গাজায় ট্যাংক নিয়ে রাতভর ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান

12

পূর্বদেশ ডেস্ক

গাজায় স্থল অভিযান পরিচালনার যে কথা জানিয়ে আসছিল ইসরায়েল, তার বাস্তব ভয়ানক রূপ গত রাতে প্রত্যক্ষ করেছে গাজাবাসী। সাঁজোয়া ট্যাংক ও বুলডোজারের বহর নিয়ে সীমানা অতিক্রম করে গাজার বিভিন্ন স্থানকে নিশানা করে রাতভর হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ)।
গতকাল বৃহস্পতিবার অভিযানের একটি ভিডিও শেয়ার করে আইডিএফ বলছে, যুদ্ধের পরবর্তী প্রস্তুতি, হামাস যোদ্ধাদের আস্তানা ও ট্যাংক বিধ্বংসী মিসাইল হামলার ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার অংশ হিসেবে তারা এই অভিযান চালিয়েছে। অভিযানের পর সেনারা ইসরায়েলে ফিরে গেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বেশ কয়েক দিন ধরেই গাজায় স্থল হামলা চালানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়ে আসছিলেন। তবে কখন, কীভাবে ওই আক্রমণ চালানো হবে, সে ব্যাপারে আগে থেকে কিছু জানাননি।
গত ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার জবাব দিতে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল। এসব হামলার মধ্যেই স্থল অভিযান চালানোর ব্যাপারে হুঁশিয়ারি করে আসছিল দেশটি। এজন্য গত সপ্তাহে গাজা ও উত্তরাঞ্চলের ১১ লাখ বাসিন্দাকে নিরাপদে সরে যেতে বলেছিল তারা।
কিন্তু জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, যেসব বাসিন্দা বাড়িঘর ছেড়েছিলেন, দক্ষিণের অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় তারা ফের উত্তরের ফিরে আসতে শুরু করেছিলেন।
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে রক্তাক্ত গাজাবাসীর এই ছোটাছুটি শেষ হচ্ছে না। ইসরায়েলের হামলায় সাড়ে ৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭০০ জনই শিশু।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খাবার ও চিকিৎসা সংকটে তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে গাজায়। জাতিসংঘ বলছে, আগামি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে জ্বালানি শেষ হয়ে আসবে। হাসপাতালগুলো কেবল জরুরি চিকিৎসা সেবা দিতে পারছে।

এমন অভিযান প্রথম নয়
বিবিসি জানিয়েছে, গতরাতে যে অভিযান চালানো হয়েছে, সেটি ৭ অক্টোবরের পর থেকে প্রথম কোনো অভিযান নয়। ১৩ অক্টোবরও গাজায় এমন আক্রমণ চালানোর কথা জানায় আইডিএফ। হামাসকে লক্ষ্য করে তারা সেনা ও ট্যাংক পাঠিয়ে আক্রমণ চালায়। সেদিনই উত্তর গাজার বাসিন্দাদের সরে যেতে বলা হয়।
চারদিন আগে ২২ অক্টোবর গাজায় অভিযানের সময় ইসরায়েলের ট্যাংক লক্ষ করে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ইসরায়েলি সেনা নিহত ও তিনজন আহত হয়।
সবশেষ আক্রমণের দৃশ্যে ইসরায়েলের সেনাদের ট্যাংক ও বুলডোজার নিয়ে এগোতে দেখা যায়। তবে বিবিসি বলছে, সেনারা প্রতিরোধ স্থল খুঁজে বের করে সেগুলোর ধ্বংস করছে, স্থল আক্রমণের এমন দৃশ্যই কেউ দেখতে চাইবেন। কিন্তু ছবিতে সেই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না।

ফুরিয়ে এসেছে জ্বালানি, কমছে জাতিসংঘের ত্রাণকাজ
জাতিসংঘ ত্রাণ সংস্থাগুলো বলেছে, জ্বালানির মজুদ প্রায় ফুরিয়ে আসায় তারা গাজায় ত্রাণকাজ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিয়ে দিতে শুরু করেছে। জ্বালানির মজুদ যে সামান্য পরিমাণ বাকি আছে সেটি দক্ষিণে পানি সরবরাহের জন্য ব্যবহার হচ্ছে। যে অঞ্চলে ইসরায়েলের হামলা থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছে শত শত
মানুষ। এই জ্বালনিও গতকাল বৃহস্পতিবারেই ফুরিয়ে যাওয়ার কথা।
ত্রাণসংস্থাগুলো জানিয়েছে, জ্বালানির অভাবে তারা হাসপাতাল এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া বেকারিগুলোতেও সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে।
ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ এর যোগাযোগ পরিচালক জুলিয়েত্তে তোউমা বলেছেন, ‘গাজায় আমরা যে পরিস্থিতি দেখছি তা নজিরবিহীন। ২০ লাখ মানুষ আটকা পড়ে আছে। বাইরে থেকে খুবই কম সহায়তা আসায় গাজার অবস্থা শ্বাসরুদ্ধকর’।
গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের যোদ্ধাদের হামলায় কমপক্ষে ১৪শ’ জন নিহত এবং ২২৪ জন জিম্মি হওয়ার পর ইসরায়েল এর জবাবে গাজায় পাল্টা হামলা শুরু করে। এরপর থেকে অবিরাম বিমান হামলা চলছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত গাজায় ৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
হামলার পাশাপাশি ইসরায়েল গাজায় বিদ্যুতসহ খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহও বন্ধ করে দিয়েছে। জাতিসংঘ সেখানকার পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর আখ্যা দিয়েছে।
গত ২১ অক্টোবরে প্রথম মিশরের রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজায় ২০ ট্রাক ত্রাণ ঢোকে। এই সামান্য ত্রাণকে ‘মহাসাগরে এক ফোঁটা পানির’ সঙ্গেই তুলনা করেছিল জাতিসংঘ। এরপর থেকে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে এখন পর্যন্ত গাজায় মাত্র ৭৪ ট্রাক খাবার, পানি ও ওষুধ সাহায্য ঢুকেছে, যেখানে চলমান যুদ্ধের আগে গাজায় প্রতিদিন ঢুকত প্রায় ৫০০ ট্রাক সাহায্য।
জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ এর যোগাযোগ পরিচালক জুলিয়েত্তে তোউমা বলেছেন, তাদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নেওয়া ৬২৯,০০০ বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রাণ বাঁচাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন।
এই মানুষদের বেশিরভাগই ইসরায়েলের হামলা থেকে বাঁচতে উত্তর গাজা থেকে সরে এসে ইউএনআরডব্লিউএ- এর আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। তোউমা বলেন, আমরা সবচেয়ে বড় মানবিক ত্রাণ সংস্থা। এখন আমরা ত্রাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি।

নিহত ৭ হাজার ছাড়াল, শিশুর সংখ্যা ৩ হাজার
অবরুদ্ধ গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে এই খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। জবাবে ইসরায়েল হামাস শাসিত গাজায় বোমাবর্ষণ শুরু করে। সেই থেকে বোমাবর্ষণ চলছেই। তখন থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলিদের সহিংসতাও বাড়তে থাকে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ইসরায়েলি হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত নিহত ৭ হাজার ২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৯১৩ শিশু রয়েছে, নারী ও বয়স্কদের সংখ্যা যথাক্রমে ১ হাজার ৭০৯ ও ৩৯৭ জন।
অন্যদিকে ৭ অক্টোবর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলিদের হামলায় নিহত ১০০ ছাড়িয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের উৎপাত বেড়েছে।
এদিকে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, গাজায় হামাস কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে চলমান যুদ্ধে নিহতের সংখ্যার সঠিকতা নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত নিরপরাধদের হত্যা করা হয়েছে এবং এটি যুদ্ধের মূল্য।
গাজায় শিশুদের হতাহতের ঘটনা বাড়তে থাকায় নিন্দা জানিয়েছে ইউনিসেফ। ইউনিসেফের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকার আঞ্চলিক পরিচালক আদেল খোদর বলেন, গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি আমাদের সবার বিবেকের ওপর ক্রমবর্ধমান কলঙ্ক। তিনি বলেন, আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, যদি উত্তেজনা না কমে এবং খাদ্য, পানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং জ্বালানিসহ মানবিক সহায়তার অনুমতি না দেওয়া হয়, তাহলে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে।