গর্ভপাত: যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের আদেশে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ

13

পূর্বদেশ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের আদেশে মার্কিন নারীদের গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার উল্টে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই একে নারীর অধিকারের ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অনেক দেশের কাছে ‘মডেল’ হওয়ায় এখন অন্যান্য দেশেও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে বলে কেউ কেউ আশঙ্কাও করছেন।
প্রায় ৫০ বছর আগে রো বনাম ওয়েড মামলার রায়ের কারণে এতদিন মার্কিন নারীরা গর্ভধারণের ৬ মাস পর্যন্ত তুলনামূলক সহজেই গর্ভপাত করতে পারতেন।
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট ওই রায় পাল্টে দেওয়ায় শিগগিরই দেশটির অনেক রাজ্যে গর্ভপাত নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যমগুলো। তবে বেশকিছু রাজ্য বলছে, সর্বোচ্চ আদালত কেড়ে নিলেও তারা নারীর গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষেই থাকবে।এ সুবিধা থাকলে অন্য রাজ্যের তুলনামূলক ধনী নারীরা চাইলেই যেসব রাজ্যে গর্ভপাত বৈধ সেখানে যেতে পারলেও দরিদ্ররা বিপাকে পড়বেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সুপ্রিম কোর্টের আদেশে ‘স্তম্ভিত’ হওয়ার কথা জানিয়েছেন। খবর বিডিনিউজ।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রো বনাম ওয়েড মামলায় আপিলের রায় দিয়েছিল ১৯৭৩ সালে। তার ৫ বছর পর ইতালিতেও ‘ল ১৯৪’ পাস হলে গর্ভপাত বৈধ হয়।
গর্ভপাত ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইতালিতে এতটা গুরুত্ব না পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাথলিক গির্জা সংশ্লিষ্ট কট্টর-ডানপন্থি কিছু গোষ্ঠী বিষয়টি সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সে কারণে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে ইতালিকেও নড়েচড়ে বসতে হচ্ছে। দেশটির বাম ও মধ্যপন্থি ঘরানার রাজনীতিকরা সমস্বরে মার্কিন আদালতের আদেশের নিন্দা জানাচ্ছেন।
উঠোনে ভ্যাটিকান থাকায়, সমকামিতাসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল ইস্যুতে ইতালি এখনও ইউরোপের অন্য দেশগুলোর মতো উদার নয়। ভ্যাটিকান গর্ভপাত নিয়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে, যার প্রভাবে ইতালিতেও পড়তে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোটের্র আদেশ আয়ারল্যান্ডকে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়েছে। দেশটিতে গর্ভপাত বৈধতা পেয়েছে মাত্র কয়েক বছর হল, এর মধ্যে মার্কিন আদালতের এমন রায়!
মুদ্রার অন্য পিঠও আছে। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের গর্ভপাতবিরোধীরা এখন খুশিতে আটখানা। আমাদের এখানে এই রায় হয়তো ঘুম খানিকটা ভাঙাবে। যুক্তরাষ্ট্রে যা হচ্ছে, তা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমার ব্যক্তিগত আশা হচ্ছে, ভবিষ্যতে কোনো একদিন আমাদের এখানেও আইন বদলাবে। আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রে খুবই বুদ্ধিদীপ্ত আন্দোলন হয়েছে। এটাই আশা দিচ্ছে। লড়াই চলবে, বলেছেন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সুপরিচিত গর্ভপাতবিরোধী কর্মী বার্নি স্মিথ।
সা¤প্রতিক সময়ে গর্ভপাত নিয়ে আগের কট্টর অবস্থান থেকে খানিকটা সরতে দেখা যাচ্ছিল লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে রো বনাম ওয়েড মামলার রায় উল্টে যাওয়ায় পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতির আশঙ্কা করছেন অধিকার কর্মীরা।
কানাডা সাধারণত তার প্রতিবেশী এবং সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপরে নাক গলায় না। কিন্তু শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রো বনাম ওয়েড মামলার রায় পাল্টে দেওয়ার পর জাস্টিন ট্রুডো চুপ করে থাকতে পারেননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে ‘ভয়াবহ ধাক্কা’ ও ‘নারীর জন্য ভয়ানক’ বলে অভিহিত করেছেন। সত্যি কথা বলতে, এটি প্রত্যেকের স্বাধীনতা ও অধিকারের ওপর আঘাত, রুয়ান্ডায় কমনওয়েলথ সম্মেলনে বলেন কানাডার এ প্রধানমন্ত্রী।
১৯৮৩ সাল থেকে বৈধ হলেও কানাডায় গর্ভপাতের সুযোগ সুবিধা তেমন নেই। দেশটির একটি প্রদেশ নিউ ব্রæনসউইকে কোনো গর্ভপাত ক্লিনিক নেই; অনেক এলাকার নারীদের গর্ভপাত করাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে নির্ধারিত হাসপাতালে যাওয়া লাগে। কানাডায় গর্ভপাতবিরোধীর সংখ্যাও কম নয়, তবে এই ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্রের মতো এত গুরুত্ব পায় না।
ভারতের নারী অধিকারকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে ‘ভিক্টোরীয় মূল্যবোধ’ তাড়িত সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এই রায় বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলল।
রো বনাম ওয়েড মামলার রায় কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নারীর প্রজনন অধিকারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, বিশ্বজুড়েই এর প্রভাব দেখা যাবে, বলেছেন নারী অধিকারকর্মী ও ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক ড. বীণা জেএস, যিনি চিকিৎসকদের মেডিকেল এথিকস পড়ান।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭১ সাল থেকে গর্ভপাত বৈধ; তবে দেশটিতে কন্যাসন্তান জন্ম দিতে অনাগ্রহ থেকে অনেকে ভ্রুণ হত্যায় ব্রতী হওয়ায় গর্ভপাতের ক্ষেত্রে কিছু শর্তও আছে। নানান কুসংস্কার ও ধর্মীয়-নৈতিক কারণে চিকিৎসকদের অনীহায় অনেক নারীকেই নিবন্ধিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের বাইরে গর্ভপাতে ঝুঁকতে হয়।