গ্যাং কালচার ও পারিবারিক কলহে বেড়েছে খুনোখুনি

69

সদ্যবিদায়ী বছরে তুলনামূলকভাবে চট্টগ্রামে খুনোখুনির ঘটনা বেড়েছে। থানা পুলিশের পরিসংখ্যানে খুনের ঘটনায় পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২০১৮ সালে অন্তত ৯৪টি বেশি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। নানাবিধ কারণে এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হলেও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে কিশোরদের মধ্যে অধুনা সংক্রমিত হওয়া পাশ্চাত্যের ‘গ্যাং কালচার’ আর পারিবারিক বিরোধই তালিকার ওপরের দিকে রয়েছে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দু’পক্ষের ঝগড়ার জেরে বিয়োগান্তক পরিণতি যেমন ঘটেছে, তেমনি স্বজনের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে স্বজনেরই হাত। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের বলিও হয়েছে অনেকে।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ আওতাধীন থানা এবং মহানগর পুলিশের রেকর্ডকৃত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিদায়ী বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে সাতশ’ ৪৮টি। তার পূর্ববর্তী বছরে একই অভিযোগে মামলা রেকর্ড করা হয়েছিল ছয়শ’ ৫৪টি। সেই হিসাবে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে খুনোখুনির ঘটনা বা মামলা বেড়েছে ৯৪টি। এর মধ্যে বিদায়ী বছরে রেঞ্জ আওতাধীন ১১ জেলার একশ’ ২০টি থানায় খুনের মামলা হয়েছে ছয়শ’ ৭৮টি। আর মহানগর পুলিশের আওতাধীন ১৬ থানায় খুনের অভিযোগে ৭০টি হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে মহানগরীর থানাগুলোতে ৬৬টি খুনের মামলা দায়ের হয়। আর রেঞ্জ আওতাধীন ১১ জেলার থানাগুলোতে একই বছর রেকর্ড করা হয়েছিল পাঁচশ’ ৮৮টি হত্যা মামলা। খুনের ঘটনা তদন্তে নেমে পুলিশ প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে শুরুতেই কী কারণে হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে সেটাই নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে। দুয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুনের কারণ নিশ্চিত হওয়া গেলে খুনি কিংবা খুনিচক্রকে শনাক্ত করা সহজ হয়ে যায়। আর খুনিদের গ্রেপ্তার বা আইনের আওতায় আনতে প্রযুক্তি সুবিধার ওপর পুলিশের নির্ভরতা বেড়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) খন্দকার গোলাম ফারুক পূর্বদেশকে বলেন, ‘খুনের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার নানাবিধ কার্যকারণ রয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতার মত বিবিধ প্রভাবও খুনের ঘটনার নেপথ্যে কাজ করতে পারে। আমরা সাধারণভাবে খুনের ঘটনার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত শেষ করার ওপর জোর দিয়ে থাকি। বিগত বছরেও পুলিশ প্রতিটি খুনের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারসহ অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখায় নি। পক্ষ-বিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়নি। তবে, সামগ্রিকভাবে খুনসহ নানাবিধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন মেনে চলার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের সেদিকেও নজর দেয়া জরুরি।’
পুলিশের বছরওয়ারী মামলা সংক্রান্ত পরিসংখ্যানে কোনো হত্যাকান্ডের কারণ আলাদাভাবে নথিভুক্ত করা না হলেও তদন্তে সেটা উঠে আসে। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনেও কী কারণে হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে তা প্রকাশ পায়। এ ধরনের প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, পাশ্চাত্য সমাজব্যবস্থার অনুকরণে হাল সময়ে কিশোরদের মধ্যে সংক্রমিত হওয়া গ্যাং কালচার এবং তাদের বিপথগামীতার পেছনে মহল্লাভিত্তিক রাজনৈতিক ‘বড়ভাইদের’ প্রশ্রয় কিংবা মদদ সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছে। তুচ্ছ বিষয় কিংবা পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর অপরাধীরা মেতেছে ভয়ংকর হত্যাকান্ডে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে অস্থিরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিরোধের জেরে খুনের ঘটনাও তালিকার ওপরের দিকে রয়েছে। ভরসার স্বজন হয়ে ওঠেছেন স্বজনের হন্তারক। কোথাও স্বামী হত্যা করছেন স্ত্রীকে, কোথাও স্ত্রীর হাতে খুন হয়েছেন স্বামী। সন্তানের হাতে মা-বাবা কিংবা বাবা-মায়ের হাতে সন্তান হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার মত পিলে চমকানো ঘটনাও সংঘটিত হয়েছে। সামাজিক অনুশাসন ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ছাড়াও আর্থিক অসচ্ছলতা, মাদকাসক্তি, অপরাধসংক্রান্ত ব্যবসায়িক বিরোধ, অনৈতিক সম্পর্ক, সহনশীলতার অভাবসহ নানা কারণে খুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে কিশোরদের মধ্যে চুরি-ছিনতাই বা ঘর পালানোর মত অপরাধকে পেছনে ফেলে খুনের মত ভয়ংকর অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত বছরের ১৬ জানুয়ারি, ২১ ও ২৭ মে, এবং ১৭ ও ১৮ জুন নগরীতে সংঘটিত অন্তত পাঁচটি খুনের ঘটনায় কিশোরদের সম্পৃক্ততা পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, উঠতি বয়সে একধরনের হিরোইজম অনুভব করা স্বাভাবিক। কিন্তু, এ বয়সীদের খুনসহ নানাবিধ অপরাধে জড়ানোর অন্যতম কারণ হচ্ছে ‘সঙ্গদোষ’। কিশোর বয়সে যেমন ‘আইকন’ হিসেবে কাউকে অনুসরণের প্রবণতা থাকে তেমনি নিয়মিতভাবে যাদের সঙ্গে চলাফেরা বা উঠাবসা করা হয় তাদের একটা প্রভাবও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করে। এক্ষেত্রে খারাপ সঙ্গ যারা পায় তারা বেপরোয়া ও বিপথগামী হচ্ছে চোখের পলকেই। কেননা, যার হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকে তিনিই তাদেরকে বিপথগামী হতে প্রলুব্ধ করেন। এ বয়সে পরিণতির ভাবনা কম থাকার সুযোগ নিয়ে তাদেরকে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়াতে উৎসাহ প্রদান করেন। তবে কিশোর বয়সে বিচক্ষণতা বা দূরদর্শিতার অভাব থাকা অমূলক নয়।
বর্তমান প্রজন্মের কিশোরদের গতিবিধির ওপর অভিভাবকদের নজর কিংবা তাদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহযোগিতা কমছে বলে মনে করেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি ডিবি-বন্দর) এস এম মোস্তাইন হোসেন। তিনি বলেন, ‘শিশু-কিশোরদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল নিজের পরিবার। পারিবারিকভাবে তার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অভিভাবকরা সহযোগিতা না করলে বা উদাসীনতার পরিচয় দিলে বিপথগামীতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই অভিভাবকদেরকে শিশুকালের মত উঠতি বয়সেও সন্তানের খোঁজ-খবর রাখতে হবে। তাদের বন্ধু হতে হবে। স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট এখন যেমন মামুলি ব্যাপার তেমনি জীবনধারারও অপরিহার্য বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। তবে কিশোর সন্তান প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে কী করছে না সেটাও নজরে রাখতে হবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারজনিত কারণে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে।’