কোরবানির ঈদ ঘিরে তৎপর ছিনতাই চক্র

তুষার দেব

54

করোনাকালেও কোরবানির পশুর হাট ও ঈদযাত্রায় জনসমাগমের বিভিন্ন পয়েন্টকে টার্গেট করে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি কিংবা গামছা পার্টিসহ নানা নামে তৎপর ছিনতাই চক্রগুলো। প্রধানত দূরের বিভিন্ন জেলা থেকে বিক্রির জন্য পশু নিয়ে হাটে আসা বেপারী কিংবা বিক্রেতাদের দিকেই তাদের দৃষ্টি। কারণ, এসব বেপারীরা কয়েকদিন অবস্থান করেই বিভিন্ন বাজারে বিক্রির জন্য পশু নিয়ে যান। আর ততদিন বেপারীরা বাজারের আশেপাশে তাবু খাটিয়ে সেখানেই নিজেরা রান্না করে খাওয়া ও ঘুমানোর কাজটি সারেন। ছিনতাই চক্র সদস্যরা কোন এক ফাঁকে তাদের খাবারে চেতনানাশক মিশিয়ে দিয়ে অপেক্ষায় থাকে। বেপারীরা রান্না করা খাবার খেয়ে ঘুমের ঘোরে ঢলে পড়লেই সর্বস্ব হাতিয়ে নিয়ে কেটে পড়ে ছিনতাইকারীরা। এছাড়া, ঈদে বাড়িমুখো মানুষের সমাগমস্থলও তাদের নজরে রয়েছে।
এবার পশুর হাট জমে উঠার আগেই নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তিনটি ছোরা, ৫৮টি চেতনানাশক বড়ি, ৫টি ঝান্ডু বামের কৌটাসহ অজ্ঞান পার্টির ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। নগরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের অচেতন করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সাথে তারা জড়িত বলে পুলিশের দাবি। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, আবু তাহের রকি (৩০), মো. সিরাজ (৫৫), মো. মোজাম্মল হক রাসেল (২৮), কাজী নজরুল ইসলাম ওরফে ফয়সাল (৩০), মো. আজিজুল হক (৪৫), মো. রাশেদ ওরফে সোহেল (২৮)। তাদের মধ্যে আবু তাহের রকি, সিরাজ ও কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আগে থেকে মামলা আছে। কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বলেন, গত ২০ জুলাই সন্ধ্যায় সার্সন রোড মাউন্ট হাসপাতালের সামনে চালককে চা পান করিয়ে অজ্ঞান করে একটি সিএনজি অটোরিকশা লুট করা হয়। এ ঘটনার তদন্তে নেমে সোমবার নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অজ্ঞান পার্টির ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর গতকাল মঙ্গলবার নগরীর আকবরশাহ থানাধীন সাহের পাড়া সড়কে পৃথক অভিযান চালিয়ে র‌্যাব-৭ ছিনতাইকারী চক্রের ছয় সদস্যকে চারটি ছোরাসহ গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন, ভোলার দক্ষিণ ভাটামারার আবুল কাশেমের ছেলে জাকির হাসেন (৩২), রসূলপুরের জোরারগঞ্জ দিদারের ছেলে সুমন (১৯), নোয়াখালী হিজলতলীর মৃত আলম শাহর ছেলে দেলোয়ার হোসেন (১৯), নীলফামারীর নিতাই এলাকার নাছেরের ছেলে মো. হাসান আকাশ (১৯)। অপর দুই কিশোর নগরীর পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা।
নগর পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, নগরীতে এবার সাতটি পশুর হাটে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। এসব পশুর হাটসহ ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে নগরীতে ছিনতাইপ্রবণ ৯৪ টি পয়েন্টকে চিহ্নিত করে এসব এলাকায় পুলিশি টহল ও নজরদারি বাড়িয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের জন্য একশ’ পাঁচটি টিম গঠন করা হয়। ওই একশ’ ৫টি টিমে দায়িত্ব পালনের জন্য সিএমপির নিয়মিত পুলিশ ফোর্সের পাশাপাশি অতিরিক্ত এক হাজার নয়জন পুলিশ সদস্য অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে সহকারি কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন সাতজন, পরিদর্শক ৩৪ জন, উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) রয়েছেন একশ’ জন, কনস্টেবল ৪২ জন, স্পেশাল আর্মড ফোর্স (এপিবিএন) একশ’ ৮৫ জন, পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিএন্ডএম) বিভাগের একশ’ ৮৮ জন, নগর গোয়েন্দা বিভাগের ৩০ জন, থানা ও ফাঁড়ির একশ’ ২২ জন, বন্দর পুলিশ লাইন থেকে ৩৩ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। একইসঙ্গে স্ট্যান্ডবাই ডিউটিতে থাকছেন ৮ জন উপ-পরিদর্শক, স্পেশাল আর্মড ফোর্সের ৬০ সদস্য, পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক’শ সদস্য, ৪০ জন মহিলা পুলিশ এবং এপিবিএন’র ৬০ সদস্যসহ মোট দুইশ ৬৮ জন সদস্য। টিমের সদস্যরা নাগরিকদের চলাচলের পথে ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত স্পট, বিভিন্ন শপিং মল এবং বাণিজ্যিক এলাকাকে টার্গেট করে ডিউটি করছেন। নগর পুলিশের কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জনচলাচলে ১৫ দফা নির্দেশনাও দিয়েছেন।
পুলিশের সর্বশেষ তৈরি করা তালিকায় টাইগারপাস মোড়, জামালখান মোড়, খাস্তগীর স্কুলের সামনের অংশ, ডিসিহিল-বৌদ্ধমন্দির মোড়, গণি বেকারির পশ্চিম পাশ এলাকা, চট্টগ্রাম কলেজের পূর্ব গেট (প্যারেড কর্ণার) মাদারবাড়ি, বরিশাল কলোনির সামনে, নালাপাড়া মোড়, মাঝিরঘাট, চন্দনপুরা, বহদ্দারহাট মোড়, নজির আহমদ চৌধুরী রোড, লালখান বাজার মোড়, নন্দকানন কাটা পাহাড় এলাকা, বাদামতলী মোড়, বড়পুল, বারিক বিল্ডিং মোড়, মনছুরাবাদ ঈদগাঁ মোড়, টিএন্ডটি কলোনি মোড়, সার্সন রোড, বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়ক, কাজীর দেউরি, লাভলেন, মাস্টারপুল, সিরাজদ্দৌল্লাহ রোডের সাব-এরিয়া, খাতুনগঞ্জ পোস্ট অফিস গলি, বক্সিরহাট, আন্দরকিল্লা, নিউ মার্কেট মোড়, বটতলী রেলস্টশন, কদমতলী মোড়, চৌমুহনী, মহসিন কলেজ এলাকা, সিটি কলেজ মোড়, শুভপুর বাস স্টেশন, হাওয়াই হোটেল গলি মুখ, আগ্রাবাদ সোনালী ব্যাংক মোড়, বনানী কমপ্লেক্সের সামনে, ঢেবারগলি, উপহার সিনেমার সামনে, জিইসির মোড়, সিনেমা প্যালেস, আশরাফ আলী রোড, ফিশারিঘাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, আছদগঞ্জ, এমইএস কলেজ মোড়, প্রবর্তক মোড়, আসকার দীঘির পূর্বপাড়, রহমতগঞ্জ, চাক্তাই-রাজাখালী, আমবাগান, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, বলুয়ারদীঘির পশ্চিম পাড়, মিয়াখান নগর, ইকবাল রোড, পাহাড়তলী বাজার, পানির কল , পোর্ট কানেকটিং রোড, ফকিরহাট ৩ নম্বর জেটি গেট, সল্টগোলা রেলক্রসিং, কর্ণেল হাট, কাঠগড়, পতেঙ্গা সিবিচ , ফিরোজশাহ কলোনি রাস্তার মোড়, শেরশাহ শহীদ মিনার, রৌফাবাদ কলোনি, হামজারবাগ মোড়, মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে, গোল পাহাড়ের মোড়, ধনিয়ালাপাড়া, বাকলিয়া বগারবিল, ঝাউতলা, চাঁদনী সিনেমা হল , চান্দগাওঁ আবাসিক এলাকার মোড়, ট্যানারি মোড়, বড়–য়াপাড়া গলির মুখ, ওসমানিয়া গ্লাস ফ্যাক্টরি মোড়, এফআইডিসি রোড, কেডিএস ফ্যাক্টরি গেট, আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনে, আমিন জুটমিল ও বিবিরহাট মোড় এলাকার অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানগুলো সবচেয়ে ছিনতাইপ্রবণ স্পট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।