কোন পথে যাচ্ছে নগর বিএনপি’র রাজনীতি?

34

নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে চট্টগ্রামে বিভাগীয় মহাসমাবেশ করার কথা ছিল বিএনপির। ৬টি বিভাগীয় শহরের মধ্যে প্রথম সমাবেশটি চট্টগ্রামে হওয়ার কথা থাকলেও শেষ সমাবেশ হিসাবেও সেটা করা সম্ভব হয়নি। স্থান ও দিনক্ষণ ঠিক করার পরও তিনবার পরিবর্তন করা হয় মহাসমাবেশের তারিখ। পুনরায় সমাবেশের প্রস্তুতি নেয়ার আগে নগর বিএনপির আহব্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন কারাগারে গেছেন, মামলায় আসামি হয়ে আত্মগোপনে সিনিয়র নেতারাও। এখন সমাবেশ করা তো দূরের কথা, নগর বিএনপির রাজনীতি কোন পথে যাচ্ছে সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির কার্যক্রমের দিক থেকে চট্টগ্রামে দলটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। চট্টগ্রামে প্রায় প্রতিটি কর্মসূচি পালন করেছে তারা। নানা প্রতিবন্ধকতার পরও সক্রিয় থাকা নগর বিএনপির মধ্যে হঠাৎ করেই যেন বড় আঘাত এসেছে। নগর কমিটির আহবায়ক গ্রেপ্তার হওয়া এবং অঙ্গ-সংগঠন ও সিনিয়র নেতারা মামলার আসামি হওয়ায় অদৃশ্য চাপে পড়েছে দলটি। এর আগেও ডা. শাহাদাত গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তখন নগর বিএনপি সক্রিয়তা না হারালেও এবার শাহাদাতের শূন্যতা অনুভব করছে দলটি। তাছাড়া নিজ দলের নেত্রীর করা চাঁদাবাজি মামলার কারণে বিরক্ত দলের নেতারাও।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক এমএ আজিজ বলেন, শাহাদাত হোসেনকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জেলে নেয়া হয়েছে। নগর বিএনপির ৪৩ সদস্যের আহবায়ক কমিটির প্রতিটি সদস্য দক্ষ। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে এ পর্যন্ত এসেছে। ডা. শাহাদাতকে গ্রেপ্তার, মাহবুবের রহমান শামীম, আবুল হাসেম বক্কর, আবু সুফিয়ানদের মামলার আসামি করে বিএনপির আন্দোলন বন্ধ করতে পারবে না। কমিটির শেষ সদস্য থাকা পর্যন্ত বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনের পর ভোট কারচুপির অভিযোগে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে ৬টি বিভাগীয় শহরে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছিল বিএনপি। এসব মহাসমাবেশের প্রথমটি হওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রামে। ১৩ জানুয়ারি মহাসমাবেশ করার জন্য প্রশাসনের অনুমতিও পেয়েছিল নগর বিএনপি। একই দিনে অন্য কর্মসূচি থাকায় পেছানো হয় মহাসমাবেশের দিনক্ষণ। পরবর্তিতে ২০ মার্চ মহাসমাবেশের তারিখ ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানেও স্থির থাকতে পারেনি দলটি। পুনরায় ২০ মার্চের কর্মসূচি স্থগিত করে সেটা ২৭ মার্চ করার কথা জানানো হয়। এরপর করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিএনপির সকল কর্মসূচি স্থগিত করায় মহাসমাবেশও স্থগিত হয়ে যায়।
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে সরকারের দমন-পীড়ন আর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি। সেই কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে গত সোমবার চট্টগ্রাম নগরের দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ চলাকালে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায় দলটি। এসময় কয়েকজন নেতা-কর্মীকে আটক করে পুলিশ। পরে নগরীর ট্রিটমেন্ট হাসপাতাল থেকে নগর বিএনপির আহবায়ক ডা. শাহাদাত হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সংঘর্ষের ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় দু’টি মামলা দায়ের হয়েছে। তার আগে একইদিন চকবাজার থানায় বিএনপি নেত্রী লুসি খান বাদি হয়ে শাহাদাতের বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করে। এসব মামলায় ডা. শাহাদাত হোসেনসহ গ্রেপ্তার হওয়া ১৭ বিএনপি নেতা-কর্মীকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। তাছাড়া মামলায় আসামি করা হয়েছে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, নগর বিএনপির আহবায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন, সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক আবু সুফিয়ান, যুগ্ম আহবায়ক এসএম সাইফুল আলম, নাজিমুর রহমান, ইয়াছিন চৌধুরী লিটন, নগর যুবদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন দিপ্তি, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এইচএম রাশেদ খান, সাধারণ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন বুলু, মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি, ছাত্রদলের আহবায়ক সাইফুল আলম, সদস্য সচিব শরিফুল ইসলাম তুহিনসহ বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের। মামলায় আসামি হয়ে সিনিয়র নেতারা ইতোমধ্যে আত্মগোপনে গেছেন।
নগর বিএনপির সদস্য নিয়াজ মোহাম্মদ খান বলেন, বিএনপি ব্যক্তি কেন্দ্রিক দল নয়। কে আছে, কে নেই সেটা বিষয় নয়, দলের সিদ্ধান্ত বড় বিষয়। কেন্দ্রীয়ভাবে যে সিদ্ধান্ত আসবে সেটা বাস্তবায়ন হবে। যারা জেলে গেছেন, মামলার আসামি হয়েছেন তারা ছাড়া বাকি সদস্যদের মধ্যে সিনিয়রিটি অনুসারে নেতৃত্ব দেবেন- এটা পরিষ্কার। আহবায়ক কমিটির একজন সদস্যও অবশিষ্ট থাকলে তার নেতৃত্বে দল এগিয়ে যাবে।
গতবছর করোনার প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর থেকে নগরজুড়ে ত্রাণ ও বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে চষে বেড়িয়েছিলেন নগর বিএনপির আহবায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা থাকায় প্রায় প্রতিটি নেতা সহায়তা নিয়ে গেছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। এবার করোনার প্রকোপ বাড়া শুরু হলেও বিএনপির তেমন কোনো তৎপরতা নেই। ডা. শাহাদাতসহ ১৭ নেতা-কর্মী কারাগারে যাওয়ার পর নগর বিএনপির শীর্ষ নেতারাও অনেকটাই আত্মগোপনে।
গত বৃহস্পতিবার উত্তর ও দক্ষিণ জেলার নেতাদের নিয়ে নগর বিএনপির সংবাদ সম্মেলন করা হলেও সেখান থেকেও কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। অবশ্য বুধবার রাতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে বিএনপি। রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থগিত থাকলেও সামাজিক গণমাধ্যম ও অনলাইনে নেতা-কর্মীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে জানিয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলটি জানায়, সরকারের উদাসীনতার কারণে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়েছে। জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিধানে দ্রুত কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিতে আহবান জানিয়েছে দলটি।