গণিত বিশারদ প্রফেসর ড. আতাউল হাকিম

21

রশীদ এনাম

পাখি ডাকা ছায়া ঘেরা চির সবুজের হাতছানি দেয়া গ্রাম নাইখাইন গ্রাম। খাইন শব্দটি এসেছে বসতি বা ছোট জলাশয় খইয়া থেকে। পটিয়া কাগজী পাড়া হয়ে আড়াকান রোড থেকে সোজা উত্তর পাশে যে সরু সড়কটি চলে গিয়েছে তা দিয়েও যাওয়া যায় আবার গৈড়লা মোড় দিয়ে যে রাস্তাটি পূর্ব দিকে গিয়েছে তা দিয়েও যাওয়া যায়। নাইখাইন গ্রামে প্রবেশ করলে দেখা যাবে রাস্তার পাশে সবুজ ধান ক্ষেত, সারি সারি তাল গাছ, পুকুর বিল ঝিল ছোট সরু খাল, দৃষ্টিনন্দন নাইখাইন সন্তোষালয় বৌদ্ধবিহার। নাইখাইন গ্রামে প্রবেশ করলে দেখা যাবে। নাইখাইন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন, উপমহাদেশের বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গের প্রথম মুসলিম গণিতবিদ ডক্টর আতাউল হাকিম স্যার। পটিয়া নাইখাইন গ্রামের কৃতি সন্তান।
গণিতবিদ আতাউল হাকিমের আলোর ছোঁয়াতে আলোকিত হয়েছিল ভারতবর্ষও । উপমহাদেশে কলকাতার গণিতবিদ ও পন্ডিতরা যাকে এক নামে চিনত। একদা তিনি কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ছিলেন। অনেকটা বিস্মৃত অধ্যায় বর্তমান প্রজন্মরা হয়ত অনেকে জানে না, বিস্মৃত অধ্যায়টি তুলেধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। তিনি হলেন পটিয়ার নাইখাইন গ্রামের দেশবরেণ্য গণিতবিদ প্রফেসর ডক্টর আতাউল হাকিম স্যার।

জন্মকথা ও পরিবার : প্রফেসর ডক্টর আতাউল হাকিম পটিয়া নাইখাইন গ্রামের মোজাহেরুল্লাহ মুন্সী বাড়িতে ১ জানুয়ারী ১৮৯৪ জন্মগ্রহন করেন। পিতা মুনসী চাঁদ মিয়া। মাতা মেহের নিগার, স্ত্রী খুরশীদ আরা বেগম । গণিতবিদ আতাউল হাকিমের চারপুত্র ও চার কন্যার জনক। ১ম পুত্র আনিস হাকিম ৬ মাস বয়সে মারা যান।

শিক্ষা : নাইখাইন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক গৌড়চন্ড ভিক্ষুর কাছে পড়ালেখার হাতে-খড়ি। নিজভূমের বর্তমান নাইখাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ছোট বেলা থেকে ছিলেন তুখোড় মেধাবী ছাত্র। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সে সময়ে তিন বৃত্তি পেয়েছিলেন। আবদুস সোব্হান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন সেখানেও তিনি মধ্য ইংরেজি বৃত্তি পান। পরবর্তীতে তিনি ৭ম ও অষ্টম শ্রেণী অধ্যায়ন করেন পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ম্যাট্রিকুলেশন চট্টগ্রাম ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা থেকে। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯১৩ সালে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯১৬ সালে বিএ এবং পরবর্তীতে এম এ অংকশাস্ত্র(প্রথম শ্রেনীতে প্রথম) ১৯১৮ সালে এম এ আরবী(প্রথম শ্রেনীতে প্রথম)। আরবী এবং গণিতে মেধার স্বাক্ষর রেখে ডবল এমএ করেন। শিক্ষাজীবনে একে ফজলুল হক, হোসেন সোহরাওয়ার্দী, ডক্টর শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী, ডক্টর টি আহমেদ, ডক্টর বি করিম সহ আরও অনেকে তাঁর সহপাঠি ছিল।

কর্মজীবন ও গবেষণা : গণিতবিদ আতাউল হাকিম ছিলেন আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর ছাত্র সে সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে আরবিতে এমএ পাশ করেন। কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। চট্টগ্রাম কলেজে প্রভাষক হিসেবে বেশ কিছুদিন অধ্যাপনা করেন। সে সময় তিনি ভারতের সিভিল সার্ভিসের জন্য নির্বাচিত হন। কোন একটা রহস্যজনক কারনে সে সময়ের সোনারহরিণ এই চাকুরিতে যোগ দেয়া হয়নি। পরবর্তীতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৪৯ সালে গণিতের উপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। আতাউল হাকিম স্যার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটর সদস্য নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরে ১৯৬০ সালের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। সেকেন্ডারী শিক্ষা বোর্ডের কলেজের ইন্সপেক্টর ছিলেন। তিনি ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন। গণিতশাস্ত্রের উন্নয়নে তিন হাজারেরও বেশি গণিতবিদের জীবন ও কর্ম নিয়ে তাঁর গবেষণার থিসিস ছিল দেখার মতো যা এক ঐতিহাসিক গবেষণার উজ্জল দৃষ্টান্তও বটে। তাঁর দীর্ঘ বাইশ বছরের কঠোর শ্রম ও মেধার ফসল ৩৭০৬ পৃষ্ঠার চার খন্ডে বিভক্ত গবেষণা অভিসন্দর্ভটি সামগ্রিক জীবনের শ্রেষ্টতম ফসল। এটার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টর ডিগ্রি প্রদান করেন। ডক্টর আতাউল হাকিম ছিলেন প্রথম মুসলিম যিনি প্রথম গণিত শাস্ত্রে ডক্টরেট সম্মানে ভূষিত হন। শুধু গণিত শাস্ত্রে নয় একাধারে আরবিতে এবং হোমিওপ্যাথিক বিষয়ে তিনি অধ্যয়ন করেছেন। হোমিওপ্যাথি বিষয়ে তিনি পূর্বপাকিস্তানে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি মেটারিয়া মেডিকার ওপর ৪৫০ পৃষ্ঠার একটি বইও রচনা করেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করে মানব সেবায় শুরু করেন বিশেষ করে তিনি নিষ্পেষিত মানুষদের বিনা চিকিৎসা ও ঔষদ পত্র দিতেন এজন্য সে সময় এলাকায় তাঁর বেশ সুনাম ছিল। পটিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর সহযোগিতা ছিল। কলকাতা ইসলামীয়া কলেজের ইংরেজ ব্যক্তি ব্যাকারের নামে একটি ছাত্রাবাস ছিল সেই ছাত্রাবাসের প্রভোস্ট ছিলেন অধ্যাপক ডক্টর আতাউল হাকিম সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমান ব্যাকার হোস্টেলের বর্ডার ছিলেন। চট্টগ্রামের একে খান ছিলেন আতাউল হাকিমের ছাত্র। ডক্টর হাকিম ছিলেন বাংলার মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ।
আতাউল হাকিমের আরেক নাতি আশফাক হাকিম বলেন, দাদা ভাইয়ের স্মৃতি যেটুকু খুব মনে পড়ে দাদার ওপেল কোম্পানীর কমলা রঙের একটা কার ছিল। একদিন দাদা ভাই ও আজিজুল হাকিম চাচার সাথে গাড়ি করে ধানমন্ডী ১৫ নং রোডে কি কোন একটা বাড়িতে গিয়েছিলাম সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দাদাজীকে খুব সম্মান করলেন, তিনি দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন, পরে জানলাম শেখ মুজিবুর রহমান যে সময় কলকাতা ইসলামীয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন সে সময় বঙ্গবন্ধু ইসলামীয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। দাদাজী যে সময় ইন্তেকাল করেন, তাঁর মরদেহ যখন চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দাদাকে চির বিদায় দেয়ার জন্য ফুলবাড়িয়া স্টেশনের এসেছিলেন। সেই স্মৃতিটুকু আজও মনে পড়ে।

দক্ষ সংগঠক ও অর্জন : ডক্টর আতাউল হাকিম শুধু গণিতবিদ ছিলেন না একজন সংগঠক ও ছিলেন। কলকাতায় সে সময় চট্টগ্রামের ছাত্রদের পড়ালেখা ও খাদ্য সংকট, চট্টগ্রামের মানুষদের চাকুরী বিভিন্ন সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে খান বাহাদুর মুহাম্মদ ইব্রাহিম, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, আবদুল ওহাব চৌধুরী, নজির আহমদ চৌধুরী, এ্যাডভোকেট নুরুল হক চৌধুরী, মৌলানা আবদুল হামিদ প্রমুখ ব্যক্তিরা মিলে ১৯১২ সালে কলকাতায় বসবাসরত চাটগাঁইয়াদের নিয়ে কলকাতা চট্টগ্রাম মুসলিম ছাত্র সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই যাত্রা থেকে রাজধানীর বুকে চট্টগ্রাম মুসলিম সমিতি আজকের ঢাকা চট্টগ্রাম সমিতি। চট্টগ্রাম সমিতি-কলকাতা ১৯২৬-৩৫ সাল পর্যন্ত ডক্টর আতাউল হাকিম স্যার সভাপতি ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঢাকা চলে আসেন এবং ঢাকা ৩২ তোপখানা রোডে চট্টগ্রাম সমিতির কর্মকান্ড শুরু করেন যার ফসল ঢাকা বুকে এক খন্ড চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম সমিতি ভবন। যার জন্য তিনি নিরলসভাবে নিজের মেধা মনন ও সৃজনশীলতা দিয়ে চট্টগ্রাম সমিতির একজন নিবেদিত প্রাণ হিসেবে কাজ করে গেছেন। ডক্টর আতাউল হাকিম স্যার ঢাকাস্থ ২৮/১ তোপখানা রোডে তাঁর নিজস্ব বাসভবন ছিল, চট্টগ্রাম সমিতি ভবন সংলগ্ন, যেখানে তিনি সপরিবারে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে তা বিক্রি করে দেয়া হয়। চট্টগ্রাম সমিতিতে ডক্টর আতাউল হাকিম স্যারের বেশ সুনাম ও জনপ্রিয়তা ছিল । চট্টগ্রাম সমিতিতে তাঁর বেশ অবদানও রয়েছে। তা আমরা
পটিয়া শুভদন্ডি গ্রামের প্রয়াত ওয়ালি মাস্টারের একটা কবিতায় দেখতে পাই।
“এই যুগে ছিলেন যারা তাঁদের কথা স্মরি,
মাগফেরাৎ হউক তাঁদের যারা গেছেন মরি ।
ডক্টর হাকিম, ডক্টর রশিদ, ডক্টর ছানাউল্লাহ
শান্তি মাগি তাদের তরে পড়ি কুলহুআল্লাহ” ।
গণিতবিদ ডক্টর হাকিমকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিত্যানন্দ মেডেল প্রদান করা হয়। সমিতিতে বিশেষ অবদানের জন্য ডক্টর আতাউল হাকিমকে চট্টগ্রাম সমিতি কলকাতা থেকে সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান করেনে। ঢাকা চট্টগ্রাম সমিতিও ১৯৯৯ সালে ডক্টর আতাউল হাকিমকে চট্টগ্রাম সমিতি পদক ও সম্মাননা প্রদান করেন।

গণিতবিদ ডক্টর আতাউল হাকিমের শেষের ঠিকানা : গণিতবিশারদ ডক্টর আতাউল হাকিম। ডক্টর আতাউল হাকিমের বর্ণাঢ্য জীবন, তাঁর নিরহঙ্কার ও সাদামাটা চলাফেরা ও সদালপি সহজ সরল জ্ঞানতাপস মানুষটা ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সালে না ফেরার দেশে চলে যান। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় মৃত্যুর ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও পটিয়ায় কিংবা চট্টগ্রামে তাঁর নিজভূমে নেই কোন তাঁর স্মৃতি। আতাউল হাকিমের অরক্ষিত বাড়িতে তাঁর নামে গণিত একাডেমি করার জন্য চট্টগ্রামের সম্মানিত জনপ্রতিনিধিদের সু দৃষ্টি কামনা করছি।

লেখক : লেখক ও প্রাবন্ধিক, সমন্বয় সহকারী ইতিহাসের খসড়া