কোতোয়ালী থানায় পরিবর্তনের হাওয়া

62

চট্টগ্রামের শহরাঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে কোতোয়ালী থানাসংলগ্ন এলাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম শাখা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, শাহ্সুন্দর মাজার, শাহ্ জালালের চিল্লা শরীফ, চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং বারদের চেম্বার, চট্টগ্রাম জেলা বোর্ড অর্থাৎ প্রয়োজনীয় দপ্তর ও স্থাপনা কোতোয়ালী থানা আশেপাশে। কেউ কেউ বলেন এটাই চট্টগ্রাম অঞ্চলের নাভি। তারপরও ইতিপূর্বে এ জনপদ অনেকটা অবহেলিত ছিলো। অনেকটা মফস্বল পর্যায়ের। সাম্প্রতিকালে এ জনপদে যথেষ্ট উন্নয়নের হাত লেগেছে। রাস্তা-ঘাট প্রশস্ত হচ্ছে। আইল্যান্ডে সবুজ শ্যামলিমা। এখানে বসন্তে কোকিলের মধুর সুর স্লাত হয়। ফুটপাতগুলো মেরামত হয়েছে। বসবার দৃষ্টিনন্দন ব্যবস্থা করা হয়েছে রুচিসম্মতভাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ।
সাম্প্রতিক সময়ে কোতোয়ালী থানা নবরূপে সজ্জিত হয়েছে নিজেদেরকে জাহির করতে থানারসীমানা প্রাচীরজুড়ে পোস্টারে পোস্টারে একাকার হয়ে থাকতো। এখন কোতোয়ালী থানা প্রাচীর অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন সাজে সজ্জিত। দেখতে চোখ জুড়িয়ে যায়। তারিফ করতে হয়। এ সম্পর্কে যদি হাইলাইট করা না হয় তবে বিবেকের কাছে দায়ী থাকো, কারণ আমি লেখার লোক থানার কারো সাথে সখ্যতা নেই, দহরম মহরম নেই, যাবারও প্রয়োজন পড়ে না। দু’বার শুধু ওসি মহসীন সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তাঁর উদ্যোগে তৃষ্ণার্থ লোকদের তৃষ্ণা মেটাতে ‘স্বস্থি’ নামক শীতল পানির ব্যবস্থার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে গিয়েছিলাম। আমাকে সম্মান জ্ঞাপন করলেন। যথারীতি আপ্যায়নও করেছেন। আচার আচরণে মনে হয় হয়তঃ কোন এক উঁচু বংশের লোক। আমার বাড়ি থানার দক্ষিণে ষোড়শীকুঞ্জের পরের গল্লির ভিতরে। আমি ভালো কাজের সমর্থক মন্দ কাজের সমালোচক। কোতোয়ালী থানার বাইরটা যেমন নজর কাড়ে ভিতরটাও দৃষ্টিনন্দন। ইতিপূর্বে থানার পশ্চিম সীমানা প্রাচীরসংলগ্ন নার্সারির গাছগাচরার বিপণন কেন্দ্র গড়ে ওঠেছিলো, দেয়ালের গায়ে লেখা ছিলো এখানে প্রশ্রাব করা নিষেধ তারপরও লোকে বেহায়ার মতো প্রশ্রাব করতো দক্ষিণ প্রাচীর ঘেষে বেপরোয়াভাবে চা-নাস্তার দোকান, যত্রতত্র রিক্সা পার্কিং। মনে হতো লা ওয়ারিশের সম্পত্তি। ডাক দোয়াই দেবার মতো কেউ ছিলো না, অথচ থানা এলাকা। এক শৃঙ্খলহীন এলাকা। ফুটপাত ভাঙাচুড়া। চট্টগ্রাম শহরের নাভি। এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। সে হাওয়া অনুকূল হাওয়া বলাই বোধ হয় সঙ্গত। তবে কিছু ঘাটতি বিদ্যমান আছে। চালের সঙ্গে ধানের কিঞ্চিত অবস্থানতো থাকবেই। অস্বীকার করার জো নেই।
শুরুটা বেশ লম্বা হয়ে গেছে। তাই দুঃখিত। এবার মূল প্রসঙ্গে-।
থানা পুরো সীমানা প্রাচীরে এখন আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীর পোস্টারে পরিপূর্ণ নয়। এসব দেখতে দেখতে মন তেতো হয়ে উঠেছে। সে জায়গায় অত্যন্ত সচিত্র রুচিশীল আকর্ষণীয় শিল্পকর্ম সম্বলিত আদেশ, উপদেশ, নসিহত। পথিকরা হেঁটে যেতে চোখ তুলে তাকায়। যা দ্বারা পাঠকদের নৈতিক মূল্যবোধের জাগ্রত করে। সত্যি হৃদয়ে নাড়া দেয়। পাঠকদের জন্য তৎসমুদয় উপস্থাপন করছি। থানার উত্তর সীমানা প্রান্ত থেকে শুরু করা যাক।
১) Urdu, Only urdu shall be the state language of Pakistan কায়েদে আজম মোঃ আলী জিন্নাহ।
“ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। বাঙালিদের প্রাণের দাবি”।
২) ৬ দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে, আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা বঙ্গবন্ধু।
৩) শহীদ মতিউর স্মৃতি অমর হউক।
৪) এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম … জয় বাংলা।
৫) অপরাধ দমনে অদম্য কোতোয়ালী।
৬) পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ।
৭) সব সমস্যার সমাধান ৯৯৯।
৮) জঙ্গিবাদকে না বলুন।
৯) তথ্য দিন, নিরাপদ থাকুন। নিরাপত্তায় আস্তার ঠিকানা।
১০) ৭১’ যুদ্ধকালীন সময়ে কোতোয়ালী থানার ওসি ছিলেন আবদুল খালেক, দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্য পাকবাহিনী তাকে টার্গেটে পরিণত করেছিল।
১১) ইভটিজিং করার আগে চেহেরার দিকে একবার থাকানন হতে পারে তিনি আপনার মা কিংবা বোন।
১২) হে তরুণ আল্লাহ বলেছেন আত্মঘাতি জাহান্নামী, তাহলে কোন জান্নাতের লোভে তুমি আত্মঘাতী?
১৩) গুজব ছড়াবেন না গুজবে কান দিবেন না।
১৪) নারী ও শিশুপাচার রোধে সচেতন হোন।
১৫) অবৈধ চোরাচালানকারী দেশ ও জাতির শত্রæ, তাদের ধরিয়ে দিন।
১৬) সহিংসতা নয়, চাই মানবতা।
১৭) তিন তালাকে বিচ্ছেদ শাস্তিযোগ্য।
১৮) বাল্যবিবাহকে না বলুন।
১৯) যৌতুক নির্যাতন বন্ধ হোক।
২০) ইভটিজিং করার আগে ভেবে দেখুন, জেলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত তো।
২১) নারী ও শিশু ধর্ষণ নয়, চাই নিরাপদে বাঁচার অধিকার।
২২) হাতে মাদক মানেই হাতে কড়া।
২৩) পুলিশকে তথ্য দেওয়া মানে নিজেকে সুরক্ষিত করা।
২৪) তথ্য দিন নিরাপদ থাকুন।
২৫) খাবারে ভেজাল মেশাবেন না। সে খাবার আপনার পরিবারেও খেতে পারে।
২৬) যে ইভটিজিং এর জন্য আপনাকে প্ররোচিত করে তার থেকে দূরে থাকুন।
২৭) ভাড়াটিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হোন, আপনার বাড়ি যেন জঙ্গি আস্তানা না হয়।
২৮) ফেসবুক প্রেম সম্পর্কে সচেতন হোন। হতে পারে এটি একটি ফাঁদ।
২৯) সমাজের ক্যানসার গ্যাং কালচার। এলাকার বড়ো ভাই, বিপদে পাশে নাই।
উপরোল্লেখিত মূল্যবান বাক্যে দৃষ্টিনন্দন ও বাক্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবিসহ বিরাট বিরাট পোস্টার সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে এঁকে দেয়া হয়েছে। থানার অভ্যন্তর বড়ো মাপের মণীষীদের উক্তি দিয়ে ভরপুর। থানার ভেতর বাহিরের যে রুচিশীল মানুষের হাতের স্পর্শ দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে তা বলাবাহুল্য। তবে এসব উদ্যোগের প্রাণপুরুষ থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহসীন সাহেব। মোটামোটি কোতোয়ালী থানার সুরৎ পাল্টে গেছে। রাস্তার পথিকদের দৃষ্টি কেড়ে নেওয়ার মতো উদ্যোগ। পথ চলতে কোন কোন পথিক পোস্টারগুলো মনদিয়ে পড়ে। হযতবা এতে কারো কারো মন মানসিকতার পরিবর্তন আসবে। চৈতন্যবোধ জাগ্রত হবে কিছু না কিছুতো হবেই।
ঢোকবার পথে শহীদ ওসি খালেক সাহেবের আলোকচিত্র। উনার ছবির পাশে দাঁড়িয়ে উনার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলাম। ২৮ কি ২৯ মার্চ ৭১ হবে। উনাকে পাঞ্জাবি সৈনিকরা আটক করে পিছমোড়া বান দিয়ে আর্মি জিপগাড়ির বার্নাডের ওপর বসালো আর ঐ জিপ সারা চট্টগ্রামে চক্কর দিলো, পাঞ্জাবি সৈনিক উঁচু কন্ঠে বলতে থাকে, দ্যাকো, হয়ে কোন হো, হিয়ে কোতোয়ালী থানাকে ওসি ‘গারদার, শালা‘ ওদের ভাপা খালেক, দেখো উনকা নজিতা। জানিয়ে মৃত্যুর আগে তাঁকে কত অত্যাচার না সহ্য করতে হয়েছিলো।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শহীদ আবদুল খালেক সাহেবের ছবিটা দেখে মনটা কেঁদে ওঠলো। তার প্রতি ভক্তি এবং শ্রদ্ধা। ১৯৬৩ সালের দিকে ওসি ছিলেন শুক্কুর মিঞা। উনার সঙ্গে আমার বাবার সখ্যতা ছিলো ৭১’ এপ্রিলের দিকে উনি চাটগাঁ আসেন আমাদের ভালোমন্দ দেখভাল করেন। এই যে গেছেন আর স্বাক্ষাৎ হয়নি। আসা যাক মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ে। অপরাধ দমনে পুলিশ মূখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। একথা যেমন সত্য পাশাপাশি একথাও সত্য পুলিশ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ অবলম্বন নয়। জঙ্গিবাদ, ইভটিজিং, র‌্যাগিং, গুজব ছড়ানো, নারী ও শিশুপাচার, চোরাচালান, সহিংসতা, তালাক প্রদান, বাল্যবিবাহরোধ, যৌতুক, নারী ও শিশুধর্ষণ, মাদক দ্রব্য বিপণন ও সেবন, এসব অপকর্ম সামাজিক নৈতিকতার স্খলনের প্রতিক্রিয়া। এসবের বিরুদ্ধে পারিবারিক ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনমত জাগ্রত করা আবশ্যক এর পাশাপাশি দরকার প্রশাসনিক সহযোগিতা আর সে সহযোগিতার ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসন যদি শতভাগ সহযোগিতার আশ্বাসে আশ্বস্থ করতে পারেন তবে দারুণ একটা পরিবর্তনের পথ প্রশস্থ হবে, বলা যায়।
সততাও নিষ্ঠার সঙ্গে পুলিশ বাহিনী তাদের দায়িত্ব পারিপূর্ণভাবে পালন করবে আমরা এ প্রত্যাশাই করছি। আল্লাহ তাদের সহায় হোন।
লেখক : কলামিস্ট