কোভিড সুনামী : প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ

12

মুশফিক হোসাইন

হে প্রভু আমাদের মার্জনা করুন। আমরা আপনার সৃষ্টির সেরা জীব। অথচ আজ আমরা বড্ড অসহায়। আমাদের শিশু কিশোর ও প্রবীণগণ কার্যত গৃহবন্দি। অন্যরা জীবন ও জীবিকার তাগিদে ঘরের বাহির হলে মুখে মাস্ক পরে যথেষ্ট সতর্কতার সাথে কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছেন। অজানা এক শঙ্কা আমাদের প্রতি মুহূর্ত তাড়া করছে। আমরা সামাজিক জীব হলেও এখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বিজ্ঞজনরা পরামর্শ দিচ্ছেন। এখন দু’হাত বাড়িয়ে কাউকে আলিঙ্গন করার সুযোগ নেই। বলা চলে সারা বিশ্ব আজ অজানা আতঙ্কে ভীত সন্ত্রস্ত। কেউ মারা গেলে তাকে শেষ বিদায়ও জানাতে পারছে নিকটজনেরা। এমনতরো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ঘরে থাকার জন্য দেশে দেশে ‘লক ডাউন’ চলছে। চঞ্চল মানুষ তবু মানতে চায় না লক ডাউন ও স্বাস্থ্যবিধির জাল। পারেও না! কিন্তু পরিণতি যে ভীষণ ভয়ঙ্কর।
এ ভূমন্ডলে প্রভু অক্সিজেনের প্রাচুর্যতা দিয়েছেন। তিনি এর বিনিময়ে শুধু চেয়েছেন আনুগত্য। এই অক্সিজেনের প্রভাবে বিশ্বের সকল জীব বেঁচে আছে। নিশ্চিন্তে ও নির্বিঘেœ বাঁচার জন্য আনুগত্য বা অনানুগত্যের প্রশ্ন তোলেন নি। সকলে সমানভাবে ভোগ করছে। অথচ আজ সামান্য অর্থাৎ ২ লিটার থেকে ২০ লিটার অক্সিজেনের অভাবে কোভিড আক্রান্তরা মরছেন কাতারে কাতারে। কী আশ্চর্য প্রভু! অক্সিজেন সৃষ্টিতে ন্যূনতমও কৃপণতা করেন নি। অহংকারী মানুষ কতো মারণাস্ত্র আবিষ্কার করেছে। তৈরি করছে যুদ্ধের সরঞ্জাম, জেট বিমান, বুলেট ট্রেনসহ নানান যন্ত্রপাতি। চাঁদে বসবাস করার জন্য জমি ক্রয়ের চিন্তাভাবনা চলছে। সেখানে উদ্ভিব জন্মাতে সক্ষম হয়েছে। সর্বশেষ মঙ্গল গ্রহে সীমিত পর্যায়ে অক্সিজেনও উৎপাদন করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু দুঃখ ও শ্লাঘার বিষয় কোভিড আক্রান্ত মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছে। বড্ড অভাব অক্সিজেনের। প্রভু সামান্যতম একটি ভাইরাসের কাছে এতো অসহায় করলে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে? ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই ভাইরাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে! বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানি তাকে প্রতিহত করার উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে সত্য, তাতে নিশ্চয়তা নেই শতভাগ। তারপও বিশ্বব্যাপি কোটি কোটি মানুষ সে ভ্যাকসিন দেয়ার জন্য উদগ্রীব। এই মুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের করাল গ্রাসে ব্রাজিল, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইটালি ভারতে মানুষ মরছে শয়ে শয়ে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর মৃতদের সৎকারের জন্য মাঠে ময়দানে পুড়িয়ে গণ সৎকার করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ের ভারতের অবস্থাও তদ্রুপ। সৎকার করার জন্য শ্মশানে দীর্ঘতম লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শেষমেষ উপায় না দেখে মাঠে ময়দানে গণসৎকারের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখন মৃতদেহ পোড়ানোর কাঠের অভাব। দিল্লী পৌরসভা তাদের আওতাধীন বৃক্ষ কেটে কাঠ সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন। তারপর বন্য পশু সৎকারের অপেক্ষায় থাকা লাশ নিয়ে টানাটানি করার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। এ দৃশ্য এর আগে অন্যান্য দেশে কমবেশি দেখা গেছে। গণ কবরে মৃত মানুষদের পুঁতে দেয়া হয়েছে। বড় দুর্ভাগ্যের কথা! অপমানের কথা। বাংলাদেশে একটি বহুল প্রচলিত গান আছে, ‘হায়রে মানুষ জীবন ফুরালে ঠুস’। সেই লোকগীতির কথা আজ বেশি বেশি মনে পড়ছে। প্রিয়জন হারানো মানুষের হৃদয় ভেঙে চুরমার। তারপরেও কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার স্থলে উপস্থিত থাকতে পারছে না। স্বেচ্ছাসেবিরা সৎকার কাজ সম্পন্ন করছেন। ভারতের আকাশে লাশ পোড়ানোর বিষন্ন ধোঁয়া আর বিশ্রি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।
হে প্রভু আমাদের কৃতকর্মের জন্য আমাদের ক্ষমা করুন। মানব সমাজ কী আসলেই তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত, বা দুঃখিত? আমার তো মনে হয় না! কঠোর লকডাউন ঘোষিত হওয়ার পর ব্যবসায়ীদের আবদারে মার্কেট ও শপিংমল খুলে দেয়া হলো। পঙ্গপালের মতো পাটুরিয়া, দৌলদিয়াসহ বিভিন্ন ফেরিঘাটে ঢাকাগামী মানুষের ভিড়। মার্কেটগুলোতে ও ঈদ কেনাকাটার জন্য ভিড়। ঠুনকো যুক্তি টুথপিক, ম্যাচিং কানের দুল কিংবা শিশুরা মানছে না। আমাদের শিশুদের ঈদে জামা কাপড় কিনতে হবে, এমনভাবে মাইন্ড সেট করে দিলে মানবে কেন? হায়রে মধ্য ও উচ্চবিত্ত। কোভিড এর ছোবলে দেশে কয়েক কোটি নিম্নবিত্তরা কর্মহীন অথবা আয় রোজগার কমে গেছে। তারা ঈদে নতুন জামা কাপড় কী পাবে? অনেকের হয়ত দু’বেলা ভাতও জোটেনা। ছিন্নমূলদের অবস্থা তো আরও করুন। এমনতর পরিস্থিতি কী প্রয়োজন ঈদ শপিং এর। মাথায় আসে না। হে প্রভু অভাগা বাঙালিদের সুবুদ্ধি দান করুণ। কবি গুরু হয়তো তা ভেবে লিখেছিলেন “সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালি করে Ñ মানুষ করনি” এই হুজুগে বাঙালি প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে কোভিডের ভয়াবহতার স্ট্যাটাস দিলেও নিজে স্বাস্থ্যবিধি মানে না। গলির মুখে দেখা মিলছে আড্ডাবাজদের।
গোটা বিশ্বে প্রায় ২০ কেটি মানুষ কোভিড আক্রান্ত। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। এ যাবত প্রবীণদের সংখ্যা বেশি। কোভিডের ঢেউ যেন থামার নয়। প্রথম, দ্বিতীয় ঢেউ। শোনা যাচ্ছে তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে। তবে কী মানবজাতিকে কোভিডের সাথে সহঅবস্থানে থেকে বসবাস করতে হবে? এর উত্তর জানা নেই। অনাগতকাল জানাবে। ভারতে এখন কোভিড এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের সুনামী চলছে। সর্বশেষ ৬ মে’র তথ্যা থেকে জোনা যায় শুধু ভারত নয় সারা বিশ্বের রেকর্ড একদিনে চার লাখের অধিক আক্রান্ত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন এ রেকর্ড ভাঙ্গছেই। মৃতের সংখ্যা চার হাজারের উপর। কবে থাকমে এ সুনামী জানি না। শুধু কোভিডে যে মারা যাচ্ছে তা নয়। আইসিইউতে আগুন লেগে দেশে দেশে শতাধিক মানুষ মারা যাওয়ার সংবাদও আছে। সর্বশেষ ভারতের গুজরাটে ২৪জন।
কোভিডে আক্রান্তদের জন্য যেমন অক্সিজেন ও ঔষধ স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। তেমনি ভাবে লাশ সৎকার ও দাহ সমস্যা হচ্ছে। গোটা বিশ্বের চিত্র প্রায় একই ধরনের। ভারতের এ অবস্থা আরও করুণ ও ভয়াবহ। সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায় যে, এমনতর পরিস্থিতিতে লাশ বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। আবার গণকবর দেয়া হচ্ছে। কোভিড সুনামীর তান্ডবে ভারত আজ নাকাল। ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গণহারে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার। তাদের নিজেদের টিকার ঘাটতি দেখা দেয়ায় বাংলাদেশ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর রপ্তানি করতে পারছে না। বরঞ্চ রাশিয়া থেকে স্পুটুনিক ভি টিকা আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টিকা নিয়েও চলছে বিশ্ব রাজনীতি দাবা। এদিকে এন্টেজেনিকার প্রধান কর্মাধ্যক্ষ এই লন্ডভন্ড পরিস্থিতিতে নিজের দেশ লন্ডনে পাড়ি দিয়েছে। এত বিষয় অবতারণার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের ঢিলেঢালা লকডাউন দেখে শঙ্কা জাগছে ঈদের পরে কী আমরা সুনামী আক্রান্ত হব? এক বছর দেশ গ্রামে/বাড়িতে ঈদ না করলে মহা ভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? সরকার ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। তবে পণ্যবাহী ট্রাক, ড্রাইভার ও শ্রমিক অবাধে বাংলাদেশে আসছে। গণমাধ্যম থেকে জানা যায় যে, সীমান্ত বন্দরে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না যে যার মত চলছে। ভারতীয় ড্রাইভার ও শ্রমিকদের সংস্পর্শে আসছে এদেশীয় শ্রমিক কর্মচারী। ওরা হোটেলে বাস করছে, খাওয়া দাওয়া করছে, আড্ডা দিয়ে তাস খেলছে। কীভাবে রুধিবে তুমি ভারতীয় প্রজাতির কীটটেরে?
এখানে স্মৃতিচারণ করতে চাই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা চিরশত্রæ ভারতীয় বর্ডার সিল করে দেওয়ার পরও লক্ষ লক্ষ বাঙালি শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করে রাতের অন্ধকারে। তেমনি অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা গোলা বারুদসহ ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাই বলছি সীমান্ত সীল করে দিলেও চোরাকারবারী ও ফেনসিডিল ব্যবসায়ীরা রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে প্রবেশ করবেই। প্রবাদে আছে চোর না শুণে ধর্মের কাহিনী। বাস্তব অর্থে ভারত বাংলাদেশের পুরো সীমান্তে কাঁটা তার না দিলে সীমান্ত সীল করা সম্ভব নয়।
ভারতের নির্বাচন ও কুম্ভমেলার জমায়েতের কারণে কোভিড সুনামীর শুরু। বাংলাদেশের মানুষ ঈদ যাত্রার জন্য আবার জমা হবে বাসে, ট্রাকে, ফেরিঘাটে, শপিং মলে এবং পর্যটন স্পটে। কোন শক্তিই এদের রুখতে পারবে না। আলামত দেখে তাই মনে হচ্ছে। এদের অধিকাংশের ধারণা মৃত্যুর হাত আল্লাহ্র কাছে। নির্দেশ এলে চলে যেতে হবে। কিন্তু হাদিসে বলা হচ্ছে, তোমরা মহামারি এলাকায় প্রবেশ করবে নাÑ দূরে থাক। আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস আছে, ভালো কথা। কিন্তু তার রসূলের নির্দেশ মানতে হবে। নিজ হাতে বিষ পান করা মহান আল্লাহ্্ সমর্থন করেন না। ভারতীয় ভেবিয়েন্টের সুনামীর কথা ভেবে আমি শিউরে উঠছি। অতএব সাবধান বাংলাদেশি ভাই বোনেরা; সতর্ক হোন। ঈদ আনন্দে গা-ভাসিয়ে দেবেন না, ইতোমধ্যেই আমরা বহু নিকট আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব প্রতিবেশিদের হারিয়েছি। আর হারাতে চাই না, যারা হারিয়েছেন, তারা জানেন স্বজন হারানোর বেদনা কী, সমাজে পরিবারের কী ক্ষতি হলো। যদি আমরা সতর্ক না তবে জুনের প্রথম সপ্তাহে ঈদ পরবর্তীতে ভারতীয় সুনামী বাংলাদেশে বয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সতর্কতার কোন মার নেই। সচেতন সকলের কাছে তাই মিনতিপূর্বক আবেদন, আপনার পাড়া মহল্লার অসচেতনদের সতর্ক হওয়ার জন্য উদ্যোগ নিন। প্রতিটি জীবনের মূল্য আছে। চাই সে ধনী কিম্বা গরিব। আসুন ঈদ আনন্দের উদ্যামতা থেকে নিজেকে, পরিবারকে সর্বোপরি দেশবাসীকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হই। সময় থাকতে সাবধান হোন। গণমাধ্যমে আমরা আক্রান্ত ও মৃতের যে সংখ্যা দেখি, বাস্তবে কিন্তু তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। সকলেই সংবাদে আসছে না। মহান আল্লাহ্ দয়ার উপর অবশ্যই ভরসা রাখবেনÑ তবে নিকেজেও সতর্ক হতে হবে। সকলে সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

লেখক: কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব.)