কেঁচো খুঁড়তেই বেরিয়ে এলো সাপ

69

সবুর শুভ

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের হিসাব রক্ষক ‘ফোরকানকে’ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জন্য পাঠানো স্মারক নম্বরের উপর দিব্যি ভুয়া স্মারক নম্বর বসানো হয় জেনারেল হাসপাতালের বিলে। সেই স্মারক নম্বর ব্যবহার করে ৫ কোটি ৩৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিতে গিয়েই মূলত ধরাটা খান মোহাম্মদ ফোরকান। চমেক হাসপাতালের আউটসোর্সিং খাতে নিয়োজিত জনবলের বেতন-ভাতাদি পরিশোধের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ১৩৯.১২৯.২০২১-৪৫৯ নং স্মারকে একটি চিঠিটি দেওয়া হয়।
এদিকে মঙ্গলবার সংঘটিত ‘ফোরকান কান্ডে’ মোহাম্মদ ফোরকানকে সব ধরনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে অভিযোগ পাঠানো হল দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব বিষয় নিশ্চিত করে জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জানান, পুরো ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এরপরই বলা যাবে প্রকৃত ঘটনা।
মোহাম্মদ ফোরকান ২০১০ সালেই মাত্র চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন। তাও অস্থায়ী হিসেবে। সেই থেকে বরাবরই আলোচনার পাদপ্রদীপে এই ফোরকান। কখনও বদলী, কখনও দুর্নীতি, আবার কখনও নারী সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে। বারবারই কাটিয়ে উঠেন এসব ঘটনা। এবার আসলো স্মারক জালিয়াতির অভিযোগ। মঙ্গলবার থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হতে হতেই বেঁচে যান তিনি।

ফোরকানের নিয়োগ: বাঁশখালীর পশ্চিম পূঁইছড়ি এলাকার মোহাম্মদ ফোরকান ২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ পেয়ে বাঁশখালী থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ শুরু করেন। তখন সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন ডা. মো. আবু তৈয়ব।

বেপরোয়া কর্মকান্ডে কৈফিয়ত তলব: সরকারি নিয়মনীতি না মেনে বেপরোয়া কর্মকাÐের কারণে ২০১৫ সালের ৫ জুন তার কাছে কৈফিয়ত তলব করে সিভিল সার্জন অফিস। প্রশাসনিক কাজে জঠিলতা ও চাকরির বিধিমালা ভাঙার অভিযোগে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়।

সাতকানিয়ায় বদলী: বাঁশখালীতে তার আচরণগত কোন পরিবর্তন না হওয়ায় সাতকানিয়া থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলী করা হয়।

লোহাগাড়ায় বদলী: সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার রিপোর্টের ভিত্তিতে বাঁশখালীতে প্রশাসনিক কারণে বদলী করা হলেও সেখানে আপত্তির কারণে যোগদান করতে পারেননি। এই যাত্রায় তার ঠিকানা হয় লোহাগাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

চাঁদপুরে বদলী অতঃপর: দুর্নীতির অভিযোগ উঠার পর ফোরকানকে চাঁদপুর জেলায় প্রশাসনিক বদলী করা হয়। কিন্তু তিনি সেখানে যাননি। পরে এই বদলীর আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

কক্সবাজার থানায় ডায়েরি: ২০১৫ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের দুই নারী আমিরুন্নেছা ও সুলতানা রাজিয়া কক্সবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। ডায়েরিতে ওই দুই নারীকে হয়রানি ও অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ তোলা হয়।

দুদকে অভিযোগের সুরাহা নেই: ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে মোহাম্মদ ফোরকানের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশনা দেয়া হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক বরাবরে হিসাব রক্ষক ফোরকানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি সিন্ডিকেটকে টেন্ডার ভাগিয়ে দেয়াসহ ৩৭টি অভিযোগের খসড়া দিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরপর দুটি কমিটি গঠন করে ১৫ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেয়। এখনও পর্যন্ত সেই নির্দেশনার ফলাফল দৃশ্যমান নয়।

রবিবারের বানানো সেই স্মারক: গত ২৬ জুন ১৩৯.১২৯.২০২১-৪৫৯ নং স্মারকে একটি বিল দাখিল করা হয় বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক শাখায়। একই তারিখে উক্ত স্মারকে চমেক হাসপাতালের আউটসোর্সিং খাতে নিয়োজিত জনবলের বেতন-ভাতাদি পরিশোধের জন্য আদেশ করা হয়। চিঠিটিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের (বাজেট শাখা-১) সিনিয়র সহকারি সচিব সুশীল কুমার পাল এর স্বাক্ষরও দেখানো হয়। যেটা ছিল ভুয়া ও জালিয়াতপূর্ণ।

১০ মিনিটের জন্য অফিসে ফোরকান: মঙ্গলবারের ঘটনার পর গতকাল মাত্র ১০ মিনিটের জন্য অফিসে আসেন মোহাম্মদ ফোরকান। বেলা ১২টার দিকে অফিসে আসার পর কারও সাথে কোন কথা না বলে আবার চলে যান বলে অফিস সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জেনারেল হাসপাতালে স্বস্তি: ফোরকান কান্ডে অস্থির চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের নার্সসহ অধিকাংশ কর্মীরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন গতকাল। নাম প্রকাশ না কয়েকজন জানান, ফোরকানের যন্ত্রণায় অধিকাংশই অস্থির ছিল।
কি ঘটেছিল সেদিন: চমেক হাসপাতালের একটি বিলের স্মারক নম্বর জেনারেল হাসপাতালের নামে আরেকটি বিলের কাগজে বসিয়ে জাল কাগজ তৈরি করা হয়। সে কাগজে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক থেকে স্বাক্ষর করিয়ে ফোরকান নিয়ে যান বিভাগীয় হিসাব নিযন্ত্রক অফিসে। সেখানে সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তার বিষয়টি সন্দেহ হলে পরবর্তীতে অফিস প্রধানকে অবহিত করা হয়। পরে তারা (বিভাগীয় হিসাব নিযন্ত্রক কর্তৃপক্ষ) স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর ফোরকানকে আটকে রাখা হয় হিসাব নিয়ন্ত্রক অফিসে। পরে তাকে পাঁচলাইশ থানায় সোপর্দ করা হয়। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ফোরকানকে নিজ জিম্মায় ছাড়িয়ে আনেন। গত মঙ্গলবার সংঘটিত এই ঘটনায় তোলপাড় চলছে।
এদিকে এসব বিষয়ে মোহাম্মদ ফোরকানের বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে ফোন করা হয়। কিন্তু মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।