গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

53

সুব্রত কুমার নাথ

‘মানুষ’ কবিতার এ চরণদ্বয়ের মধ্যে যিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন। মানুষের মাঝে ব্যবধান দূর করে সাম্যের কথা বলেছেন। সত্য ও সুন্দরের জন্য যিনি একহাতে বাঁশরী আর অন্যহাতে রণতূর্য ধরেছেন। কেবল বিদ্রোহের চেতনাকে নয়, অপার ভালোবাসার সুধাকে ধারণ করে যিনি এ সমাজ ও জাতিকে নতুনরূপে সৃষ্টি করেছেন, যিনি শুধু তাঁর ধর্মে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না, অপরাপর সব ধর্মের প্রতিও অগাধ ভালোবাসা ছিল। তিনি হলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (জন্ম: ২৪ মে ১৮৯৯ – মৃত্যু: ২৯আগস্ট ১৯৭৬)। মুসলিম ধর্মের একটি ধর্মীয় রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও মননে ও আচরণে তিনি ছিলেন চিরকাল অসা¤প্রদায়িক। তাঁর বাবা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাযারের খাদেম। নজরুল নিজেও গ্রামের স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করতেন। মক্তবে কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত¡ অধ্যয়ন করতেন। ছোটোবেলা থেকে নিজ ধর্মের অনুশাসন ও আদর্শের মধ্যে বড় হয়েও অন্য ধর্মের প্রতি ছিলেন তিনি পরম শ্রদ্ধাশীল। এ অসা¤প্রদায়িকতা খুঁজে পাই তাঁর বিভিন্ন গানে ও কবিতায়। তিনি বলেছেন- মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান/ মুসলিম তার নয়ন মনি/ হিন্দু তাহার প্রাণ। সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই-এ বাণীতে বিশ্বাস রেখে মানুষকে তিনি উচ্চ আসনে স্থান দিয়েছেন এবং সব ধর্মের মানুষকে আপন করে নিয়েছেন। এ অসা¤প্রদায়িক চর্চা তাঁর চার সন্তানের নামের মধ্যেও খুঁজে পাই। তিনি তাঁর সন্তানদের নাম রেখেছেন কৃষ্ণ মুহাম্মদ,অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…, মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই… তিনি যেমন এসব ইসলামী সংগীত ও গজল লিখেছেন। তেমনি, মা আমায় হাতে কালি মুখে কালি / মা আমার কালিমাখা মুখ দেখে মা পাড়ার লোকে হাসে খালি…, / সখী সেহরি কেমনে বল/ নাম শুনে যার এত প্রেম জাগে চোখে আনে এত জল। এসব শ্যামা সংগীত ও ভজনও লিখেছেন। এতে সনাতন ধর্মের প্রতি তাঁর অনুরাগ ও গভীর জ্ঞানের পরিচয় পাই।
নজরুলের রচনার ভেতর দিয়ে যেমন তাঁর মানবিকতা ও সাম্যের চিত্র ফুটে ওঠে তেমনি তাঁর ভেতরে বিদ্রোহ সত্তাও জেগে ওঠতে দেখি। তাঁর এ বিদ্রোহ- সমাজের উচ্ছৃঙ্খল ও শোষণের বিরুদ্ধে। প্রথাগত কুসংস্কার ও শাসকের বিরুদ্ধে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি বলেছেন, আমি চিরদুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস/মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস/আমি মহাভয়,আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!/আমি দুর্ব্বার, আমি ভেঙে করি সব চুরমার!/আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল/আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল! তাঁর কবিতার এক একটি শব্দ যেন বারুদের মতো যা শাসকের দুর্বীনিত আচরণ ও অন্যায়কে ধ্বংস করে দিত। তাঁকে তাই কারাবরণও করতে হয়েছে। তাতে তাঁর কলম আরো শাণিত হয়েছে বেশি। কাঁপিয়ে দিয়েছে শাসকের ভিত। তাঁর এই বিদ্রোহ যেমন আন্দোলিত করেছে মানুষকে তেমনি আবার প্রেম ভালোবাসায় জয় করে নিয়েছে মানুষের হৃদয়কে। নজরুলের হৃদয়ে কানায় কানায় প্রেম ছিল । তাঁর অসংখ্য গান ও কবিতায় এ প্রেম-বিরহ, অভিমানের রূপ ফুটে উঠেছে। প্রেমিক নজরুলের আসল পরিচয় মেলে তাঁর রচিত গান ও কবিতায়। ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী/দেব খোঁপায় তারার ফুল, ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’, এ আঁখিজল মোছ প্রিয়া /ভুলো ভুলো আমারে, যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই,/কেনো মনে রাখো তারে। এ ধরনের গানে তাঁর অপার্থিব প্রেমের উৎসরণ ঘটেছে। মানবিকতা, প্রেম ও দ্রোহের ভেতর দিয়ে একটি সুন্দর সুস্থ পৃথিবী গড়ে তুলতে নজরুল ছিলেন খুবই সোচ্চার। সমাজের সব কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী চেতনা আমরা তাঁর লেখা কবিতা, গান, প্রবন্ধে খুঁজে পাই। তিনি চেয়েছেন, সব বাধা -ব্যবধান ভুলে গিয়ে সমতা প্রতিষ্ঠা পাক এবং মানুষের জয় হোক। মানুষকেই তিনি সবচেয়ে বড় করে দেখেছেন। কবি মানুষের মাঝেই ঈশ্বরের দেখা পেয়েছেন। কবি ’ঈশ্বর’ কবিতায় লিখেছেন, ’ কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে/ কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি/পাহাড় চূড়ে ? / হায় ঋষি দরবেশ/বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই যে নারী-পুরুষ সমানতালে অবদান রেখে আজকের এই আধুনিক পৃথিবী গড়েছে তার কথা তাঁর নারী’ কবিতায় উঠে এসেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, সাম্যের গান গাই / আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!/ বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। এ কবিতায় কবি নারীকে তার যোগ্য সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর কবিতায় ছিল মানুষের অধিকারের কথা। সমতার কথা। মানুষ তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করছে। সেই অধিকারের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। তিনি জাত-পাতের ঊর্ধ্বে থেকে মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন। মানুষের সাথে মানুষের যে ভালোবাসার সম্পর্ক হওয়া উচিত আমরা তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমাদের মন এখন লোভ-লালসায় পূর্ণ। অহমিকা, হীনতা,নিচুতা এসব আমাদের মনে বাসা বাঁধছে। এসব অনৈতিকতার বিরুদ্ধে তাঁর ছিল কঠিন অবস্থান। তাঁর ছিল সত্য উচ্চারণের অদম্য সাহস। ছিল নির্ভয়চিত্ত এক মানবতাবাদী মন। আজ সমাজ পরিচালিত হয় অর্থের মাপকাঠিতে। আজ অর্থের বিচারে কেউ ধনী কেউ গরীব। আজও আমরা দরিদ্রতাকে দূর থেকে কটাক্ষ করি। দরিদ্র মানুষকে ভালোবাসতে শিখিনি। শিখেছি তাদের কীভাবে বঞ্চনা করা যায়। তাকে ঠকিয়ে কীভাবে আরও অর্থ- বিত্তের মালিক হওয়া যায়। অথচ এই কুলি-মজুরদের শ্রমের কারণে আমরা ভালোভাবে বেঁচে আছি। তাদের ঘামেই পৃথিবী আধুনিক হয়ে উঠেছে। সবলের সাথে আজ দুর্বলের অধিকারের লড়াই। দুর্বল সবলের এ পার্থক্য কবিকে খুবই আহত করেছে। তার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠেছে কবির ”কুলি মজুর” কবিতায়। তিনি লিখেছেন- ”দেখিনু সেদিন রেলে/কুলি বলে এক বাবু সাব তারে/ঠেলে দিলে নিচে ফেলে!/চোখ ফেটে এলো জল/এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া/মার খাবে দুর্বল?” এভাবেই দুর্বলের জন্য, নিপীড়িত মানুষের জন্য কবির হৃদয় বারবার কেঁদেছে। দুর্বলের জন্য ছিল তাঁর গভীর সমবেদনা ও অনুশোচনা তেমনি অত্যাচারীর জন্য ছিল তার ঘৃণা। তাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় উৎপীড়নের কান্না থামানোর জন্য তিনি বিদ্রোহী হয়েছেন। তার প্রলয় নাচনে ভয় জেগেছে অত্যাচারীর মনে। তবু মানুষের জন্য, জুলুমের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কলম কোনোদিন থামেনি।
তাঁর কবিতা গান যুগ যুগ ধরে মানুষকে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে। শোষিত মানুষকে আশার আলো দেখাচ্ছে। তিনি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন তাঁর বলিষ্ঠ লেখনীতে। অন্যায় উচ্ছৃঙ্খলকে পৃথিবী থেকে সরাতে তিনি জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে আজীবন সত্যের পথে হেঁটেছেন। তাঁর বাণীতে উজ্জীবিত হয়ে বাঙালিরা নিঃসংকোচে, নির্দ্ধায় আলোর পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলার মানুষের প্রেরণাপুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জন্য আদর্শ ও সাহসের প্রতীক। যতদিন বাঙালি থাকবে ততদিন নজরুল তাঁর সকল সৃষ্টিকর্মের দ্বারা বাঙালির অন্তরে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে। আজ সত্য ও সুন্দরের স্বপ্নদ্রষ্টা কালোত্তীর্ণ জাতীয় কবির ১২৪ তম জন্মদিনে কবিকে জানাই শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইছাপুর বাদশা মিয়া চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ, ফটিকছড়ি

নজরুল : সত্য ও সুন্দরের স্বপ্নদ্রষ্টা