ঘুমিয়ে ছিলাম ভালো ছিলাম, জেগে দেখি বেলা নেই

265

 

পৃথিবীর সর্বত্র চলছে প্রকৃতির উপর অত্যাচার। নীরবে-নিভৃতে পৃথিবী সকল অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছে। কখনো কখনো ফুসফাঁস করে প্রকৃতি প্রতিবাদ জানান। আমরা বুঝেও না বুঝার ভান করি। নীরব থাকি। মিছিল-মিটিং, সমাবেশ করি। সম্মেলন করি, আন্তর্জাতিক সমাবেশ করি, হাজার হাজার পৃষ্ঠার রচনা তৈরি করি। এখানেই শেষ।
পরিবেশ নিয়ে অনেকেই কথা বলেন, লিখেন, চিন্তাভাবনা করেন, কিন্তু দৃশ্যত পরিবেশের খুব বেশি উন্নতি হচ্ছে বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ভালো করে দেখলে শুধু অবক্ষয় আর অক্ষয়। তাই বলে লেখা কি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এটাও আবার বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কেমন চলছে বা কেমন যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বের ভু-প্রাকৃতিক অবস্থা ? প্রাকৃতিক অবস্থার কথা বললেই জলবায়ু, আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন এসবের কথা চলে আসে। এসব অত্যন্ত জটিল বিষয়। চোখে দেখা যায় না, বুঝা যায় না। তাই সাধারণ মানুষের কাছে হৃদয়ঙ্গম করা কষ্টসাধ্য। এর সাথে জড়িত আছে জাতীয় রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আরো কত কিছু। এক কঠিন বাস্তবতা। এহেন প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার চেষ্টা করব কিছু কঠিন ও চরম সত্য কথন।
একটু নেতিবাচক খবর দিয়ে শুরু করা যাক। সারা বিশ্বের চিত্রটা কেমন। যদি এক নজরে দেখি দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি গাছ কাটা হয়। বিশ্বে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০০ কোটি গাছ কাটা হয়েছে। প্রতি মিনিটে ৩০ টি ফুটবল মাঠের সমান বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ড.ঐ.ঙ. এর মতে বায়ুদূষণে প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দিকে একটু দেখার দৃষ্টি দেওয়া যাক। সবচেয়ে ভয়াবহ ঝুঁকিতে আছে এশিয়ার দেশগুলো। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও পাকিস্তান ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে আছে। ঝুঁকির পরিমাণ এত বেশি যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, ফসলের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, একই সাথে বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্রের উপর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে এসব দেশে। এল সালভাদর ও নিকারাগুয়ায় কিডনি রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে বলে জানা যায়। অন্যতম কারণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এসব ক্ষতি ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অনেক দেশে অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। গবেষণায় দেখা গেছে যে ২০৩০ সালে অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩৭.৪ মিলিয়ন। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৬২.৯৯ মিলিয়ন। এর ফলে অনেক দেশ অভিবাসী সমস্যায় ভুগবে। সারাবিশ্বে পরিবেশ দূষণের জন্য তিনটি কারণ দায়ী। কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার। এসব ব্যবহার করে উন্নত দেশগুলো উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নত দেশে পরিণত হতে চাচ্ছে। বিশ্বের গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায় যে প্রতিবছর ৫৯ গিগাবাইট গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গত হয়। যার মধ্যে যানবাহন থেকে নির্গত হয় ৬ গিগাবাইট। জ্বালানি খাত থেকে নির্গত হয় ২১ গিগাবাইট। কৃষি খাত থেকে নির্গত হয় ৭ গিগাবাইট। শিল্প খাত থেকে নির্গত হয় ৮ গিগাবাইট। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, গরুর ঢেকুর ও বায়ু ত্যাগ মিথেন এর অন্যতম উৎস। এটি কার্বন এর চেয়েও ক্ষতিকর।এক বছরে একটি গাড়ির জ্বালানি যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে গরুর ঢেকুর ও বায়ু ত্যাগ।
এই যে গ্রিন হাউজ গ্যাস এই গ্যাস নির্গমনের সাথে কারা জড়িত। অন্যভাবে যদি বলি এর জন্য কারা দায়ী। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) এর উপর একটি গবেষণা করে। গবেষণায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন ৬৬টি দেশের ২৩৪ জন লেখক। গবেষকগণ তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে (৩৫০০ পৃষ্ঠা) দেখিয়েছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষই দায়ী।এই গবেষণা প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে ১৯৫ টি দেশ অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক প্রমাণ করেছেন যে বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষই দায়ী। মানুষ যে পরিবেশের জন্য দায়ী তা জানার জন্য অতদূর যাওয়ার দরকার নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে মানুষ আপাদমস্তক দায়ী। দেখা যায় যে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর ২০২১ সালে ১১ মাসে ৯১ টি পাহাড় কর্তন বা আঁচড় লাগানো হয়েছে। এই পাহাড়গুলো বর্ষা মৌসুমে ক্রমান্বয়ে ভেঙ্গে পড়বে। কোন কোন জায়গায় পাহাড় ধসের মতো ঘটনা ঘটবে। কোনভাবেই এই পাহাড়গুলোকে রক্ষা করা যাবে না। প্রতিবছর এরকম অনেক পাহাড় ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। World resource institute এর মতে পাহাড় বা বনাঞ্চল ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানো যাবে না। We cannot reach climate goals if we donÕt keep trees standing. প্রায় ২২ টি স্থান থেকে প্রায় ২২ লক্ষ ঘনফুট এর অধিক বালি অবৈধভাবে উত্তোলন করে জীববৈচিত্র্যের ওপর আঘাত হানা হয়েছে। সকলেই জানি, বালি উত্তোলনের নামে আমাদের দেশে সচরাচর কি হয়ে থাকে। বালি উত্তোলনের নামে নদীর পাড় কাটা হয়, ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ফেলা হয়, কখনো কখনো পাহাড়ের গায়ে আঁচড় লাগানো হয়ে থাকে।ইটভাটার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে ৩৩২ টি ইটভাটা অবৈধভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ইটভাটাগুলোর কালো বা বিষাক্ত ধোঁয়া বা বর্জ্য পরিবেশকে বিভিন্নভাবে দূষিত করছে। তথ্য রয়েছে যে, বারোটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পানি দূষণ করছে। তরল বর্জ্য নির্গমন করছে। এইগুলো আমাদের নদী এবং সাগরের সাথে মিশে যাচ্ছে। ফলে আমরা স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। ১৪৭ টির মত হাসপাতাল আমাদের নজরে রয়েছে যে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসটিপি নেই, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। গত ১১ মাসে প্রায় সাতাশটির মত পুকুর এবং জলাশয় ভরাট করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করা হয়েছে। বাইশটি শিপইয়ার্ড বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লংঘন করে, পরিবেশকে বিপর্যয়ের সম্মুখীন করে, অনেক মানুষের জীবনহানি করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসব প্রমাণ করে যে আমরা প্রতিনিয়ত কি পরিমান পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছি এবং এভাবে চলতে থাকলে এটা কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে তা সত্যিই ভাববার বিষয়।
চট্টগ্রামের বিষয়টা যদি বাদ দিয়ে যদি আরেকটু বৃহৎ অঙ্গনে দেখি তাহলে দেখতে পাই, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২৪ তম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ্য যে, দেশের যত্রতত্র ব্যাটারি ভাঙ্গার কারখানা গড়ে ওঠার ফলে পশু পাখির মৃত্যু হচ্ছে, সাভারের ট্যানারি এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অসন্তোষ, আমিনবাজার ডাম্পিং স্টেশনের ময়লার কারণে ভূপৃষ্ঠের পানির গুনগতমান গ্রহণযোগ্য মাত্রার বাহিরে থাকা, ধলেশ্বরী নদী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম, রাজবাড়ীতে বালি উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙ্গনের শিকার হওয়া, ই-বর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে পরিবেশ দূষণ হওয়া, ২০২১ সালে সারাদেশে ১১ টি হাতি মারা যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
উপরে যা বলা হলো, তা চরম এক বাস্তবতা। যার মুখোমুখি আমরা প্রতিনিয়ত। এহেন বাস্তবতায় আমরা কী অর্জন করতে চাই বা বিশ্ব এই মুহূর্তে কি করতে চাই, গেল জলবায়ু সম্মেলন আমাদেরকে কি ম্যাসেজ দিয়েছে। মূলত: ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রীন হাউজ গ্যাসকে অর্ধেক পরিমাণে নামিয়ে আনা এবং ২০৫০ সালে গ্রীন হাউজ গ্যাসের পরিমাণ শূন্যে নিয়ে আসা, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা পুরো বিশ্ববাসীর টার্গেট। এ টার্গেট অর্জনে ইতিমধ্যে অনেক দেশ তাদের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্য বেশকিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ৪,৪০,০০০ লোককে পরিবেশবান্ধব চাকরি প্রদান ও বেসরকারি খাতে প্রায় ৯০ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থায়ন। দুর্বৃত্তায়ন সবখানে -ব্যক্তি পর্যায়ে ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। ব্যক্তি পর্যায়ে এমন অনেক লোক দেখা যায়, যাদের দৃশ্যত কোন ইনকাম নেই, কিন্তু পরিবেশকে বিনষ্ট করে দিনে দিনে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে রূপান্তরিত হচ্ছে। এদের কাছে পরিবেশ সংরক্ষণের বাণীগুলো অরুচিকর। আবার, অনেকগুলো রাষ্ট্র রয়েছে যারা চায় না জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসতে। যেমন, সৌদি আরব জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করতে চায়। আরো চায় চীন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান। মাংস খাওয়া কমাতে চায় না ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কারণ তারা মাংস রপ্তানিতে শীর্ষে। পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র সুইজারল্যান্ড ও ভারতের অনাপত্তি রয়েছে। কারা সত্যিকারভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করবে ? যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে বলেই দিয়েছেন বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি খারাপ কিছু নয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা এভাবে কি বাড়তেই থাকবে। এর কি কোন সমাধান নেই। সমাধান আছে।এটা বিশ্ববাসীর কাছে অজানা নয়। অভাব শুধু আন্তরিকতার। বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখতে হলে গবেষণায় বলছে কয়লা ৮৯%, তেল ৫৮%, মিথেন ৫৯% রেখে দিতে হবে। কিন্তু কাজটি অত্যন্ত কঠিন। কে রাখবে ?
কে শুনবে কার কথা? সবাই পয়সা চায়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চায়, কে কাকে ছাড় দিবে। যেসব দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির শিকার চরমভাবে, তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের মূল নায়ক হল ধনী রাষ্ট্রগুলো। জলবায়ু তহবিল বাড়াতে হবে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতেও সহায়তার পরিমাণ বাড়াতে হবে। এই কাজটি করতে কোনভাবেই যেন দেরি না হয় সেদিকে সচেতন থাকতে হবে। সাহিত্যে ২০২১ সালে বুকার পুরস্কার প্রাপ্ত বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক উধসড়হ এধষমঁঃ তাঁর উপন্যাস ‘ঞযব ঢ়ৎড়সরংব’ এ একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। ঘটনাটি হচ্ছে এরকম। এক শ্বেতাঙ্গ পরিবারে কৃষ্ণাঙ্গ এক মহিলা গৃহপরিচারিকার কাজ করতো। দীর্ঘ চার যুগ ধরে শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলোকটি ওই মহিলাকে একটি বাড়ি লিখে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে যখন বাড়িটি লিখে দেয়া হয়, তখন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার বাড়ির প্রয়োজনীয়তা শেষ। আমাদের অবস্থা যেন সে রকম না হয়।
ঘুমাইয়া ছিলাম, ছিলাম ভালো
জেগে দেখি বেলা নাই।
তহবিল যখন আসবে তখন পৃথিবী যেন ধ্বংস স্তুপে পরিণত না হয়।
লেখক: পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়