গভীর সমুদ্র বাণিজ্য ও সুনীল অর্থনীতির দ্বার উন্মোচন

7

মো. আবদুর রহিম

বঙ্গবন্ধু কন্যা, সফল রাষ্ট্রনায়ক দার্শনিক শেখ হাসিনার সুদক্ষ নীতির কারণে বিশ^জুড়ে মন্দার উৎকণ্ঠার মধ্যেও বাংলাদেশে সমুদ্র বাণিজ্যে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। অফুরন্ত সম্পদের ভাÐার বঙ্গোপসাগর। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে থাকা বিরোধ মিমাংসার পর সাগরে দেশের স্থলভাগের প্রায় সমপরিমাণ এলাকার মালিকানা পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০১২ সালের ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের (পিসিএ) রায়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে মামলায় বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকার দখল পায়। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমার আনুমানিক ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের অধিকার পায় বাংলাদেশ। এরপর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও গবেষণায় জোর দেন। ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ। সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ এবং এর যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিবকে আহŸায়ক করে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৫ সালে সমুদ্র সম্পদ গবেষণার জন্য কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিউিট। ২০১৭ সালে জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠন করা হয় ‘বøু ইকোনমি সেল’। দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে চালু করা হয় সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ। ২০১৮ সালে নৌবাহিনী সদর দফতরের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউটি অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিমরাড) নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ এ সমুদ্র অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাঁচ ধরনের কৌশল ঠিক করা হয়েছে। যার অন্যতম হলো সামুদ্রিক সম্পদের বহুমাত্রিক জরিপ দ্রæত সম্পন্ন করা। বিগত ১০ বছর যাবত সমুদ্র সম্পদ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে, হংকং, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, অস্টেলিয়া, চীন সহ বিশে^র বেশির ভাগ দেশ বহু বছর ধরে সমুদ্র অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। প্রাপ্ত তথ্য বলছে সিঙ্গাপুরের জিডিপির ৪০ ভাগ সমুদ্র নির্ভর। ইন্দোনেশিয়া ‘ঞযব খড়সনড়শ নষঁব বপড়হড়সু রসঢ়ষবসবহঃধঃরড়হ ঢ়ৎড়মৎধসসব’ এর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৭৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং প্রতিবছর ১১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সামুদ্রিক সম্পদের উৎকর্ষ সাধন ও পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে বছরে আয় করছে প্রায় ৪৭.২ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার যা তাদের জিডিপির ৩ শতাংশের বেশি। সেদেশটির ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে অর্থনীতিতে বøু-ইকোনমির অবদান হবে প্রায় ১০০ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার। চীনের অর্থনীতিতে গত ৫ বছরে ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মেরিটাইম ইন্ডাস্ট্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। যা চীনের মোট জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ। এ দেশটি বøু-ইকোনমি কেন্দ্রিক যে পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন হলে ২০৩৫ সাল নাগাদ জিডিপিতে মেরিন সেক্টরের অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বøু-ইকোনমি হতে বাৎসরিক গ্রস মূল্য সংযোজন ৫০০ বিলিয়ন ইউরো এবং এতে ৫ মিলিয়ন লোকের কর্মসংস্থান সুযোগ তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক সহায়তা এবং উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি), জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি), বিশ^ব্যাংক, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উন্নয়ন কৌশলের মূলেও রয়েছে বøু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি। এদিকে বিশ^জুড়ে মন্দার উৎকণ্ঠার মধ্যেও গভীর সমুদ্র বাণিজ্যে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ এবং অংশগ্রহণ বাড়ছে। এখাতে দেশীয় জনবলের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ছে। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমা বিরোধী নিস্পত্তির এক দশক পর এসে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং প্রচেষ্টায় গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৯০টি। ২০২২ সালের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৯টি জাহাজ জলে ভাসিয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও কয়েকটি জাহাজ রেজিষ্ট্রেশনের অপেক্ষায় রয়েছে। সরকারের নীতি সহায়তার কারণে সমুদ্রগামী বাংলাদেশ পতাকাবাহী জাহাজ বাড়ছে। সরকার এ খাতে ২০১৮ সাল থেকে নীতি সহায়তা দিয়ে আসছে। সরকার ২০১৮ সালে জাহাজ আবগারিতে মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি দেয়। ২০১৯ সালে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজে ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের বাধ্যবাধকতা রেখে ফ্ল্যাগ ভেসেল প্রোটেকশন আইন প্রণয়ন করে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে সরকার আগাম কর প্রত্যাহার, পুরনো জাহাজের আয়ুস্কাল ২২ বছরের পরিবর্তে ২৫ বছর এবং আমদানি পর বিক্রয়ের সময়সীমা ৫ বছরের পরিবর্তে ৩ বছর নির্ধারণ করে। ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরের বাজেটে বিদেশি পণ্য পরিবহন করে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে, তার ওপর কর ভার ৮ বছরের জন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারের এসব নীতি সহায়তার সুফল হিসেবে প্রতি বছরই সমুদ্রে বিনিয়োগ বাড়ছে। ২০১৯ সালে সমুদ্রগামী বাংলাদেশি জাহাজ ছিল ৪৭টি, ২০২০ সালে বেড়ে হয় ৬৪টি, ২০২১ সালে ৭০টি, ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৯০টি বাংলাদেশী জাহাজ সমুদ্রে ভাসছে। বিগত তিন বছরে এই খাতে নতুন জাহাজ যুক্ত হয়েছে ৪৫টি। এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার। এই খাত থেকে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৩১১০ কোটি টাকা, সাশ্রয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশের জাহাজ মালিকদের বহরে থাকা সমুদ্রগামী জাহাজের অধিকাংশই একসঙ্গে ৫০-৫৫ হাজার টন পণ্য পরিবহন করতে পারে। এর বাইরে ফিডার জাহাজ, যা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর ও শ্রীলংকার মধ্যে কন্টেইনার আনা নেওয়ার কাজে নিয়োজিত।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে সমুদ্র বিভাগ চালু হলো। তারা পাস করে কীভাবে বøু-ইকোনমিতে অবদান রাখবে সেই পলিসি প্রয়োজন। আমাদের দেশে মেরিন স্পেশাল প্ল্যানিং দরকার। সমুদ্রের কোন এলাকায় খনিজ সম্পদ, কোন এলাকায় মাছ, কোন এলাকায় পর্যটনের গুরুত্ব এসব বিবেচনায় প্লান করা দরকার। আমাদের পুরো সমুদ্রে কোথায় কী আছে, কোনটি আহরণ সম্ভব, কোনটি সম্ভব নয় তা, প্রতি বছর কোন সম্পদ কী পরিমাণ আহরণ করা হবে সেগুলো প্লানে নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিভিন্ন তথ্যে বলেছে, বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমার তলদেশে যে সম্পদ রয়েছে, তা টেকসই উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনামাফিক ব্যবহার করা গেলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিবছর আড়াই লাখ কোটি ডলার আয় করা সম্ভব। সুনীল অর্থনীতির দ্বার সমুজ্জ্বল। বøু-ইকোনমির দিকে ধাবিত হতে হবে আমাদের।
লেখক : কলামিস্ট