ক্ষুণ্ণ হবে ভোক্তা অধিকার ও স্বার্থ?

11

মনিরুল ইসলাম মুন্না

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মাধ্যমে এতদিন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণ হলেও জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম সরকার নির্ধারণ করে আসছিল। কিন্তু এবার বিইআরসি থেকে তাও তুলে নেয়া হলো। এতে ভোক্তার স্বার্থের ক্ষুণ্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল। ক্যাব বলছে- আগে জনমত জরিপ যাচাইয়ের মাধ্যমে দাম বাড়ানো-কমানো গেলেও এখন সেটা আর থাকবে না। ফলে সুশাসন ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে মানুষ। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার এমন উদ্যোগ নিয়েছে। বিইআরসি থেকে বাস্তবায়ন হয়ে আসতে একটি দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হলেও এখন থেকে তা আর হবে না।
জানা গেছে, এর আগে গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদের সভায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) (সংশোধন) আইন, ২০২২ অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বেসরকারিভাবে জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজি আমদানি করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্তে বলা হয়- বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বা সমন্বয় করতে পারবে। তবে আগের মতো শুনানিসহ মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির হাতেও থাকবে। বিদ্যমান আইনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বিইআরসি ৯০ দিন সময় নিয়ে নির্ধারণ করে। বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকারও যেন তা নির্ধারণ করতে পারে, এ জন্যই প্রস্তাবিত এ সংশোধনী মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদন করে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের মূল্য সমন্বয় করা প্রয়োজন। অর্থনীতির গতি চলমান রাখার সঙ্গে নিয়মিত ও দ্রুততম সময়ে মূল্য সমন্বয়ের লক্ষ্যে বিইআরসির পাশাপাশি সরকারেরও ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য আইনটি সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সরকার এ কথা বলেনি যে যুদ্ধ শেষ হলে এই ক্ষমতা রহিত করা হবে।
সূত্র জানায়, সরকারের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বিইআরসি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তারা গণশুনানির মাধ্যমে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করে আসছেন। এ ক্ষেত্রে বিক্রেতা, ভোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়। আইন সংশোধন হলে তার আর প্রয়োজন হবে না। তদুপরি এক মাস পরই যে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসছে, সেই অধিবেশনকে পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি করে মন্ত্রিপরিষদের সভায় আইন সংশোধনের প্রস্তাব নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দাম বাড়ানো ঠেকাতে না পারলেও এই গণশুনানির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি আদায় করা যেত। কার্যত এখন আর সেটি থাকল না। সরকার ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বিইআরসি আইনের সংশোধনীর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বিইআরসি আইন সংশোধন করে গণশুনানির পরিবর্তে সরকারের একা হাতে নেয়ার বিষয়টি এক তরফা হয়ে দাঁড়ালো। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে জ্বালানি খাতে সুশাসন ও ন্যায়বিচার ব্যাহত হবে।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আইনটি সংশোধন করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাই সমীচীন বলে মনে করি। বেসরকারি খাতে জ্বালানি আমদানির সুযোগ দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাও কতটা ভোক্তার স্বার্থে আর কতটা ব্যবসায়ীদের স্বার্থে, সেই প্রশ্নও আছে। এতদিন এককভাবে সরকারি পর্যায়ে তেল আমদানি হতো। এর ফলে সরকার কিছুটা হলেও ভোক্তার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকত। বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি হলে সেই জবাবদিহি আর থাকবে না। দামের ক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যা ইতোমধ্যে বাজারে নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তবে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে জ্বালানি তেলের দাম প্রতিদিন সমন্বয় করা হয়। এখানেও আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে এটি করা যেতে পারে। তবে গণশুনানি ছাড়া যদি করা হয় তাহলে ভোক্তার স্বার্থ ভূলুন্টিত হতে পারে। আর আইন সংশোধনের পূর্বে এ খাতের স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করে করা হলে অবশ্যই ভালো হতো।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম এন্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসলাম মিয়া পূর্বদেশকে বলেন, বিইআরসির আইনের সংশোধনীর ও নতুন ধারা যুক্ত হওয়ার কারণে বিইআরসির সিদ্ধান্ত ব্যতিরেখে সরকার ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে জ্বালানির ট্যারিফ নির্ধারণ, পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয় করতে পারবে। এর মাধ্যমে বিইআরসির নিজস্ব ক্ষমতাকে লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। তবে এই নতুন ধারা বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষের জ্বালানির নিরাপত্তাসহ ভোক্তা পর্যায়ে ন্যায্য ট্যারিফ নির্ধারণে সরকারকে নজর দিতে হবে।