গৃহকর আদায়ে ‘ঘুষ দুর্নীতির’ ফাঁদ?

35

নিজস্ব প্রতিবেদক

নগরীর ২৭নং দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের মোজাম্মেল হোসেন নামের এক গৃহকর দাতা অভিযোগ করেন, ‘১৯৯৪ সালে আমাদের বাড়ির গৃহকর দিতে হতো ১ হাজার টাকা। ২০০৮ সালে সে কর বেড়ে হয় ৫ হাজার টাকা। ২০১২ সালে হুট করে আবারও বাড়িয়ে করা হলো ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকায়। সেবারে কোনো উপায় না পেয়ে অনেকটা বাধ্য হয়ে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে ৭০ হাজার টাকায় নির্ধারিত করা হয়। কিছুদিন আগে সে কর আবারও বেড়ে হলো ৩ লাখ ১৪ হাজার টাকা। গত ৭ জুন আমি ৪র্থ কোয়ার্টারের হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে গেলে ট্যাক্স কালেক্টর ও তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাকে দুইটি অপশন দেয়। তার একটি হলো ৩ হাজার টাকা দিয়ে আপিল ফরম কিনে আপিল করা, দ্বিতীয়টি তাদেরকে ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দিলে ১ লাখ টাকার মধ্যে এনে দেওয়ার কন্ট্রাক্ট করা। যার কোনোটাই আমি করিনি। মেয়র প্রায়সময় পত্র পত্রিকায় বলছেন, তিনি ট্যাক্স বাড়াননি পরিধি বাড়িয়েছেন।’ তাহলে ৯১ সালে যে চারতলা বাড়ি ২২ সালেও সে একই চারতলা বাড়িতে গৃহকর কিভাবে ৩ লাখ ১৪ হাজার টাকা হয়? এমন প্রশ্ন তোলেন মোজাম্মেল। তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সার্কেল-৭ এর কর কর্মকর্তা সুজনের নামে এ ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন।
২০নং দেওয়ান বাজার ওয়ার্ডের বাসিন্দা শহিদপুত্র রাজীব ভট্টাচার্য অভিযোগ করে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের গৃহকর দিতে হয় না। আমি শহিদপুত্র হওয়ার পরও কর দিতে হয়। ২ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করেছিলো, কষ্ট করে পরিশোধ করতাম। এখন তা বাড়িয়ে এসেসম্যান্ট করেছে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা আমার। তপন দাশ গুপ্ত নামের এক সিটি করপোরেশনের ট্যাক্স কর্মকর্তা আমার থেকে কমিয়ে দেওয়ার নামে ঘুষ দাবি করছেন।’
শুধু মোজাম্মেল বা রাজীব ভট্টাচার্য নয়, অসহনীয় কর ধার্য ও কমিয়ে দেওয়ার নাম করে ঘুষ দাবি করার অভিযোগ করেছেন অন্তত ১৫ জন। এ ছাড়া নালায় পড়ে নিহত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সাদিয়ার নিহত হওয়া নিয়ে তার দাদা হাজী জামাল ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা এড. জাহাঙ্গির অভিযোগ করেন, ‘অসহনীয় গৃহকরের জ্বালায় বাঁচি না। তার উপর কিছুদিন ধরে ওয়াসি এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠান হোল্ডিং নম্বরের সাইনবোর্ড টাঙানোর নামে ৩শ টাকা কর নিচ্ছেন। সে প্রতিষ্ঠানকে নাকি সিটি করপোরেশন এসব করার অনুমতি দিয়েছে। আমি এসবের প্রতিকার চাই।’
গতকাল শুক্রবার বিকাল ৪টায় চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদ-এর উদ্যোগে কদমতলী আবুল খায়ের মেম্বার সড়কে চসিকের দুর্নীতি ও নাগরিক হয়রানি বিষয়ে ‘গণশুনানি’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে করদাতারা উপস্থিত হয়ে বর্ধিত গৃহকর আইন বাতিল ও কর প্রদানে ঘুষ-দুর্নীতির এসব অভিযোগ করেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আমির উদ্দীনের সঞ্চালনায় গণশুনানি সম্পর্কে ধারণা দেন কাজী শহীদুল হক স্বপন। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি নুরুল আবছার।
গণশুণানিতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা জনস্বাস্থ্য অধিকার সংরক্ষণ কমিটি চট্টগ্রামের সদস্য সচিব ডা. সুশান্ত বড়–য়া বলেন, ‘বর্ধিত গৃহকরের কারণে শুধুমাত্র ভবনের মালিকরা আক্রান্ত নন। যারা ভাড়ায় থাকেন তারাও ভুক্তোভোগী হবেন। কেননা গৃহকর বাড়লে ভাড়াও বাড়বে। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে। আজকের গণশুনানিতে উঠে এসেছে জন্ম থেকে মৃত্যুসনদ নিতে ঘুষ দিতে হয়। এসব বিষয় নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পত্রিকায় পড়েছি পৃথিবীর কোথাও জনপ্রতিনিধি তার শহরের নাগরিকের জন্য মামলা করেননি। কিন্তু আমাদের মেয়র তাঁর একান্ত সচিবকে দিয়ে করদাতা সুরক্ষা পরিষদ সভাপতির বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছেন। সিটি মেয়রকে আহŸান করবো জনপ্রতিনিধি হিসেবে আচরণ করবেন, সত্যিকারের নেতা হিসেবে প্রমাণ করার জন্য মামলা প্রত্যাহার করে নাগরিকদের প্রতি আপনার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়ার অনুরোধ করছি।’
মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আজকের গণশুনানিতে মানুষের অভিযোগ, ক্ষোভ শুনে বুঝতে পারলাম সিটি করপোরেশনের কর কমানো যায়। তবে তার জন্য ঘুষ দিতে হয়। কর্তাদের সাথে সেটেলমেন্ট করতে হয়। মেয়র বলছেন আপিল করে কমাতে হয়। সিস্টেমের কারণে ঘুষ-দুর্নীতির সুযোগ থেকে যাচ্ছে। তাই মেয়রকে বলব দৈর্ঘ্য প্রস্থ গুণ করো তার উপর কর ধরো। দরকার হলে সেটার উপর ১০ বা আলোচনা করে বোঝা না হয় মতো শতাংশ বাড়িয়ে দিন। তাহলে এসেসমেন্ট আসবে না, কমানো বাড়ানোর পরিস্থিতিও তৈরি হবে। ঘুষ-দুর্নীতির সুযোগও থাকবে না।’
পরিচ্ছন্নতার জন্য গৃহকর ও টাকা দুটোই দিতে হয় বলে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন,‘ আমি একটি ল্যাব চালাই। খুবই সুন্দরভাবে বর্জ্যগুলো আলাদা করে ডাস্টবিনে রাখা হয়। সিটি করপোরেশন সেগুলো নেওয়ার জন্য একটি লোক দিয়েছেন, যিনি মাসে ১৫শ টাকা করে নেন। এখন কথা হলো, এসব সিস্টেমের কারণে কিছু সংখ্যক লোক টাকা কামিয়ে যাচ্ছেন, মাঝে সরকার এবং জনগণের দূরত্ব বাড়ছে। তাই এসব বিষয়ে মেয়রের সঠিক অবস্থানে আসা উচিত।’
প্রকাশ্যে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ করায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক এড. আখতার কবির বলেন, ‘সিটি করপোরেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। বলতে বাধ্য হচ্ছি সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এটি। রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুষ-দুর্নীতি ঢুকে গেছে। বর্তমান মেয়র মনোনয়ন পাওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম তিনি জনবান্ধব হবেন। আর তিনিই এমন একটি কাজ করে বসলেন, যে আইনটির মাধ্যমে কর বহুগুণ বাড়ালেন যেটি দেশের কোথাও প্রয়োগ করা হয়নি। সাবেক মেয়র সাহস দেখিয়েছিলেন পরে জনগণের আন্দোলনের মুখে পিছু হটেছেন। কিন্তু মেয়র রেজাউল সাহেব দুঃসাহস দেখিয়েছেন। জনগণ রাস্তায় নেমে গেলে আপনার ঘুষখোর কর্তা আর আপনি কোথায় যাবেন ভাবতেও পারবেন না। ওনাকে পরিচ্ছন্ন মানুষ হিসেবে জানতাম, আজকে তিনি চট্টগ্রামের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আপনি যদি নাগরিকের কথা সহ্য করতে না পারেন তাহলে আপনার উচিত আগামীকালই পদত্যাগ করা। আপনাকে এ চেয়ারে মানায় না। আশপাশে ঘুষখোরদের লালন করছেন, সুরক্ষা দিচ্ছেন।’
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়–য়া বলেন, ‘ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা হলে, মানুষের সাথে অন্যায় হলে তাদের পক্ষে আমি আছি। আমার বাড়িতে গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে। আপনাদের আন্দোলনকে সমর্থন করে আমি এখনও গৃহকর দিইনি। আমরা কর দিচ্ছি পরিবেশ-নদী সুরক্ষায় আমাদের সচেতন হতে হবে। অন্যথায় ভুক্তভোগী আমাদেরই হতে হবে।’
পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করতে গিয়ে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আমির উদ্দীন বলেন, ‘আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত ৪১টি ওয়ার্ডে গণমতবিনিময় হবে। আগামী ৩০ অক্টোবর দুদকে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। যাতে আজকের শুনানিতে যাদের দুর্নীতির কথা উঠে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে যেন দুদক ব্যবস্থা নেয়। স্থানীয় এমপিদের সুবিধাজনক সময়ে স্মারকলিপি, ডিসির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিব। আগের নির্ধারিত করের উপর ১০ বা ১৫ শতাংশ বাড়ালে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।’