কোরবানির পশুর হাট স্বাস্থ্যবিধির প্রশ্নে কঠোর হতে হবে

6

 

একদিকে মহামারি করোনার রৌদ্ররূপ, অন্যদিকে মুসলমানদের দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা দুয়ারে কড়া নাড়ছে। এ ঈদ আনন্দের প্রধান উৎস পশুজবাই। ’ত্যাগই আনন্দ’ প্রতীকী পশুজবাই-এর মাধ্যমে মানুষ পক্ষান্তরে নিজের অন্তরে বাসাবাঁধা পশুবৃত্ত দূর করার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ঈদুল আজহা উৎসব উদযাপন করে থাকে। সঙ্গতকারণে এ ঈদকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী পশুবাণিজ্যের হাটেই পরিণত হয়। কিন্তু মহামারি করোনার কারণে গত বছর উৎসবমুখর পশুর হাটের দেখা পায়নি দেশবাসী। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বরং গতবারের চেয়ে করোনার তাÐব এবার আরো কয়েকগুণ বেশি। সেই হিসাবে দেশে চলছে লকডাউন। এ পরিস্থিতিতে সরকার পশুর বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। জনসমাগম ঘটে এমন প্রকাশ্যে হাটের চেয়ে অনলাইন বেচাকেনায় উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে কোরবানি পশু ক্রেতাদের। এরপরও বেশকিছু হাট বসবে শর্ত সাপেক্ষে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনার আলোকে বলা যায়, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্ধারিত স্থানে কোরবানির পশুর হাট বসবে। এর বাইরে কোনো হাট বসতে দেওয়া হবে না। গত মাসে অনুষ্ঠিত কোরবানির পশুর হাট ব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট স্থানে পশু জবাই এবং বর্জ্য অপসারণের প্রস্তুতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় ভার্চুয়াল সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট থেকে সুরক্ষা পেতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে পশুর হাট বসানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন। এবার যেখানে-সেখানে হাট বসতে দেওয়া যাবে না; উপরন্তু কোরবানি দেওয়ার পরপরই দ্রæত বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের এ পদক্ষেপ প্রশংসনীয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এসব পদক্ষেপ কতটা বাস্তবায়িত হবে, এ ব্যাপারে সংশয় রয়েছে। গত বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সে সময় দেশব্যাপী করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সংক্রমণ এড়ানোর লক্ষ্যে কোরবানির পশু কেনাবেচায় অনলাইন প্রযুক্তি ব্যবহারের আহŸান জানানো হলেও তেমন সাড়া মেলেনি; বরং সশরীরে পশু কেনাবেচার আয়োজনেই মানুষের উৎসাহ ছিল বেশি। এ প্রেক্ষাপটে দেশবাসীকে সুরক্ষা প্রদানের বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। এটাও মনে রাখতে হবে, কোরবানির সঙ্গে মুসলমানদের ধর্মীয় বিধান পালনের বিষয় যেমন জড়িত, তেমনি ঈদুল আজহা সামনে রেখে যারা পশু পালন করে থাকেন, তাদের জীবিকার প্রশ্নও জড়িত।
এ বছর সারা দেশে করোনা সংক্রমণ কেবল অব্যাহতই থাকেনি, অধিক সংক্রমণশীল করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতিজনিত কারণে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। এ পরিস্থিতিতে সংক্রমণ এড়ানোর জন্য ক্রেতা-বিক্রেতা ও পশুর হাটগুলোর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনসহ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম-কানুন সংক্রান্ত বিধিনিষেধগুলো যাতে কেবল ‘কাগুজে ঘোষণায়’ পর্যবসিত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে কোরবানির পশু কেনাবেচা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম যতটা সম্ভব অনলাইনভিত্তিক করা উচিত। আশার কথা অনলাইন পশুর হাটকে উৎসাহিত করতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে সূত্রে জানা গেছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন উত্তর ওয়েবসাইট চালু করেছে। আমরা জেনেছি, চট্টগ্রাম শহরে নিয়মিত ৩টি হাট ছাড়া জেলা প্রশাসন থেকে সিটি কর্পোরেশনকে আর মাত্র ৩টি হাট অতিরিক্ত বসানোর অনুমতি দিয়েছে। ফলে সীমিত এ হাট নগরবাসীর জন্য যথেষ্ট নয় বিধায়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও ভার্চুয়াল বা অনলাইনে পশু বিক্রির উদ্যোগ নিতে পারে। এতে নগরবাসী উপকৃত হবে, সিটি কর্পোরেশনের ভাবমুর্তিও উজ্জ্বল হবে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল পশুর হাটই ভালো বিকল্প ব্যবস্থা, যেখানে অনলাইনে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কোরবানির উপযুক্ত পশুর স্থিরচিত্র বা ভিডিও দেখে পশুর দাম, বয়স, ওজন ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হয়ে কেনাবেচা সম্পন্ন করা যাবে। এক্ষেত্রে বর্তমানে অর্থ লেনদেনের যেসব ব্যবস্থা রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে সহজেই পশুর দাম পরিশোধ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে ক্রেতার ফরমায়েশ অনুসারে যথাস্থানে ক্রয়কৃত পশু পাঠিয়ে দেওয়াও কঠিন কিছু নয়। বস্তুত গত বছর থেকেই বেশকিছু উদ্যোক্তা অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এবার এর পরিসর আরও বেড়েছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। বস্তুত অনলাইনে কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয়ের হার যত বাড়বে, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তত কমবে। আমরা মনেকরি, অনলাইন বা বার্চুয়াল হোক আর সরাসরি হাটে বেচাকেনা হোক-মূল উদ্দেশ্য হতে হবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা। মাস্ক পরিধান করা আর সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা। আসন্ন ঈদের বাজারগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়-এমনটি উদ্যোগ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।