গুলিবিদ্ধ হাত সেলিমকে মনে করিয়ে দেয় সেই পৈশাচিকতা

30

সবুর শুভ

রাজনীতির জন্য উত্তপ্ত দিন ২৪ জানুয়ারি। সালটা ছিল ১৯৮৮। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সমাবেশ করবেন। লালদীঘি ময়দানে লাখো জনতার সামনে তিনি গণতন্ত্র উদ্ধারের মহামন্ত্র শোনাবেন। ক্রমে ক্রমে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছে লালদীঘি ময়দানে। চারদিকে জনতার ভিড় ভেঙে ছুটে আসছে এক একটি জনতরঙ্গ। নেত্রীকে দেখে আবেগ-ভালবাসায় উন্মাতাল মানুষ হাত উঁচিয়ে বরণ করে নিচ্ছিলেন। হঠাৎ বেপরোয়া গুলির শব্দ। যেন সারি সারি গুলি লাইন ধরে বের হচ্ছে পুলিশের বন্দুকের অসংখ্য নলছুঁয়ে। মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে লুটিয়ে পড়েছে অনেকে। অনেকের মগজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে চারদিকে। রক্তাক্ত নিথর দেহের স্তূপ। পুরো লালদীঘি ও এর আশপাশের স্থান যেন তাজা রক্তে লাল। কয়েকজন পুলিশ মাত্র ১০-১২ হাত দূর থেকে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার দিকে রাইফেল তাক করেছে। তাদের মুখের ভাষা ছিল ‘গুলি করি, গুলি করি’। মনে হল অনন্তকালের জন্য সময় স্তব্ধ হয়ে গেল- চরম পরিণতি নেমে এলো। সেদিন নেতাকর্মীরা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে আগলে রেখেছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। কিন্তু ততক্ষণে একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন প্রাণহীন ২৪ জন দলীয় নেতাকর্মী। আহত হয়েছিলেন অগুনিত। পুরো বাংলাদেশ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম মুহূর্তেই ভূতুড়ে শহরে পরিণত হয়। শতশত নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। তাদেরই একজন মো. সেলিম উদ্দিন। ঘটনার সময় তিনি টগবগে যুবক। করতেন ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধু ও দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কথা শুনলে রক্ত ফিনকি দিয়ে উঠত তার। যেন রক্তে আগুন লাগার মত অবস্থা। ১৯৮৮ সালে নাজিরহাট কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ঘটনার দিন দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা লালদীঘি মাঠে আসার খবর শুনে কাটিরহাট থেকে বিমানবন্দরে ছুটে যান সিনিয়র নেতাদের সাথে। স্বৈরশাসক এইচএম এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোটের জনসভায় শেখ হাসিনা যাওয়ার পথে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। নেত্রীর বহরে করে কোতোয়ালি মোড়ে আসার সাথে সাথে পুলিশ গুলিবর্ষণ শুরু করে। চোখের সামনেই পুলিশের গুলিতে ৬ জন নিহত হওয়া প্রত্যক্ষ করেন তিনি। নিজের ডান হাতেও গুলি লাগে। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত দেখার ফুরসত তার ছিল না। এসময় সাথে থাকা খোরশেদ আলম সুজন (বর্তমান নগর আওয়ামীলীগ এর সহ-সভাপতি), আওয়ামী লীগ নেতা শাহনেওয়াজ চৌধুরী সেলিম উদ্দিনসহ অনেককেই উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল নিয়ে যান। আহত অসংখ্য নেতা কর্মীর আহাজারীতে ভারী হয়ে উঠে পুরো হাসপাতালের পরিবেশ। সেদিন রাত ১১টায় আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম মেডিকেলে দেখতে যান সেলিমসহ আহতদের। পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ এর কেন্দ্রীয় নেতারা। ঘটনার ৩৪ বছর পার হলেও কেউ কোনো খবর নেয়নি সেলিমের। এক প্রকার আক্ষেপ করে বললেন সেলিম উদ্দিন।
ঘটনার পর হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি চলে যান তিনি। পরবর্তিতে বিদেশে পাড়ি জমান। ওমান ও দুবাইতে কাটান একটানা ১৭ বছর। গত লকডাউনে দেশে চলে আসেন। বর্তমানে হাটহাজারী কাটিরহাট গ্রামের বাড়িতে দিন কাটে। স্ত্রী, দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে সেলিমের পৃথিবী। রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকলেও মনকে এখনও প্রবোদ দেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মশালবাহী হিসেবে। আমৃত্যু থাকতে চান বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুসরণ অনুকরণ করেই। সেই ভয়াল দিনে গুলিবিদ্ধ ডান হাতের ক্ষত স্থানে হাড় না থাকায় কাজ করতে সীমাহীন কষ্ট হয় সেলিমের। সেদিনের বিভীষিকাময় ঘটনার কথা মনে পড়লে আঁতকে উঠেন। বাতাসে দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে বলেন, খবর নেয় না কেউ। প্রতি বছর ২৪ জানুয়ারি আসে সেলিমদের জীবনে। কষ্টটা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়ে যায়।
প্রসঙ্গত : এরশাদশাহীর পতনের পর ১৯৯২-এর ৫ মার্চ চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী মো. শহিদুল হুদা বাদী হয়ে ৪৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন এ ঘটনায়। কিন্তু বিএনপি আমলে মামলার কার্যক্রম এগোয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে মামলা পুনরুজ্জীবিত হয়। হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদাকে প্রধান আসামি করা হয়। দীর্ঘ ৩২ বছর পর ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি এ গণহত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। ৫ পুলিশের ফাঁসির হুকুম হয় রায়ে। প্রধান আসামি মির্জা রকিবুল হুদা ইতিমধ্যে মারা যান এবং তৎকালীন প্যাট্রোল ইনসপেক্টর জেসি মÐল ফেরারি।
যার সীমাহীন কষ্ট, ঘাম ও আন্তরিক তৎপরতায় এ মামলা রায় পর্যন্ত পৌঁছে চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের পিপি এডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী জানান, আলোচিত এ মামলা বর্তমানে ডেথ রেফারেন্সের জন্য হাইকোর্টে রয়েছে। আর মামলায় ফাঁসির দÐপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য জেসি মন্ডলকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।