খেলার সাথে রাজনীতিটা আমাদের মেশাতেই হয়

42

 

১. ঘটনা ১৯৭০ সালের, এই বাংলার কৃতি ক্রিকেটার রকিবুল হাসান তখন ১৮ বছরের টগবগে যুবক। পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-২৫ দলের ক্যাম্প চলছে করাচীতে। এক সন্ধ্যায় ক্রিকেটারদের মধ্যে আড্ডা চলাকালে পাকিস্তানের উত্তাল রাজনীতির প্রসঙ্গ চলে আসে। পেশোয়ারের বাঁহাতি স্পিনার কামরান রশীদ হঠাৎ বলে ওঠে, “আইয়ুব খান মেড আ মিসটেক, হি শুড কিলড দ্য মুজিব।” কথাটা বলার পর এক সেকেন্ডও দেরি হলো না। রকিবুল হাসানের প্রচন্ড এক ঘুষিতে সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো কামরান রশীদ। তারপর শুরু হয় ভয়ংকর পিটুনি। হাতের কাছে যা পেলেন, তাই দিয়ে পেটাতে পেটাতে কামরানকে মাটিতে লুটিয়ে ফেললেন রকিবুল হাসান। অবশেষে, রক্তাক্ত কামরান জীবন ভিক্ষা চেয়ে রকিবুলের হাত থেকে বেঁচে যায়। একজন বাঙালি ক্রিকেটারের এমন রুদ্রমূর্তি দেখে বিস্ময়ে, আতংকে পাথর হয়ে রইলো পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা। খোদ পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে বসে এই দুঃসাহসী প্রতিবাদের ঘটনা ঘটিয়ে তাক লাগিয়ে দেন বাঙালি যুবক রকিবুল হাসান।
এর পরের ঘটনা ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১, ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব একাদশ বনাম পাকিস্তানের টেস্ট ম্যাচ। বাঙালি হওয়ার অপরাধে বার বার বঞ্চিত হয় রাকিবুলদের। সেই টেস্ট খেলায় পাকিস্তান দলে প্রথম একাদশে প্রথম ডাক পান রকিবুল হাসান। আনন্দে উত্তেজনায় রাতে ঘুম হয় না রকিবুলের। কিন্তু সব স্বপ্ন মাটি হয়ে গেলো ম্যাচের আগের দিন। পাকিস্তান দলের সব খোলোয়াড়দের দেওয়া হয়েছে গ্রে নিকোলস ব্রান্ডের ব্যাট। ব্যাটের উপরে লাগানো আছে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নির্বাচনী প্রতীক ‘তলোয়ার’।
রকিবুলের মাথায় রক্ত উঠে গেলো। এইতো সেদিন নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুরো পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বাঙালির সরকার গঠনের অপেক্ষা। নাহ! ব্যাটে আইয়ুব খানের নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে মাঠে নামা যাবে না। কি করা যায়! রাতেই হোটেল পূর্বাণী থেকে বের হয়ে বন্ধু শেখ কামালের সাথে বৈঠক করলো রকিবুল।
২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল, ঢাকা স্টেডিয়াম। হাজার হাজার বাঙালি দর্শকে পূর্ণ গ্যালারি। পশ্চিম পাকিস্তানি আজমত রানাকে নিয়ে ওপেনিং করতে নামলো রকিবুল। একজন ফটোগ্রাফার প্রথম খেয়াল করলো রকিবুল তাঁর ব্যাটে তলোয়ারের বদলে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার লাগিয়ে খেলতে নামছে। মুহূর্তে স্টেডিয়াম জুড়ে সে খবর ছড়িয়ে পড়ল। স্টেডিয়াম জুড়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান উঠলো, “জয় বাংলা, জয় বাংলা।”
সাংবাদিকরা ছুটে এলেন ছবি তুলতে। জ্বলে উঠলো দেশি- বিদেশি ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। পরদিন বিশ্ব জুড়ে বড় বড় করে পত্রিকার হেডিং “পাকিস্তানের হয়ে জয় বাংলা স্টিকার নিয়ে মাঠে নেমে দুনিয়া চমকে দিলেন রকিবুল হাসান।” এইসব বীরত্ব গাঁথায় জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত হই। এই ঘটনার বিবরন অসংখ্যবার বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসানের সাক্ষাৎতকার ও বক্তব্যে উঠে এসেছে।
২. “প্লিজ স্যার, আমার আঙ্গুল তিনটা রাইখেন। দেশ স্বাধীন হলে আমি ওপেনিং নামবো, ক্যাপ্টেন হবো।” আবেগ ছুঁয়ে যাওয়া কথাগুলো বলেছিলেন শহীদ জুয়েল। পুরো নাম আবদুল হালিম চৌধুরী। পরাধীন বাংলার অন্যতম সেরা ওপেনার, ও উইকেটকিপার। ১৯৭১ সালে জাতীয় দলে ডাকও পেয়েছিলেন এই স্টাইলিস্ট ব্যাটসম্যান ও উইকেট কিপার। কিন্তু তার আগেই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এই ক্রিকেটার। শহীদ রুমি, বদি, আজাদ ও বিখ্যাত ক্রিকেটার জুয়েলসহ আরও অনেকে মিলে গঠিত ‘কে-ফোর্স’। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের আশেপাশে খানিকটা গোলাগুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে হবে, কে-ফোর্সের কাছে এরকম একটা বার্তা এলো মেজর খালেদ মোশাররফের কাছ থেকে। হোটেলের আশেপাশে নয়, তারা একেবারে হোটেলের ভেতরে গিয়ে গ্রেনেড বিস্ফোরণ করেই এসেছিল সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়েই। এঘটনায় বিস্মিত হয়ে খালেদ মোশাররফ বলেছিলেন, “হোটেলের আশেপাশে গোলাগুলি করতে বললাম, এরা হোটেলের ভিতরে গিয়ে গ্রেনেড ফাটিয়ে এলো! দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল!” সেই থেকে কে-ফোর্সের নাম হয়ে গেলো ‘ক্স্যাকপ্লাটুন’।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পায় এই ‘ক্স্যাকপ্লাটুন’। এক রাতে জায়গাটা রেকি করতে বের হলেন বদি, আজাদ, জুয়েল সহ মোট ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা। বাড্ডার পিরুলিয়া গ্রাম থেকে নৌকায় যাত্রা করার পর বেশ কিছুদূর গিয়ে সবাই দেখলেন, সামনে থেকে আরেকটা নৌকা আসছে। আর সেটা পাকিস্তানি আর্মিতে ভরা। একমাত্র বদি ছাড়া সবার স্টেনগান ছিল নৌকার পাটাতনের নিচে। কোন উপায় না থাকায় বদি ব্রাশফায়ার চালিয়ে দিলেন সামনের নৌকার দিকে। পাকিস্তানী হানাদাররাও গুলি ছোঁড়েছিল। অনেক হানাদার মারা পড়ল। নৌকা উল্টে গেল; কয়েকজন সাঁতরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরিস্থিতি ঠাÐা হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ জুয়েল অন্ধকার থেকে বলে উঠলেন, ‘ঐ আমার হাতে যেন কী হইছে।’ টর্চের আলোয় দেখা গেল, পাক হানাদারদের ছোঁড়া গুলি জুয়েলের হাতের আঙুল ভেদ করে চলে গেছে। সেই অবস্থাতেই তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ডাক্তার আজিজুর রহমানের চেম্বারে। যাওয়ার পথে আজাদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘জুয়েল, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে না?’ দাঁত বের করে জুয়েল বললেন, ‘নাহ, হেভি আরাম লাগতেছে। দেশের জন্য রক্ত দেওয়াও হইলো, আবার জানটাও বাঁচলো।’ ডাক্তার আজিজুর রহমান জুয়েলের হাতের অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেলেন! কোনমতেই রক্তপাত বন্ধ হচ্ছিলো না। ড্রেসিং করতে গিয়ে অবস্থা আরও বেগতিক। জুয়েল দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বলছিলেন, ‘প্লিজ স্যার, আমার আঙ্গুল তিনটা রাইখেন। দেশ স্বাধীন হলে আমি ওপেনিং নামবো, ক্যাপ্টেন হবো।’ এরপর আর অপারেশনে নামা হয়নি জুয়েলের। থাকতেন সহযোদ্ধা আজাদের বাড়িতে। সেখানেই একদিন হানাদার বাহিনী আক্রমণ চালায়। ক্যাম্পে উঠিয়ে নিয়ে যায় জুয়েলকে। অকথ্য নির্যাতনের মাধ্যমে সব তথ্য বের করতে চেয়েছিল পাকিস্তানীরা। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটের আদলে মাটি কামড়ে থাকা ব্যাট করার মতই করে শক্ত হয়েছিলেন জুয়েল। কোন তথ্য আদায় করা সম্ভব হয়নি তাঁর কাছ থেকে। পাক হানাদাররা শেষ পর্যন্ত হত্যা করেছিলো জুয়েলকে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক হতে পারতেন জুয়েল, অন্তত সেই স্বপ্নই তিনি দেখতেন। (তথ্য; রোর বাংলা অনলাইন) দেশ স্বাধীন হলে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য শহীদ জুয়েলকে ‘বীর বিক্রম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। দেশের ক্রিকেটও তাকে মনে রেখেছে, ‘হোম অব ক্রিকেট’ খ্যাত মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ‘জুয়েল স্ট্যান্ড’ তারই নামানুসারে করা হয়। আর ‘মোশতাক স্ট্যান্ড’ নামকরন করা হয় আজাদ বয়েজ ক্লাবের সেই মোশতাক এর নামে, যে ‘মোশতাক ভাই’-এর হাত ধরে আজাদ বয়েজ ক্লাবের শুরু। মোশতাক ভাইয়ের সঙ্গে জুয়েলের ছিল আপ্রাণ সম্পর্ক। কিন্তু ২৭ মার্চ জেলা ক্রীড়া পরিষদের মূল ভবনের সামনে সেই মোশতাক ভাইয়ের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত দেহটা খুঁজে পেলেন তখন আর নিজেকে থামাতে পারেননি জুয়েল। ক্রিকেট ব্যাট আর কিপিং গ্লাভস খুলে রেখে হাতে তুলে নিয়েছেন স্টেনগান। প্রতি বিজয় দিবসে তাদের স্মরণে সাবেক-বর্তমান ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় শহীদ জুয়েল-মোশতাক স্মৃতি প্রীতি ম্যাচ। উপরোক্ত দুইটি ঘটনা ছাড়াও এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সাথে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুটবল খেলে তহবিল সংগ্রহের যুদ্ধ করেছেন বাংলার দামাল ছেলেরা। ভারতের মাটিতে ১৬-১৭ টি প্রীতি ম্যাচ খেলে অর্জিত প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে তুলে দেন তাঁরা। বিশ্বব্যাপী জনমত আদায়ে তাঁরা রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা। অথচ দুঃখজনক হলেও আজ সত্যি যে, সেই মিরপুর স্টেডিয়ামে শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলায় পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে উল্লাস করার মাধ্যমে পাকিস্তানিদের সমর্থন করতে দেখা যায় এদেশীয় রাজাকারের অনুসারিদের। বীরের সন্তান ও উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের জন্যে যা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও কষ্টদায়ক। ক্রিকেট যদি নিছক একটা খেলাই হয়ে থাকে তাহলে, দ্বিপাক্ষিক সিরিজ অথবা আইসিসি’র কোন ইভেন্টে খেলতে আসা যেকোন দল আমাদের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মানটুকু পাবে। পাকিস্তান-ভারত হোক অথবা অন্য যেকোন দল হোক যথাযোগ্য আথিতেয়তা প্রদানে আমরা কার্পণ্য করিনা। যেহেতু পাকিস্তানিরা এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে এবং তাদের কৃতকর্মের জন্যে এখনো ক্ষমা প্রার্থনা করেনি, সেহেতু পাকিস্তানিদের সাথে আমাদের যেকোন সম্পর্কে রাজনৈতিক হিসেব নিকেশ কষতেই হবে। মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম এর ‘বঙ্গবাণী’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা এদেশে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও দূরীভূত হয়নি। আব্দুল হাকিম সেই যুগের দেশদ্রোহীদের দেশ থেকে চলে যেতে বলেছিলেন ‘নিজ দেশতেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।’ নিজ দেশের পরাজয়ে কিংবা অন্যদেশের জয়ে যারা উচ্ছ¡াসিত হয়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি যাদের শ্রদ্ধা নেই, তারা নিশ্চিত ভাবেই রাষ্ট্রের জন্যে হুমকি স্বরূপ। রাস্ট্রের উচিৎ তাদের খুঁজে বের করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা। নাহয় পরবর্তীতে এইটা ‘ছোঁয়াচে বা দেখাছে’ রোগে পরিনত হতে পারে। কেবল ভারত/ পাকিস্তান নয়, অন্য যেকোন দেশের পতাকা উড়ানোর ক্ষেত্রেও কঠিন আইন প্রয়োগ দরকার। ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই আমাদের দেশে দেখা যায় বাড়ির ছাঁদে, অলি-গলিতে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা সহ নানান দেশের পতাকায় সয়লাভ হয়ে যায়। অন্যদেশের জন্যে এতো আবেগ, এতো প্রেম আসে কোথা থেকে? কই নিজ দেশের খেলার সময় তো এমন আবেগ দেখা যায়না! এদেশীয় যারা পাকিস্তানি পতাকা উড়াচ্ছে, গ্যালারীতে বসে ‘ পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিচ্ছে তারা অবশ্যই দেশদ্রোহী। প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনকি এদেশের আলো-বাতাসে বড় হওয়া আটকে পড়া পাকিস্তানিরাও সেটা করতে পারেনা। আমাদের প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে, ক্রিকেট আমাদের জন্যে নিছক ব্যাট বলের খেলা নয়। ক্রিকেটের সাথে জুড়ে গেছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও দুই লক্ষ নারীর কঠিন আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে যার যেমন ইচ্ছে করার সুযোগ আমরা দিতে পারিনা। জয় বাংলা।
লেখক : কলামিস্ট, বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান