গণপরিবহনে সরব নগর স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে তদারকি প্রয়োজন

9

বৈশ্বিক করোনা মহামারির গতি প্রকৃতি বুঝা দায়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রকৃতির অনুজীব ও সংক্রমণ দেশে প্রবেশ করেছে মর্মে বিশেষজ্ঞদের মতামতের আলোকে দেশে শিথল ও কঠোর লকডাউন চলছে চার সপ্তাহ গত হয়েছে। কিন্তু একটি দেশ অনির্দিষ্ট কাল বন্ধ বা রকডাউনে থাকতে পারে না। জীবন বাঁচাতে লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও জীবন নির্বাহে জীবিকার প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি। দেশের মধ্য আয়, নি¤œ আয় ও হতদরিদ্র সমাজেরে কথা চিন্তা করলে জীবন ও জীবিকা দুটিকে গুরুত্ব দিয়ে একটি চেক এন্ড ব্যালেন্স-এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সম্ভবত সরকার সর্বশেষ তাতেই পা দিয়েছে। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার চলমান ‘লকডাউন’ তথা বিধিনিষেধের মেয়াদ ১৬ মে পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। একই সাথে এতোদিন বন্ধ থাকা অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃজেলার গণপরিবহন শুধুমাত্র জেলার অভ্যন্তরে চলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সেই হিসাবে ৬ মে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মহানগরী ও জেলার মধ্যে গণপরিবহন চলছে। তবে এ সময়কালে আগের মতোই বন্ধ থাকবে দূরপাল্লার পরিবহন, ট্রেন ও লঞ্চ। উল্লেখ্য, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকার জনসমাগম এড়াতে প্রথমে ৫ থেকে ১১ এপ্রিল নানা লকডাউন তথা বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরে এ নিষেধাজ্ঞা আরও দুই দিন বাড়িয়ে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত করা হলেও সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিল্প-কারখানা, গণপরিবহন প্রভৃতি চালু থাকায় ওই ‘লকডাউন’ থেকে করোনা মোকাবেলায় কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায়নি বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মত দেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ৮ দিনের ‘কঠোর লকডাউন’ শুরু হয়। এ সময় কঠোর লকডাউনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে দোকান-শপিংমল বন্ধ রাখাসহ ১৩টি নির্দেশনা দেওয়া হয়। ২১ এপ্রিল মধ্যরাতে সেই মেয়াদ শেষ হলেও করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় লকডাউনের মেয়াদও পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে, অবশেষে যা ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
অবশ্য সামনে ধম্যপ্রাণ মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদ ও জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে ২৫ এপ্রিল থেকে শপিংমল ও দোকানপাট একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানা চালু রাখারও অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সাথে ‘জেলাভিত্তিক’ গণপরিবহন চালুর সিদ্ধান্তও দেয়া হয়। বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ‘জেলাভিত্তিক’ গণপরিবহণ চালুর সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক হয়েছে, সময়েই তা বোঝা যাবে। তবে এ কথাও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছিল। নিরুপায় হয়ে অনেক শ্রমিক পেশা বদল করে দিনমজুরের কাজ করছে- এমন সংবাদও গণমাধ্যমে এসেছে। এক পর্যায়ে গণপরিবহন চালুর দাবিতে শ্রমিকরা সড়কে নেমে এলে সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, আইনের চোখে ফাঁকি দিয়ে কিংবা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম যেন না ঘটে। গণপরিবহন চলাচলের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম ও স্বাস্থ্যবিধি যাতে কঠোরভাবে প্রতিপালিত হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি। প্রয়োজনে প্রশাসনকে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। গণপরিবহন সীমিত আকারে চলার অনুমতি মেলায় সাধারণ মানুষ খুশি, দোকান ও শপিংমলের ব্যবসায়ীরা আরো বেশি খুশী। কিন্তু গণপরিবহনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে অভিযোগ আসতে শুরু হয়েছে, তারা স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশনাগুলো মানছে না। সরকারের ঘোষিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত বাড়া নিলেও যাত্রী বসানো ও মাস্ক ব্যবহারে চরম অনিহা প্রকাশ করছে। এ ক্ষেত্রে শপিংমল ও মার্কেটগুলোর ন্যায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দিয়ে বাধ্যতামূলক তদারকি টিম গঠন করা যায় কিনা ভেবে দেখা প্রয়োজন। অন্যথায় লকডাউনের উদ্দেশ্য ব্যহত হতে পারে।
একই সঙ্গে পরিবহন শ্রমিক-মালিক থেকে শুরু করে কল-কারখানার সঙ্গে যুক্ত জনগোষ্ঠী যাতে সরকার কর্তৃক শিথিল সিদ্ধান্তগুলো তথা প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ সংকটকালে লকডাউন বাস্তবায়নে সরকারের যে অভিজ্ঞতা, তার আলোকে গ্রাম-শহরসহ দেশের প্রতিটি জনপদে এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে, এটাই প্রত্যাশা।