কোনটি আপনার জন্য সঠিক?

111

ক্রেডিট কার্ড বেটার নাকি ডেবিট কার্ড? ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা বেশি নাকি ডেবিট কার্ডের সুবিধা বেশি? কোনটা পারফেক্ট হবে আমার জন্য? এগুলো এখনকার প্রযুক্তি র্নিভর দুনিয়ার সবথেকে বেশি শোনা প্রশ্নগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখন ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমের সবথেকে জনপ্রিয় পেমেন্ট মেথড হচ্ছে কার্ড পেমেন্ট। এর কারণ হচ্ছে ক্রেডিট কার্ড এবং ডেবিট কার্ডগুলোর সহজলভ্যতা, কনভেনিয়েন্স এবং ওয়ার্ল্ডওয়াইড অ্যাকসেপ্টেন্স।
তাছাড়া অনলাইন পেমেন্ট তো ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু অনলাইন বা অফলাইন যেকোনো জায়গায় কার্ড পেমেন্টের ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড ব্যাবহার করা উচিৎ নাকি ডেবিট কার্ড? আপনার জন্য কোন ধরনের কার্ড পারফেক্ট হবে? আজকে এই বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করা যাক। আপনি যদি নিজের জন্য একটি পেমেন্ট কার্ড নেওয়ার চিন্তাভাবনা করে থাকেন, তাহলে আপনার জন্যই আজকের আর্টিকেলটি। প্রথমে জানা যাক,
ক্রেডিট কার্ড কি?
সহজ কথায় বলতে হলে, ক্রেডিট কার্ড হচ্ছে এমন একটি মেথড যার সাহায্যে আপনি একটি ব্যাংক থেকে টাকা ধার করেন খরচ করার জন্য। এই ধার করা টাকার অ্যামাউন্টটিকেই মুলত ক্রেডিট কার্ডের “ক্রেডিট লিমিট” বলা হয়ে থাকে। আপনার মাসিক ইনকাম এর ওপরে বেজ করে আপনাকে ব্যাংক এই লিমিটটি দিয়ে থাকে।
যেমন- আপনার মাসিক ইনকাম যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, তাহলে আপনি সাধারনত ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লিমিটের একটি ক্রেডিট কার্ড পেতে পারেন। তবে ক্রেডিট লিমিট কম-বেশি হতে পারে আপনি যে ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড নিচ্ছেন সেই ব্যাংকের পলিসি অনুযায়ী। তবে আপনি ক্রেডিট কার্ডের জন্য এলিজিবল হবেন কি না সেটাই একটা বড় প্রশ্ন। কারন, সাধারনত আপনি যদি একজন মোটামুটি ভালো ইনকাম করা চাকুরিজীবী না হন, তাহলে ব্যাংক আপনাকে ক্রেডিট কার্ডের জন্য এলিজিবল করবে না। কারণ ক্রেডিট লিমিটটি আপনি প্রতি মাসে যেমন স্যালারি পান, তার ওপরে ভিত্তি করেই দেওয়া হয়ে থাকে।
ক্রেডিট কার্ড
ক্রেডিট কার্ডটি পাওয়ার পরে সেটা আপনি যেকোনো জায়গায় পেমেন্ট করার জন্য ব্যাবহার করতে পারেন যেখানে পেমেন্ট মেথড হিসেবে ক্রেডিট কার্ড অ্যাকসেপ্ট করা হয়। আপনি ক্রেডিট কার্ড ব্যাবহার করে সারা মাসে যত জায়গায় যত অ্যামাউন্টের (অবশ্যই লিমিটের মধ্যে) পেমেন্ট করবেন, মাস শেষে আপনার সেই সব অ্যামাউন্ট ব্যাংক থেকে একটি বিল হিসেবে ইস্যু করা হবে। তারপরে একটি নির্দিষ্ট টাইমের মধ্যে আপনাকে সেই বিলটি ব্যাংককে পরিশোধ করতে হবে। এই টাইম লিমিট বিভিন্ন ব্যাংকের পলিসি অনুযায়ী বিভিন্নরকম হতে পারে, তবে সাধারন ১০-১৫ দিন হয়ে থাকে। আর এই মাসিক বিল পরিশোধ করলেই আপনাকে আবার পরের মাসের ক্রেডিট লিমিট দেওয়া হবে। যেমন- আপনার ক্রেডিট লিমিট যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, আর আপনি যদি ৩৫ হাজার টাকা খরচ করেন, তাহলে বিল ইস্যু হওয়ার নির্দিষ্ট টাইমের মধ্যে সেই ৩৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলেই আবার পরবর্তী মাসের জন্য আরও ৫০ হাজার টাকা ক্রেডিট লিমিট পেয়ে যাবেন।
ক্রেডিট কার্ড সাধারণত অনলাইন এবং অফলাইন দুই জায়গাতেই কাজ করে। তবে আপনি যদি আপনার ক্রেডিট লিমিটটি বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে ব্যাবহার করতে চান অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশন করতে চান, তখন আপনার অবশ্যই একটি ইন্টারন্যাশনাল পাসপোর্টের দরকার হবে। পাসপোর্ট না থাকলে আপনার যত লক্ষ লক্ষ টাকাই ক্রেডিট লিমিট থাকুক না কেন, আপনি বাংলাদেশের বাইরে কোনরকম পেমেন্ট বা লেনদেন করতে পারবেন না ক্রেডিট কার্ডের সাহায্যে।
আপনার পাসপোর্ট থাকলে আপনি আপনার ক্রেডিট কার্ডটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশনের জন্য এনাবল করে নিতে পারবেন এবং আপনার ক্রেডিট লিমিটের নির্দিষ্ট একটি অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় কনভার্ট করে নিতে পারবেন, যাতে আপনি বাংলাদেশের বাইরে গেলে বৈদেশিক কারেন্সিতে পেমেন্ট করতে পারেন। তাছাড়া অনলাইনেও ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশনগুলো করতে পারবেন। যেমন- গুগল প্লে স্টোর থেকে কোন অ্যাপ/গেমস পারচেজ করা, কিংবা ফরেইন ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে প্রোডাক্ট পারচেজ করা, কিংবা ফেসবুক বুস্ট বা গুগল অ্যাডসে খরচ করা ইত্যাদি।
এবার জানা যাক,
ডেবিট কার্ড কি?
আমরা যখন একটা বাংক অ্যাকাউন্ট করি এবং বাংক অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা খরচ করার জন্য আমাদেরকে যে অঞগ কার্ড দেওয়া হয়, সেটাই মুলত একটি ডেবিট কার্ড যা অনেক ক্ষেত্রে “ব্যাংক কার্ড” নামেও পরিচিত। ডেবিট কার্ড থেকে টাকা খরচ করার জন্য আপনার কাছে বা আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আগে থেকেই টাকা থাকতে হবে। এখানে আপনার মাসিক ইনকাম বা জব বা আপনার ক্রেডিট লিমিট এই ধরনের কোন ব্যাপার নেই। ব্যাপারটা শুধুই এইটুকুই যে, আপনার কাছে টাকা আছে এবং সেই টাকা আপনি ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে পেমেন্ট করছেন বা খরচ করছেন।
ধরুন আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ লক্ষ টাকা আছে। তাহলে ব্যাংক থেকে আপনার অ্যাকাউন্টের বিপরীতে আপনাকে যে ডেবিট কার্ডটি দেওয়া হবে, সেটিতেও আপনার ওই ১ লক্ষ টাকাই থাকবে। আপনি যখনই ডেবিট কার্ডটির সাহায্যে কোথাও পেমেন্ট করবেন বা ক্যাশ উইথড্র করবেন, তখন আপনি যতটুকু টাকা খরচ করেছেন সেটা ইনস্ট্যান্টলি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকেই কেটে নেওয়া হবে। মুলত পেমেন্টটি করা হবে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকেই। ডেবিট কার্ড পকেটে রাখা মানে বলতে পারেন আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টটিকেই তার সম্পূর্ণ ব্যালেন্সসহ আপনার পকেটে রাখা। আর এইজন্যই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ক্রিয়েট করলে সাধারনত অ্যাকাউন্টের সাথেই একটি ডেবিট কার্ড ইস্যু করে দেওয়া হয়।
ডেবিট কার্ড সাধারণত ইন্টারন্যাশনালি কাজ করে না, তবে অনেকক্ষেত্রে ব্যাংক আপনাকে বিশেষ কিছু শর্ত এবং কার্যক্রমের মাধ্যমে আপনার ডেবিট কার্ডটি বাংলাদেশের বাইরে ব্যাবহার করার সুযোগ দিতে পারে। তবে সেটা সম্পূর্ণ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ওপরেই নির্ভর করে। তবে ডেবিট কার্ড যদি আপনাকে ইন্টারন্যাশনালি ব্যাবহার করার সুযোগও দেওয়া হয়, তবুও আপনার অবশ্যই একটি ইন্টারন্যাশনাল পাসপোর্টের প্রয়োজন পড়বে। তবে ডেবিট কার্ডগুলো সাধারনত বাংলাদেশের ভেতরে কোন স্টোরে পেমেন্ট করা বা কোন অঞগ থেকে ক্যাশ উইথড্র করা কিংবা অনলাইনে পেমেন্ট করার কাজেই ব্যাবহার করা হয়ে থাকে।
প্রিপেইড ডেবিট কার্ড
বর্তমানে বাংলাদেশের কয়েকটি ব্যাংক একটি বিশেষ ধরনের ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড ইস্যু করে থাকে যাকে সাধারনত প্রিপেইড কার্ড বলা হয়। এই ডেবিট কার্ডগুলো ব্যাবহার করার জন্য আপনার কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্টও থাকার দরকার পড়বে না এবং আপনাকে চাকরিজীবীও হতে হবে না। এই কার্ডগুলোতে আপনাকে আগে থেকেই কার্ডের বিপরীতে টাকা ডিপোজিট করতে হবে এবং ডিপোজিট করার পরেই এই কার্ডটি আপনি ব্যাবহার করতে পারবেন। অনেকটা আপনার ফোনে টাকা রিচার্জ করে তারপর টাকা খরচ করার মতো।
আর আপনার যদি ইন্টারন্যাশনাল পাসপোর্ট থাকে, তাহলে আপনি ফরেইন কারেন্সি (টঝউ, ঊটজ,এইচ) ডিপোজিট করতে পারবেন এবং তার সাহায্যে ছোট ছোট ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশনগুলো করে ফেলতে পারবেন। তাছাড়া অনলাইনেও ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশনগুলো করতে পারবেন। যেমন- গুগল প্লে স্টোর থেকে কোন অ্যাপ/গেমস পারচেজ করা, কিংবা ফরেইন ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে প্রোডাক্ট পারচেজ করা, কিংবা ফেসবুক বুস্ট বা গুগল অ্যাডসে খরচ করা ইত্যাদি। তবে এই সব ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশনের জন্যই আপনার পাসপোর্ট থাকার দরকার হবে। আপনি ডিপোজিট করবেন, তারপর সেটা খরচ করবেন, তারপর আবার ডিপোজিট করবেন, আবার খরচ করবেন। এভাবেই মুলত কাজ করে প্রিপেইড কার্ডগুলো। বাংলাদেশে প্রিপেইড ডেবিট কার্ড হিসেবে ইস্টার্ন ব্যাংকের ঊইখ অয়ঁধ চৎবঢ়ধরফ ঈধৎফ বেশ জনপ্রিয়।

আশা করি এতক্ষনে কিছুটা হলেও ধারনা পেয়েছেন যে, ক্রেডিট কার্ড এবং ডেবিট কার্ড কিভাবে কাজ করে এবং এই দুটির মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো কি কি। বাংলাদেশের প্রায় সব ব্যাংকই বর্তমানে ক্রেডিট এবং ডেবিট কার্ড প্রোভাইড করে। এখন মুল প্রশ্নটি হচ্ছে, আপনার জন্য কোনটি পারফেক্ট? আপনি কোনটি ব্যাবহার করবেন।
এর উত্তর নির্ভর করে আপনি কি করেন এবং আপনি এই কার্ডগুলো মুলত কি উদ্দেশ্যে ব্যাবহার করবেন। আপনি যদি একজন পারমানেন্ট ডিসেন্ট স্যালারির জব-হোল্ডার হয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই আপনার জন্য একটি ক্রেডিট কার্ড পারফেক্ট। তাছাড়া সত্যি কথা বলতে কার্ড পেমেন্টের ক্ষেত্রে এবং ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে সবথেকে ভালো এবং সবথেকে রিলায়েবল পেমেন্ট মেথড হচ্ছে ক্রেডিট কার্ড।
তাই যদি আপনি জব-হোল্ডার হয়ে থাকেন এবং আপনার পাসপোর্ট থাকে এবং আপনি ফ্রিকুয়েন্টলি ফরেইন ট্রাঞ্জেকশন করে থাকেন, অবশ্যই ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার চেষ্টা করুন। কারন অনলাইনে অনেক জায়গায় ডেবিট কার্ড পেমেন্ট সাপোর্ট না করলেও ক্রেডিট কার্ড অবশ্যই সাপোর্ট করে। তাছাড়া ডেবিট কার্ডের সাহায্যে ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট করতে চাইলে অনেকসময় অনেকরকম সমস্যা এবং লিমিটেশনের কারনে পেমেন্ট প্রোসেস হয় না। তবে ক্রেডিট কার্ডে আপনাকে এই ধরনের সমস্যায় খুব কম পড়তে হবে বা পড়তে হবেনা বললেই চলে।
আর আপনার যদি তেমন কিছু দরকার না হয় এবং আপনি শুধুমাত্র বাংলাদেশের ভেতরেই লোকাল পেমেন্ট বা বাংলাদেশের ভেতরেই অনলাইনে ট্রাঞ্জেকশন করতে চান, তাহলে আপনার জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অ্যাকাউন্টের সাথে লিংক করা ব্যাংক কার্ড বা অঞগ কার্ড তো থাকছেই। এটার জন্য কোনরকম ঝামেলা করতে হবে না আপনাকে। এটা আপনি চাইলেই পাবেন।
আর আপনি যদি জব হোল্ডার না হয়ে থাকেন তবে আপনার মাঝে মাঝে ছোটখাটো অনলাইন ট্রাঞ্জেকশন এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঞ্জেকশন করার দরকার পড়ে, যেমন যদি ফেসবুক অ্যাডস বা গুগল অ্যাডস ইত্যাদিতে পেমেন্ট করতে চান বা আলিএক্সপ্রেস থেকে প্রোডাক্টস কিনতে চান, কিংবা কোন অ্যাপ কিনতে চান, এসব ছোটখাটো ট্রাঞ্জেকশনের জন্য একটি ইন্টারন্যাশনাল প্রিপেইড ডেবিট কার্ড নিয়ে নিতে পারেন। আর আপনি যদি জব হোল্ডারও হন, তবে ক্রেডিট লিমিট নেওয়া, বিল পরিশোধ করা ইত্যাদি নিয়ে ব্যাংকের সাথে দায়বদ্ধ থাকতে না চান, তাহলও আপনি প্রিপেইড কার্ড ব্যাবহার করতে পারেন।