গ্যাস সিলিন্ডার কেটে রি-রোলিং মিলে বিক্রি

6

তুষার দেব

রান্নাসহ বিভিন্ন খাতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) ভর্তি করার সিলিন্ডার কেটে ইস্পাত কারখানা বা রি-রোলিং মিলে বিক্রি করে দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। জেলার সীতাকুন্ড এলাকার তুলাতলীতে একাধিক জায়গায় এমন সিলিন্ডার কেটে মজুদ করার জায়গা আবিষ্কার করেছে র‌্যাব-৭। চলতি মাসে মাত্র পক্ষকালের ব্যবধানে ওই এলাকায় পৃথক দুটি অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির ১১ হাজার ছয়শ’ গ্যাস সিলিন্ডার জব্দ করেছে সংস্থাটি। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১২ জনকে।
র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই দশকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ড ও মিরসরাই এলাকায় দেশের অন্যতম ইস্পাত কারখানার পাশাপাশি এলপিজি প্ল্যাটও গড়ে উঠেছে। আবার সীতাকুন্ডের সমুদ্রসৈকতে গড়ে তোলা হয়েছে জাহাজ-ভাঙ্গা ইয়ার্ড। ইস্পাত কারখানাগুলোতে লোহার কাঁচামাল হিসাবে পরিত্যক্ত জাহাজের কাটা পাতগুলো সরবরাহ করা হয়। রি-রোলিং মিলে পুরনো বা কাটা পাতের ব্যাপক চাহিদা থাকায় লোহার কাঁচামাল সরবরাহে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্রও ওই এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার নানা কায়দায় সংগ্রহ করে বাড়তি লাভের জন্য সেগুলো কেটে রি- রোলিং মিলে কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, গ্যাসভর্তি সিলিন্ডারের মালিকানা থাকে কোম্পানির। ডিলাররা গ্রাহকদের কাছে বিক্রির জন্য সেগুলো বারবার রিফিল করে নেন। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের শর্ত মেনে এসব সিলিন্ডার দশ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। ব্যবহারের উপযোগী থাকলে রি-টেস্ট বা পুনরায় পরীক্ষার মাধ্যমে সেগুলো আরও পাঁচ বছর পর্যন্ত ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়া সিলিন্ডারগুলো বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সদস্যদের উপস্থিতিতে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলার বিধান রয়েছে।
র‌্যাব-৭ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. নূরুল আবছার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কোম্পানির মালিকানাধীন অধিক মূল্যের গ্যাস সিলিন্ডার বিভিন্নভাবে সংগ্রহের পর সেগুলো কেটে বিক্রি করে দেয়ায় কোম্পানিগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল। পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের ব্যবহারের সিলিন্ডার কেটে নষ্ট করায় বাজারে সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হয়েছে। জনসাধারণকে এ কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ ধরনের চক্রগুলোর প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে র‌্যাবের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
র‌্যাব জানায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সর্বশেষ গত ২৪ জুন সীতাকুÐের তুলাতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে এক হাজার ছয়শ’টি খালি গ্যাস সিলিন্ডারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- জাহাঙ্গীর আলম (৪২), মো. ইমতিয়াজ উদ্দিন (৩৬) ও জহির হোসেন (৩৪)। জব্দকৃত খালি গ্যাস সিলিন্ডারগুলো সড়কের পাশে একটি খোলা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে মজুদ করা হয়েছিল কাটার জন্য। এগুলোর বাজারমূল্য আনুমানিক প্রায় ৩৪ লাখ টাকা। গ্রেপ্তারকৃতরা অবৈধ পন্থায় গ্যাস সিলিন্ডার কেটে কাঁচামাল হিসেবে রি-রোলিং মিলে বিক্রি করে দেয়ার সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। এর আগে গত ৮ ও ৯ জুন টানা দু’দিন একই এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে খালি গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ ও কাটার অভিযোগে নয় জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই অভিযানে ১০ হাজার গ্যাস সিলিন্ডারও জব্দ করা হয়। এসময় সিলিন্ডার মজুদ করার অভিযোগে ইসমাইল হোসেন ওরফে কুসুম (৫১), মো. মহসীন (৫১) ও মো. নুরুন্নবী (৪৮) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া সিলিন্ডার কাটার সময় হাতেনাতে ধরা হয় আরও ছয় শ্রমিককে। তারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এলপিজি গ্যাসের খালি সিলিন্ডার সংগ্রহ করে তুলাতলীতে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মজুদ করতেন। পরে সেগুলো সেখানে কেটে লোহার কাঁচামাল হিসেবে বিভিন্ন রি-রোলিং মিলে সরবরাহ করতেন। এলপিজি গ্যাস কোম্পানিগুলো এসব সিলিন্ডারে গ্যাস ভর্তি করে বিক্রি করে থাকে। আর গ্রাহকরা সেগুলোতে বার বার গ্যাস ভর্তি করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু সিলিন্ডার কেটে রি-রোলিং মিলে বিক্রি করলে বেশি লাভ হয় বলে সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো নানা কৌশলে এনে তুলাতলীতে মজুদ করত। জব্দকৃত ১০ হাজার খালি গ্যাস সিলিন্ডারের মধ্যে দুই হাজার ছিল কাটা। ঘটনাস্থল থেকে দুটি ট্রাকও জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া চক্রটির দলনেতা হলেন ইসমাইল হোসেন কুসুম। খালি গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ ও কাটার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কুমিল্লা ও সীতাকুন্ড থানায় আগের দুটি মামলাও রয়েছে।