কোটি প্রাণে অনুভূতির গভীরতায় শেখ রাসেল

19

এড. সালাহ্উদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু

আজ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত স্নেহের সর্বকনিষ্ঠ তনয় শেখ রাসেল এর ৫৬তম জন্মবার্ষিকী। তিনি ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নং সড়কের ৬৭৭ নং বাড়িতে ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর রাতের প্রথম প্রহরে জন্মগ্রহণ করেন। সেদিন ছিল মধ্যরাতে চতুর্দিকে সুনসান নীরবতা। নির্ঘুম রাতে বাড়ির সকলের উৎকন্ঠার মাঝে দীর্ঘ প্রতিক্ষা শেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যখন একটি ফুটফুটে নতুন অতিথির আগমনি বার্তা এলো, তখন বাড়ির সকলের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতে লাগলো। চাঁদের আলোর ঝরণাধারায় সমগ্র পৃথিবী যেমন আলোকময় হয়ে উঠে। তেমনি শিশু রাসেল পুরো পরিবারের জন্য ছিল সুশীতল শান্তির স্নিগ্ধ আলো। তাঁকে ঘিরে পত্র পল্লবিত হতে থাকে পরিবারের আনন্দ বেদনার কাব্য। শিশু রাসেল যখন পৃথিবীতে পদার্পণ করেন, তখন বঙ্গবন্ধু দলীয় কাজে চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। পুত্র সন্তানের জন্মলাভের সংবাদ পেয়ে তিনি চট্টগ্রাম থেকে অতি দ্রুত ঢাকায় বাসায় ফেরেন এবং বঙ্গবন্ধু খুশিতে নবজাতক পুত্র সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে নাম রাখলেন রাসেল। ১৯৫০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, প্রখ্যাত দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ বার্ট্রান্ড অর্থার উইলিয়াম রাসেল (বার্ট্রান্ড রাসেল) এর খুব ভক্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি পুত্রের জন্মের পূর্বেই নাম ঠিক করে রেখেছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধু তাঁর নাম অনুসারে নিজের কনিষ্ঠ পুত্রের নাম রাখেন। শেখ রাসেল মায়ের পরে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ তনয়া আজকের প্রধানমন্ত্রী ‘হাসু আপা’কে। মা, বাবা, ভাইবোন সবার বড় আদরের এই রাসেল সোনার চোখের তারায় যেন অন্য রকম আলো ছিলেন। পরিবারের সকলের পরম মমতা ও ভালোবাসা নিয়ে দিনে দিনে রাসেল বড় হতে থাকেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন একজন আর্দশ মাতা ও মহিয়সি নারী। তিনি তাঁর সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় মাানুষ করেছিলেন। শিক্ষা দিয়েছিলেন মানবিক গুণাবলি। আনন্দময় শৈশবে রাসেলের দুরন্তপনার মাঝেও মায়ের শিক্ষায় তাঁর মানবীয় গুণাবলির দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে। রাসেল অনেক বুদ্ধিমান ও শান্ত প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর মায়াবী চোখের চাহনি আর মিষ্টি হাসি ছিল অসাধারণ। উড়ে বেড়াতে, ঘুরে বেড়াতে শিশু রাসেলের খুব ভালো লাগতো। তিনি সাইকেল চালাতে পারদর্শী ছিলেন। আর দশজন সাধারণ ছেলের মতো রাষ্ট্রীয় কোন প্রটৌকল ছাড়া সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতেন। ছোট্ট রাসেল কবুতর, গরু ও মুরগি পোষতে পছন্দ করতেন। তাঁর মাছ ধরারও খুব শখ ছিল। ডিমভাজির সাথে চিনি ছিল রাসেলের প্রিয় খাবার। তাই তাঁর এই ব্যতিক্রমি অভ্যাসটি অনেককে আকৃষ্ট করেছে। প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনার বান্ধবী প্রয়াত বেবী মওদুদ ও রাসেলের গৃহশিক্ষিকা গীতালি দাশ গুপ্তার লেখনীতে শেখ রাসেলের অনেক অজানা তথ্য পাওয়া যায়।
প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনাও ও তাঁর সহোদরা শেখ রেহেনা তাদের আদরের ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ‘শেখ রাসেল’ নামক একটি বইয়ে তাঁরা দুজনে লিখেছেন, “রাসেল চলাফেরায় বেশ সাবধানী ও সাহসী ছিল, সহসা কোনো কিছুতেই ভয় পেতো না। রাসেলের এমনিতে খাবারের প্রতি অনিহা ছিল, কিন্তু রন্ধনশালায় বাড়ির বাবুর্চি, প্রহরি, গৃহকর্মীরা ফুল আঁকা টিনের থালায় করে যখন সবাই খেত, তখন ওদের সাথে বসতো। রন্ধনশালায় পিঁড়ি পেতে বসে লাল ফুল আঁকা থালায় করে তাঁদের সাথে ভাত খেতে পছন্দ করতো।” এতে বোঝা যায়, শিশুটির মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছা কত প্রবল ছিল। রাসেলের খুব ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিবেন। তাঁকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করতো, বড় হয়ে তুমি কি হবে, সে নির্দ্বিধায় বলতো, আমি আর্মি কড় হয়ে অফিসার হবো। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে রাসেলের এই ইচ্ছা মনের মাঝে দানা বাঁধতে শুরু করে। অগ্রজ দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ কামাল ও সেনা কর্মকর্তা শেখ জামাল মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তাঁদের কাছ থেকে খুব আগ্রহ সহকারে যুদ্ধের গল্প শুনতো রাসেল। ১৯৭১ সালে রাসেলের বয়স ছিল ছয় বছর। ওই ছয় বছরের শিশুর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষ্ময়কভাবে প্রতিফলত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তখন পুলিশের গাড়ি দেখলেই বাড়ির বারান্দার রেলিং থেকে দেখতো। তখন তাঁর মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত দেখা গেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়, ১৭ ডিসেম্বর যখন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহায়তায় পরিবারের সাথে বন্দিদশা থেকে মুক্ত, তখন শিশু রাসেল বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হলেও তিনি তাঁর বাবাকে না পেয়ে ব্যাথায় বুক ভরা ছিল। যেদিন বাবা ফিরে এলেন, রাসেলের আনন্দ যেন আর ধরে না। পিতা মুজিব জীবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটায়, পিতাকে রাসেল খুব কমই কাছে পেয়েছিলেন, কিন্তু যতক্ষণ পেতেন, ততক্ষণ তাঁর সবকিছু পিতাকে ঘিরে আবর্তিত হতো। পিতা তাঁকে এদেশের শোষিত, নির্য়াতিত, নিপীড়িত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের গল্প শুনাতেন। মনোযোগি ছাত্রের মতো তিনি বাবার গল্প শুনতেন। সেইসব গল্প রাসেলের মধ্যে বপন করেছিল। শিশু রাসেলকে সময় দিতে না পারার বেদনা বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন। “কারাগারের রোজনামচা” গ্রন্থে রাসেলের কথা তিনি অনেকবার তুলে ধরেছেন।
১৯৭৫ সালে শেখ রাসেল ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। দুরন্তপণ এই শিশু তাঁর পিতার রাজনৈতিক জীবনকে দেখতে শুরু করেছিলেন মাত্র। বাবার বুকের গভীরে মুখ রেখে সাহস আর বীরত্বের উষ্ণতা নেয়ার যখনই ছিল শ্রেষ্ঠময়, ঠিক তখনই নরঘাতকদের দল তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারি এ.এফ.এম. মহিতুল ইসলারে ভাষ্য মতে, ১১ বছরের শিশু রাসেল প্রতিদিনের মতো সেদিনও ঘুমিয়েছিলেন। আকস্মিক গুলির বিভৎসতায় তাঁর ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুমভাঙা চোখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে চমকে উঠে। অবন্থা বুঝে বেগম মুজিব আদরের দুলাল রাসেলকে রক্ষায় বাড়ির কাজের লোকজন সহ পেছনের দরজা দিয়ে চলে যেতে বলেন। পেছনের ফটক দিয়ে বাইরে যাওয়ার সময় ঘাতকরা তাঁকে আটক করে। এসময় বাড়ির ভেতরে মূর্হুমূর্হু বুলেটের শব্দ, বীভৎসতা আর আত্মচিৎকার শুনে অবুঝ শিশু রাসেল কান্না জড়িত কন্ঠে ঘাতকদের বলেছিলেন, “আমি মায়ের কাছে যাবো,” পরবর্তীতে মায়ের লাশ দেখার পর তিনি অশ্রুসিক্ত কন্ঠে জোর মিনতি করে বলেছিলেন, “আমকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দাও, কিন্তু এতটুকু মন গলেনি ঘৃণ্য নরপিশাচদের। ঘাতকরা এর পূর্বেই বঙ্গবন্ধু সহ পরিবারের সকল সদস্যকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করেছে। নরপিশাচদের দল মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ও পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি নিষ্পাপ ও অবুঝ শিশু রাসেলকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা শিশু রাসেলকে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারি নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বিশ্বের জঘন্যতম হত্যাকান্ডে নির্মম শিকার শিশু রাসেল। হারিয়ে গেছেন দুর্লোকে। সেই অনন্তলোক থেকে কেই কোনদিন ফেরে না। শুধু কিছু স্মৃতি রয়ে গেছে তাঁর দুইবোনের মনের গহীনে। যে স্মৃতি তাঁরা বয়ে বেড়াবেন আজীবন। তাঁদের হৃদয়ের সেই গভীর ক্ষত কোনোদিন জানবে না কেউ। কেউ জানবে না ছোট ভাইটির জন্য দুইবোনের গোপন অশ্রু বিসর্জনের কথা। সেই মায়াভরা মুখ, সেই দুষ্টামি ভরা চাহনি। তাঁরা কি আজ আবগাহন করবেন রাসেলের স্মৃতির সরোবরে।
শিশু রাসেলের স্বপ্ন ছিল বড় হওয়ার, কিন্তু সব স্বপ্ন স্তব্ধ হয়ে যায় মানবরূপী দানবের হাতে। বড়বোন হাসু আপার সাথে রাসেল যদি জার্মানিতে থেকে যেতে পারতো, হয়তো আজ ইতিহাস অন্য রকম হতো। যে শিশুর চোখের তারায় ছিল অপার সম্ভাাবনায় অন্য রকম আলো। সে আলো বিকশিত হওয়ার আগেই ঝরে গেল। নিস্পাপ শিশু রাসেলের হৃৎপিন্ড ভেদ করে দিয়েছিল বুলেট। ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে ফুলের মতো শিশু রাসেলের দেহ নিথর হয়ে পড়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাসেল বঙ্গবন্ধুর সরকারি সফর সঙ্গী হিসেবে থাকতেন। ওই বয়সেও তাঁকে নির্ভীক একজন দেশপ্রেমিক সৈনিকের মতোই মনে হতো। তাঁর চাহনি, কথা বলার ঢং, পোশাক পরিচ্ছদের স্টাইল ও অন্যান্য শিশুসুলভ আচরণের মাাঝেও একটি ব্যক্তিত্বের ছাপ ফুটে উঠতো। কথায় আছে বৈশিষ্ট্যমÐিত চেহারা নির্দেশ করে বড় হয়ে সে কি হবে। সেই রাসেল আমাদের ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি। আমাদের অনুভ‚তির গভীরতায় শেখ রাসেল যেন অন্য এক মহিয়ান পুরুষের অস্তিত্ব লুকিয়ে আছেন।
শেখ রাসেল আজ বাংলাদেশের শিশু, কিশোর, তরুণ, শুভবুদ্ধিবোধ সম্পন্ন মানুষদের কাছে ভালোবাসার নাম। অবহেলিত, পশ্চাৎপদ, অধিকার বঞ্চিত শিশুদের আলোকিত জীবন গড়ার প্রতিক হয়ে গ্রামগঞ্জ ও শহর তথা বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদে শেখ রাসেল আজ এক মানবিক সত্তায় পরিণত হয়েছে। মানবিক চেতনাসম্পন্ন মানুষরা শেখ রাসেলের বিয়োগ, দুঃখ, বেদনাকে হৃদয়ে ধারণ করে বাংলার প্রতিটি শিশু কিশোর তরুণের মুখে হাসি ফুটাতে আজ প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। শেখ রাসেল আজ পৃথিবীতে না থাকলেও তিনি বেঁচে আছেন এদেশের কোটি প্রাণে। আজকের ভোরের পবনে ছড়িয়ে দিলাম আমার অন্তহীন শুভেচ্ছা। আজকে সব ফুল ফুটেছে রাসেলের জন্য এবং পাখিদের কন্ঠে রাসেলের গান। শেখ রাসেল শুভ জন্মদিনে অতল শ্রদ্ধা।
লেখক: কলামিস্ট, রাজনীতিক
[email protected]