গোলপোস্ট আগলে রাখা রূপনার ঘর নেই, ক্ষেতের আল ধরে বাড়ি যায় ঋতু

16

রাঙামাটি প্রতিনিধি

সাফ গেমসে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের গোলপোস্ট আগলে রাখেন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা গোলরক্ষক রূপনা। আর দরজাহীন এক কক্ষের কুঁড়ে ছাউনিটিকে বৃষ্টি থেকে আগলে রাখেন মা কালাসোনা চাকমা! এত মেডেল ও সাফল্য তো আর বৃষ্টিকে আটকে দিতে পারে না! দুই চালা ছাউনির এক কক্ষের ওই কুঁড়েঘরে থাকেন কালাসোনা চাকমা, তার ছেলে অটিল চাকমা, ছেলে বউ রিতা চাকমা আর দুই নাতি-নাতনি। এক কোনায় পাতা আছে ছোট চৌকি। কোন আসবাবপত্রও নেই। প্রতিবেশিদের কাছ থেকে ধার করে নেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ। শুধু একটি বাল্ব-ই জ্বলে সেখানে। ঢাকা থেকে ফিরলে সেই ঘরে জায়গা হয় না রূপনার। থাকেন অন্য কারো বাড়িতে। কালাসোনা চাকমার এ আক্ষেপ যেন শেষ হয় না। বেড়েই চলে দীর্ঘশ্বাস।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ৩-১ গোলে নেপালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। সেই দলের দুই সদস্য মিডফিল্ডার ঋতুপর্ণা চাকমা ও গোলকিপার রূপনা চাকমার বাড়ি রাঙামাটিতে। এরমধ্যে ঋতুর বাড়ি কাউখালী উপজেলার মগাছড়ি চাকমা পাড়ায়। আর রূপনা চাকমার বাড়ি নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ভুঁইআদাম পাড়ায়।
সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ঋতুপর্ণা ও রূপনা চাকমার বাড়িতে চলছে আনন্দের উচ্ছ্বাস। আর এই আনন্দে শামিল হয়ে উচ্ছ¡সিত গ্রামবাসীও। ঋতু আর রূপনার জন্য সরকারি চাকরি আর ঘর নির্মাণের দাবি জানিয়েছে তাদের পরিবার। গ্রামের সড়ক, সেতু আর বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থার দাবিও তাদের।
জাতীয় দলের সদস্য আর ফুটবল ক্যারিয়ার এক হলেও রূপনা আর ঋতু চাকমার জীবনের গল্প আলাদা। দেশ বিদেশে আলো ছড়ানো ঋতুপর্ণা আর রূপনার বেড়ে ওঠা সাধারণ পাহাড়ি পরিবারে। গত বুধবার সকালে রূপনার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার পরিবারের সাথে। কক্ষের বেড়ায় শোভা পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নেয়া রূপনার পুরস্কারের ছবিসহ তার দলের বেশ কিছু বাঁধাই করা গ্রুপ ছবি। পাশেই ঝুলছে বেশ কিছু মেডেল।
৬৫ বছর বয়সী রূপনার মা কালাসোনা চাকমা জানালেন, মানুষের কাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। এখন প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। তাই কাজ বন্ধ। বাঁ চোখে দেখতে পান না। ছোট ছেলের কুঁড়েঘরেই আশ্রয় তার। চান চিকিৎসা আর একটি বাড়ি। দুই ভাই আর দুই বোনের মধ্যে রূপনা সবার ছোট। বড় তিন ভাইবোন বিয়ে করে আলাদা সংসারি হয়েছেন। বড় ভাই শান্তিজীবন আর ভাবী রিতা চাকমার দাবি রূপনার জন্য একটি সরকারি চাকরি। আরেক ভাই অটিল চাকমা চান গ্রামের সড়ক আর বাড়ির পাশে বড়মাহরুম নদীতে সেতু।
ঋতুপর্ণার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার পরিবারের সাথে। টিনের ছাউনি আর বেড়ার তিন কক্ষের বাড়ি তাদের। কক্ষের বেড়ায় শোভা পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নেয়া ঋতুর পুরস্কারের ছবিসহ তার দলের বেশ কিছু বাঁধাই করা গ্রুপ ছবি। পাশেই ঝুলছে বেশ কিছু মেডেল। সাজিয়ে রাখা হয়েছে অনেকগুলো শিরোপা। খুশির আমেজ বাড়ি জুড়েই। প্রতিবেশিরাও আসছেন সামিল হতে।
ঋতুর মা বোজপুতি চাকমা বললেন, শিশু বয়সে ২০১৫ সালে বাবা বরজ বাঁশি চাকমাকে হারিয়েছেন ঋতুপর্ণা। চার বোনের মধ্যে ঋতু চতুর্থ। তারপর তাদের পরিবারে এসেছিল একমাত্র ভাই পার্বন চাকমা। সেও গত ২৯ জুলাই বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে মারা যায়। ঋতুর দল সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় এই আনন্দের খবর বাবা আর ভাইকে দিতে না পারলেও খুশি পরিবার, গ্রামবাসী ও দেশের মানুষ। তিন বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় এখন মাকে নিয়েই সংসার ঋতুর। এই খুশির অংশিদার হিসেবে ঋতুর আর্থিক নিরাপত্তার জন্য একটি সরকারি চাকরির দাবি করেন ঋতুর মা বোজপুতি আর বোন পুতুলি চাকমা।
ঋতুপর্ণাদের গ্রামের মানুষ প্রতিদিনকার প্রয়োজন পূরণ করেন মগাছড়ি ছড়া পার হয়েই। সড়ক নেই। ধানের খেতের আল ধরে যাতায়াত করতে হয়। গ্রাম থেকে পিচঢালা সড়কে পৌঁছাতে চার কিলোমিটার পাহাড়ি খাল-বন পাড় হতে হয়। আর রূপনাদের গ্রাম নানিয়ারচরের ঘিলাছড়ি ভুঁইআদাম গ্রামে। সেখানে যেতে বড়মাহরুম নদীর ওপর বাঁশের সাঁকোতে পার হওয়া গেলেও কোন সড়ক নেই। পাহাড়ের ঢাল ধরে যেতে হয়। অথচ তাদের অর্জনে এই গ্রামে এখন যাচ্ছেন ডিসিসহ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা।
পাহাড়ে নারী ফুটবলের আতুরঘর রাঙামাটির ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়। যেখানে ফুটবল দুনিয়ায় হাতেখড়ি হয়েছে পাহাড়ের সন্তান জাতীয় দলের তারকা খেলোয়াড় মনিকা, আনাই, আনুচিং, ঋতুপর্ণা ও রুপনা চাকমার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাফল্য অর্জনে গর্বিত বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান।
রূপনা চাকমার বাড়ি দ্রুত তৈরি করে দিতে বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে রাঙামাটির জেলা প্রশাসককে। রাঙামাটির পাহাড়ি কন্যাদের এমন সাফল্যে আনন্দে সামিল হতে রাঙামাটি ডিসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান গত মঙ্গলবার ঋতুপর্ণা ও রূপনা চাকমার বাড়িতে যান। সেখানে তাদের দুই পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছেন তিন লাখ টাকার চেক।
ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভালো পৃষ্টপোষকতা পেলে পার্বত্য অঞ্চল থেকে আরও প্রতিভাবান নারী খেলোয়াড় উঠে আসবে।