ঘুম ও স্বপ্ন

12

(গত সংখ্যার পর)
তিন
বাসুদেব মন্ডল সত্যি সত্যি টেকনাফ থেকে বাংলাবান্ধা যাবার জন্য স্কুটার জোগাড় করেছেন। স্কুটারটি তাঁর এক ছাত্রের মামার। স্কুটারের গড় গতিবেগ ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার। আর এক লিটার পেট্রোলে নাকি ৫০ কিলোমিটার যেতে পারে।
রাত্রের খাওয়া দাওয়া একটু আগেই সারলেন বাসুদেব মন্ডল। খাওয়া শেষে তাঁর“আফটার সাপার ওয়াক এ মাইল” এই নীতি মানা হল না। তিনি বসেছেন কাগজ-কলম নিয়ে। তিনি হিসাব করে দেখলেন তাঁর জোগার করা স্কুটার দিয়ে ৩৯ বার টেকনাফ থেকে বাংলাবান্ধা আসা যাওয়া করতে পারবে, সময় লাগবে তিন মাস। থেমে গেছে কলম। ঘোর লাগা ভাব। নিউরণ ঘুম চাচ্ছে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে যাচ্ছে। ডায়রীতে ঘুম ও স্বপ্ন নিয়ে তাঁর একটি লেখা আছে। লেখাটি হচ্ছে-
সাধারণত দুইজন মানুষের বেশ কিছু ঘুম পায়। একজন ক্লান্ত, আরেক জন সুখী। ক্লান্ত মানুষের ঘুম মধ্যম গাঢ়। ঘুম শেষে থেকে যায় অতৃপ্তি। আর সুখী মানুষের ঘুম গাঢ়, ঘুমে থাকে তৃপ্তি। এই দুইজন মানুষের স্বপ্ন গতানুগতিক, সাদা-কাল। আবার যিনি একই সাথে ক্লান্ত ও সুখী তাঁর ঘুম উচ্চ মধ্যম গাঢ়। আবার লঘুও হতে পারে। তাঁদের স্বপ্ন রঙিন, বৈচিত্রময়। তাঁরা স্বপ্নে ঘুরতে থাকে দেশ থেকে দেশে, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। তাঁদের স্বপ্নে যখন মিথ্যার ছোঁয়া লাগে, তখন স্বপ্ন থেমে যায়। ঘুম যায় টুটে। আর স্বপ্ন যখন সত্য, তখন ঘুম হয় নিরবিচ্ছিন্ন। যদিও প্রকৃতি বলছে নিরবিচ্ছিন্ন বলে কিছু নেই, সব কোয়ান্টামিত। আবার সুখ আর ক্লান্তি, এইসব খুবই আপেক্ষিক। আসলে মহাবিশ্বের সবকিছুই আপেক্ষিক।
বাসুদেব মন্ডল ঘুমিয়ে গেছেন। তবে বিছানায় নয়, বসা অবস্থায় টেবিলে মাথা রেখে। তিনি স্কুটার চালিয়ে ছুটছেন, টেকনাফ থেকে বাংলাবান্ধার দিকে। রাস্তার মাঝে মাঝে ইট সুরকি উঠে গেছে, থেকে থেকে বাঁক, তাই স্কুটারের গতি কমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও জ্যামে পড়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। সবচেয়ে বড় জ্যাম লেগেছে কুমিল্লায়। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে। জ্যাম ছুটে গেছে, কিন্তু স্কুটার স্টার্ট নিচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ ঠেলাঠেলি করার পর স্কুটার স্টার্ট নিয়েছে। নীলফামারীতে স্কুটার উল্টে গেছে। লোকজন ছুটে এসেছে। নানাজন নানাভাবে সেবা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে-পথে পথিকই স্বজন। অবশেষে স্কুটার এসে পৌঁচেছে করতোয়ার পাড়ে। স্কুটার আপনা আপনি থেমে গেছে। অনেক ঠেলাঠেলি করা হল, কোন কাজ হল না। করতোয়ার শান্ত নির্মল বাতাস। তবু তাঁর গরম লাগছে। কোত্থেকে সবুর হোসেন এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তার হাতে ক্র্যাচ কেন? সব মিলিয়ে কাজ করছে অস্বস্তি। অস্বস্তি নিয়ে ঘুমানো যায় না। ঘুম ভেঙ্গে গেল।
বাসুদেব মন্ডল চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। তিনি স্বপ্নটার ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার চেষ্টা করছেন।
“একটানা হাজার কিলোমিটার স্কুটার চালিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টের। স্বপ্ন এই কষ্টের, সত্যের স্বীকৃতি দিচ্ছে। কিন্তু পাঁচ মাসে ১৭০০ লিটার পেট্রোল একটি মহাখাদক স্কুটারও খেতে পারবে না। তার মানে ম্যানেজার সবুর হোসেন বিলু মিথ্যা বলেছে। স্বপ্ন এই মিথ্যাকে ধরতে পেরেছে। তাই স্বপ্ন করতোয়ার পাড়ে থেমে গেছে। কিন্তু ক্র্যাচ হাতে সবুর হোসেন কেন? প্রকৃতি কী তাকে কোন শাস্তি দিবে? স্বপ্নে অনেক সময় ভবিষ্যৎ দেখা যায়।” তিনি খানিকক্ষণ কী যেন ভাবলেন। তারপর একটি কাগজে সুন্দর করে লিখলেন-
স্যার, আপনি ভাল করে জানেন আপনার ম্যানেজার মিথ্যা বলেছে। শুধু মিথ্যা না, ডাহা মিথ্যা। সবুর হোসেনের শেষে বিলু নামটা আপনি জুড়ে দিয়েছেন। বিড়ালের সংক্ষিপ্ত রূপ করেছেন বিলু। বিড়াল পাতিল মারে উদর পূরণের জন্য। আর আপনার বিলু পাতিল মারে জ্যামিতিক হারে টাকার স্তুপ বানানোর জন্য। আপনার প্রশ্রয় বা অনুকম্পায় সবুর হোসেন বিড়াল থেকে হয়ে গেছে নেকড়ে। তাহলে কী বিলু হয়ে যাবে নেকড়ে? যাই হোক, তার এই রূপান্তর তাকে বেপরোয়া করেছে। তাই সে এক স্কুটারের জন্য পাঁচ মাসে তিন স্কুটারের বেশি টাকা খরচ করেছে। প্রায় ১৭০০´৯৬ টাকা=১৬৩২০০ টাকা। এই টাকার কিছু অংশ আপনার ছেলে মেরে দিয়েছে। কারণ টাকার উত্তাপ সহজে ছড়ায়, যা আপনার ছেলের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। আপনার ম্যানেজারের চারিত্রিক দোষও আছে। সেদিন কথায় কথায় বলেছিলেন-“কারণ ছাড়া বিলুর ঘরে বুয়ার ব্রা চলে যাচ্ছে, বুয়ার স্নানের সময় আশেপাশে ঘুরঘুর করে। তাছাড়া বেটা বুয়াকে সস্তা দামের কড়া কসমেটিকও দেয়। কী করা যায় বলুন তো?” আমার মনে হয়, আপনার ম্যানেজার মদেও আসক্ত। কথায় বলে-মদ, মুদ্রা, মৈথুন এই তিন ‘ম’ এক সাথে থাকে। আপনি এসবের সবই জ্ঞাত আছেন। আপনার অনেক বিষয় আমার সাথে শেয়ার করেন। এখনও হয়ত তাই করতে চাচ্ছেন। তাই ছোট একটা পরামর্শ দিই। তবে পরামর্শের জন্য অপরাধ নিবেন না। পরামর্শটি হচ্ছে- আপনার ম্যানেজারকে ১০১ বার কান ধরে উঠ বস করিয়ে, মাথায় ঘোল ঢেলে দিন। পারলে মাথা ন্যাড়া করিয়ে, গলায় জুতার মালা পরিয়ে দিন। তারপর চাকরী ডিসমিস করে দেন। ছেলের ব্যাপারে সিদ্ধান্তটি আপনি নেন। তবে অনুরোধ থাকবে তার ক্ষমতা চিস করে নিবেন।
এবার আপনার প্রদত্ত সমস্যার একটা গড় হিসাব দিই। ১৭০০ লিটার পেট্রোলে একটি স্কুটার টেকনাফ থেকে বাংলাবান্ধা ৩৯ বার যাওয়া আসা করতে পারবে। আর সময় লাগবে ২১২৫ ঘন্টা অর্থাৎ প্রায় ৮৮ দিন মানে তিন মাস।
লেখা শেষে, বেশ হালকা অনুভব হচ্ছে। চেয়ার ছেড়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন। চেহারায় প্রসন্ন ভাব। সুখানুভব ছড়িয়ে পড়েছে চোখে মুখে। তিনি ঘুমাতে গেলেন।
এই ঘুমে তিনি কী কোন স্বপ্ন দেখবেন ? হয়’ত দেখবেন। তাঁর ভাষায় সেই স্বপ্ন হবে গতানুগতিক, সাদাকালো।