কৃষকদের কাছে জ্বালানি তেল পৌঁছাতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা

35

কৃত্রিম উপায়ে পানি সেচের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান, ভুট্টা ও গমসহ নানান ফসলের আবাদ হয়। চলতি মৌসুমে সেচ যন্ত্র চালনার অন্যতম জ্বালানি ডিজেল পরিবহনে ‘কনটিনজেন্সি প্ল্যান’ হিসেবে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। নৌ ও রেলপথে এসব জ্বালানি পরিবহন নিরবচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার সারাদেশে ১৭ লাখ মেট্রিক টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বোরো মৌসুমে নভেম্বর ২০১৮ থেকে মে ২০১৯ পর্যন্ত সেচ কাজে নভীর নলকূপ, অগভীর নলকূপ, এলএলপি (লো লিফট পাম্প), পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর মিলিয়ে সারাদেশে ১৬ লাখ ৬১ হাজার ১৮৭টি যন্ত্র ব্যবহার করা হবে। এতে জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের প্রাক্কলিত চাহিদা রয়েছে ১৬ লাখ ৩৮ হাজার ৯২ মেট্রিক টন। একইসাথে লুব অয়েলের প্রাক্কলিত চাহিদা ৫০ হাজার ৫৫২ মেট্রিক টন।
তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে নভীর নলকূপ ১০টি, অগভীর নলকূপ ৩ হাজার ২৬৯টি, এলএলপি ১৭ হাজার ৮টি, পাওয়ার টিলার ১৪ হাজার ৭৯টি, ট্রাক্টর ৫৭২টি মিলিয়ে ৩৪ হাজার ৯৩৮টি কৃষিজ যন্ত্র ব্যবহৃত হবে। এতে চট্টগ্রামে ৪৪ হাজার ৬৮৭ মেট্রিক টন ডিজেল ও এক হাজার ৬৬৩ মেট্রিক টন লুব অয়েলের প্রয়োজন হবে। তাছাড়া চট্টগ্রামের বাইরে যশোর অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৩ হাজার ৫১১টি, বগুড়া অঞ্চলে ২ লাখ ১১ হাজার ১৪৯টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯৫টি, দিনাজপুর অঞ্চলে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৪৭টি, রাজশাহী অঞ্চলে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫৭টি, খুলনা অঞ্চলে ১ লাখ ৪৩ হাজার ১৪৮টি, ঢাকা অঞ্চলে ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৯৫টি ডিজেল চালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার করা হবে।
জানা যায়, বছরের ডিসেম্বর-এপ্রিল পর্যন্ত এ পাঁচ মাস আমাদের দেশে কৃষিসেচ মৌসুম হিসেবে স্বীকৃত। তবে মঙ্গাপীড়িত এলাকায় খরা দীর্ঘায়িত হলে সেচ মৌসুম সম্প্রসারিত হয়। দেশে মোট বিক্রয়কৃত ডিজেলের প্রায় ২৩ শতাংশ কৃষিখাতে ব্যবহৃত হয়। সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে কৃষিতে সেচকার্যে সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে দেশের সর্বত্র বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে কৃষিসেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করে বিপিসি। এজন্য বিপিসির প্রধান কার্যালয়ে ‘কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সেল’ ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েলের বগুড়া, খুলনা, ঢাকা, সিলেট ও বরিশালসহ পাঁচটি বিভাগীয় কার্যালয়ে ‘আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেল’ হিসেবে ‘বিশেষ মনিটরিং সেল’ স্থাপন করা হয়েছে।
সারাদেশে সেচ কাজের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে চট্টগ্রাম বন্দর, বিআইব্লিউটিএ (বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটি), বাংলাদেশ রেলওয়ে, পিডিবি (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড), কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে নিয়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিপিসি। ইতোমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ শুরু হয়েছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, কৃষিসেচ মৌসুমে আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের ট্যাংকার ও লাইটারেজ জাহাজ দ্রুত খালাস, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা পেট্রোলিয়ামের চট্টগ্রামস্থ প্রধান স্থাপনা থেকে গোদনাইল, ফতুল্লা, দৌলতপুর ও অন্যান্য ডিপোতে জালানি তেল সরবরাহের উদ্দেশে দ্রুত কোস্টাল ট্যাংকার লোডিংয়ের সুবিধার্থে চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি ডলফিন জেটিতে (ডিওজে-৫, ডিওজে-৬, ডিওজে-৭) অন্য কার্গো জাহাজ নোঙ্গর না করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তাছাড়া কৃষিসেচ মৌসুমে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন তেলজেটিতে (ডলফিন জেটি) সূর্যাস্তের পরও জ্বালানি তেল আমদানিকৃত জাহাজ নোঙ্গরকরণ, তেলবাহী কোস্টাল ট্যাংকারসমূহকে রাতের বেলা চলাচলের অনুমতি প্রদান এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ডলফিন জেটির বয়াগুলো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেয় বিপিসি।
এদিকে চলতি কৃষিসেচ মৌসুমে বাংলাদেশ রেলওয়ের মাধ্যমেও জ্বালানি তেল পরিবহন করা হচ্ছে। তন্মধ্যে চট্টগ্রাম-রংপুর রুটে সপ্তাহে কমপক্ষে ৪টি ট্যাংকওয়াগন রেক, চট্টগ্রাম সিলেট রুটে সপ্তাহে ৪টি, চট্টগ্রাম-শ্রীমঙ্গল-মোগলাবাজার রুটে সপ্তাহে তিনটি ট্যাংকওয়াগন রেক (প্রতি রেকে ট্যাংকওয়াগন সংখ্যা ২৪টি, ওয়াগন ক্ষমতা ৩২ মেট্রিক টন), দৌলতপুর-পার্বতীপুর রুটে প্রতিদিন কমপক্ষে তিনটি ট্যাংকওয়াগন রেক (প্রতি রেকে ট্যাংকওয়াগন সংখ্যা ৩০টি, ওয়াগন ক্ষমতা ২৪ থেকে ৪২ মেট্রিক টন), দৌলতপুর- নাটোর রুটে প্রতিদিন ন্যূনতম ১টি, দৌলতপুর-পরিয়ান-রাজশাহী রুটে সপ্তাহে কমপক্ষে ১টি ট্যাংকওয়াগন রেক (প্রতি রেকে ট্যাংকওয়াগন সংখ্যা ৩০টি, ওয়াগন ক্ষমতা ২৪ থেকে ৪২ মেট্রিক টন) ও ১টি পিসমিল ট্যাংক ওয়াগন পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিপিসির কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সেলের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি কৃষিসেচ মৌসুমে পর্যাপ্ত ডিজেল মজুদ রয়েছে। নিরবচ্ছিন্নভাবে এসব ডিজেল কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সেলের সমন্বয়কারী বিপিসির উপ-মহাব্যস্থাপক (বিপণন) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ পূর্বদেশকে বলেন, ‘সেচ মৌসুমকে আমরা বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। কৃষককূল যাতে নির্বিঘ্নে এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে জ্বালানি তেল পান, আমরা সেই বিষয়টি মনিটরিং করে থাকি। আমরা দুটি কন্ট্রোল সেলের মাধ্যমে বিষয়টি মনিটরিং করি। এবার বিপিসির পক্ষে পদ্মা অয়েল কোম্পানি সারাদেশের ৫টি আঞ্চলিক মনিটরিং সেলের মাধ্যমে বিষয়টি তদারক করছে। সেচ মৌসুমের হালনাগাদ তথ্য মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত প্রেরণ করে থাকি।’
তিনি বলেন, ‘চলতি বোরো মৌসুমে কোথাও আমাদের সংকট নেই। সারাদেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে। আমরা সফলতার সাথে সেচ মৌসুম শেষ করতে পারবো বলে আশা করছি।’

­