্প এইসব শব্দের অর্থ বুঝে না! এইদিকে অভিধানে দেখলাম, ‘স্পিড’ অর্থ হচ্ছে গতি আর ‘মানি’ অর্থ টাকা। আবার ‘মানি ফর স্পিড’ নামে দেখলাম ১৯৩৩ সালে যুক্তরাজ্যে নির্মিত একটি ফিল্ম আছে। এভাবে দেখে ঠেকে অবশেষে শিখে নিলাম বা বুঝে গেলাম স্পিড মানির আভিধানিক অর্থ যায় হোক না কেন, কাব্যিক অলংকারের মত ভিন্ন অলংকারের অর্থও রয়েছে। যার প্রচলিত অর্থের সমীকরণ মনে হয়েছে এই রকম; ঘুষ+বকশিস = স্পিডমানি। এখানে অনেকে ভাবতে পারে নিউটনের গতির সূত্রের মত এটা কী সূত্র দিলাম, যেখানে আবার ‘ঘুষ’ আর ‘বকশিস’ এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে! এই ব্যাপারে বলতে চাই, এখানে ‘ঘুষ’ হচ্ছে কোন কর্তৃপক্ষ যদি নির্ধারিত ফি ব্যতিরেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করে বা দাবী করে সেটা হচ্ছে ঘুষ। এই অতিরিক্ত টাকা আদায় ছাড়া বা ঘুষ ব্যতীত স্বাক্ষর করতে গড়িমসি করে। অর্থাৎ ঘুষের সাথে স্বাক্ষরের একটা সুসম্পর্ক রয়েছে! অন্যদিকে ‘বকশিস’ হচ্ছে যে ব্যক্তি, সব তথ্য ঠিকঠাক করে ফাইল প্রস্তুত করে বগলের নীচে নিয়ে, কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে আনে, সে যদি অতিরিক্ত টাকা দাবী করে, তখন তার দাবীকৃত টাকায় হচ্ছে বকশিস। আরো সহজ করে যদি বলতে হয় এভাবে বলা যায়, ঘুষ নেয় ‘কর্মকর্তা’ আর বকশিষ নেয় ‘কর্মচারী’। এর মধ্যে আবার দালালি টাকা যুক্ত হয়ে টাকার পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। ‘দালাল’ মানে সেবা গ্রহীতার সাথে কর্মকর্তা আর কর্মচারীর মধ্যে মধ্যস্থতা বা সমন্বয়কারী। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে এভাবে সকলের মধ্যে পদমর্যাদা অনুযায়ী টাকা সততার সাথে প্রকাশ্যে ভাগ বন্টন করাকে স্পিড মানি বলা হয়। যেটি আগে ঘুষ উপরি উৎকোচ বকশিষ পারিতোষিক ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিল। গাড়িতে যেমন মোবিল দিয়ে যন্ত্রাংশ পিচ্ছিল করে ঘর্ষণজনিত বাধা হ্রাস করে করে চলাচল মসৃণ করা হয়, তেমন কাজের মধ্যে স্পিড মানি দিয়ে সকল প্রকার বাধা কাটিয়ে কাজের গতি বৃদ্ধি করতে হয়। যদিও বিষয়টি সকল ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য নয়। অনেক অফিসে কোন প্রকার স্পিড মানি নয়, গেলেই সেবাদাতার আতিথেয়তায় সহযোগিতায় মুগ্ধ হতে হয়।
যাইহোক, এক দশক আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন ‘স্পিড মানি’ দেয়া নেয়া অবৈধ নয়! তখন প্রচার মাধ্যমসহ সর্বসাধারণের মাঝে ঝড় উঠেছিল। কিন্তু ঝড় বৃষ্টি হলেও প্রকৃতি আবার শান্ত হয়, স্বাভাবিক হয়। তাই স্পিড মানি অবৈধ ঘুষ নেয়া নয়, বৈধ টাকা গ্রহণ। অর্থাৎ গুন্ডা এখন ‘বৈধ’ পেশী শক্তি প্রয়োগকারী নয়, ‘অবৈধ’ অস্ত্র ব্যবহারকারী সশস্ত্র ক্যাডার!

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক